এম আব্দুল হালীম »
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তৃত সবুজ ক্যাম্পাসে বিকেল নামত খুব ধীরে। কৃষ্ণচূড়ার ছায়া, লাল ইটের পথ, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সিঁড়ি আর দূরের পাখির ডাক- সবকিছু মিলে যেন এক নিঃশব্দ জগৎ। সেই জগতেই বাচ্চুর জীবনে এসেছিল একজন শিল্পী।
বাচ্চু বাংলা বিভাগের ছাত্র। কবিতা লিখত, গল্প পড়ত, আর লাইব্রেরির নির্জন কোণে বসে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিতো। তার স্বভাব ছিল নীরব। কথার চেয়ে চোখে বেশি প্রকাশ পেত অনুভূতি। আর শিল্পী ছিল সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। প্রাণখোলা, মিষ্টি হাসির, সবার সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়া এক মেয়ে। প্রথম দেখা হয়েছিল লাইব্রেরির সিঁড়িতে।
এক দুপুরে ঝড়ো বাতাসে শিল্পীর নোটের পাতা উড়ে গিয়েছিল। বাচ্চু দ্রুত কাগজগুলো কুড়িয়ে দিয়েছিল। শিল্পী হেসে বলেছিল,
“আজ তুমি না থাকলে স্যারের সামনে বাঁচতাম না।”
সেই হাসিটুকু বাচ্চুর মনে এমনভাবে গেঁথে গেল, যেন বহুদিনের চেনা কেউ হঠাৎ ফিরে এসেছে।
তারপর থেকে দেখা হতে লাগল। কখনো বাবলাতলার চায়ের দোকানে, কখনো বটতলায়, কখনো পদ্মার ধারে। শিল্পী গল্প করত, বাচ্চু শুনত। কখনো সাহিত্য, কখনো স্বপ্ন, কখনো ভবিষ্যৎ- সবকিছু নিয়েই কথা হতো।
একদিন শিল্পী বলল, “তুমি এত চুপচাপ কেন?”
বাচ্চু মৃদু হেসে বলল, “সব কথা বলা যায় না।”
শিল্পী উত্তর দিয়েছিল, “যেগুলো বলা যায় না, সেগুলোই তো সবচেয়ে সত্যি।”
কথাটা শুনে বাচ্চু চুপ হয়ে গিয়েছিল। কারণ সে জানত, যে কথাটা সবচেয়ে সত্যি, সেটাই সে কোনোদিন বলতে পারবে না।
সময়ের সঙ্গে সম্পর্কটা গভীর হলো। তারা একে অপরের জীবনের অভ্যাস হয়ে উঠল। একদিন না দেখা হলে দু’জনেরই মন খারাপ থাকত। পরীক্ষার আগে নোট ভাগাভাগি, বইমেলায় ঘোরা, ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়ার নিচে বিকেল কাটানো, সব যেন নিঃশব্দ এক বন্ধন।
বন্ধুরা অনেকেই ভাবত, তারা প্রেমে ডুবে আছে। কিন্তু তারা কিছু স্বীকার করত না।
শেষ বর্ষে শরতের এক বিকেলে কৃষ্ণচূড়ার নিচে বসেছিল তারা। চারদিকে ঝরা পাতা। আকাশে হালকা মেঘ।
শিল্পী হঠাৎ বলল, “বাচ্চু, আমার একটা কথা আছে।”
“বলো।”
শিল্পী ধীরে বলল, “আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলেটা ডাক্তার। পরিবার সব ঠিক করেছে।”
বাচ্চুর মনে হলো, বুকের ভেতর কোথাও একটা শব্দহীন ভাঙন নেমে এলো। কিন্তু সে মুখে কিছুই বলল না।
“ভালো কথা। নিশ্চয়ই ভালো থাকবে।”
শিল্পী দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “এইটুকুই?”
বাচ্চু মাথা নিচু করে বলল, “আর কী বলব?”
শিল্পীর চোখে জল চিকচিক করল।
“কিছু সম্পর্কের নাম না থাকলেও মানুষ বোঝে। কিন্তু তুমি কখনো বুঝতে দিলে না।”
সেদিন শিল্পী চলে গেল। আর বাচ্চু বসে রইল কৃষ্ণচূড়ার নিচে, সন্ধ্যা নেমে এলো, অন্ধকারও হয়ে গেল, তারপর উঠল।
কয়েক মাস পর শিল্পীর বিয়ে হয়ে গেল। সে বিদেশে চলে গেল স্বামীর সঙ্গে।
বাচ্চু বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে অধ্যাপনায় যোগ দিলো। সাহিত্য নিয়ে পড়ালেখা করল, বই লিখল, ছাত্রদের কাছে প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠল। কিন্তু বিয়ে করল না। পরিবার বহুবার বলেছে, বন্ধুদের সংসার হয়েছে, সন্তান হয়েছে কিন্তু বাচ্চু যেন সময়ের বাইরে আটকে রইল।
তার জীবনে কাজ ছিল, খ্যাতি ছিল, ছাত্রদের ভালোবাসা ছিল কিন্তু কোথাও একটা নীরব শূন্যতা ছিল, যা কেউ পূরণ করতে পারেনি।
পঁচিশ বছর কেটে গেল।
সময়ের সঙ্গে ক্যাম্পাস বদলেছে। নতুন ভবন উঠেছে, পুরনো ক্যান্টিন ভেঙে আধুনিক ক্যাফে হয়েছে। তবু কৃষ্ণচূড়া গাছটা দাঁড়িয়ে আছে একই জায়গায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে বাচ্চু আবার গেল। বাবরি চুল, চোখে চশমা, হাতে পুরনো বই।
কৃষ্ণচূড়ার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল একজন নারী।
তুলিয়ারা শিল্পী।
চুলে পাক ধরেছে, মুখে বয়সের রেখা। কিন্তু চোখ সেই আগের মতোই। গভীর, নরম, আর অদ্ভুত পরিচিত।
শিল্পী এগিয়ে এসে বলল, “চিনতে পেরেছ?”
বাচ্চু হেসে বলল, “কিছু মানুষকে ভুলে থাকতে হয় না।”
শিল্পী মৃদু হেসে বলল, “তুমি একটুও বদলাওনি।”
তারা পাশাপাশি হাঁটল পুরনো পথ ধরে। লাইব্রেরি, বটতলা, পদ্মার পাড়, সব যেন আগের দিনের মতো।
শিল্পী বলল, “জানো, এত বছর পরও ভাবি, সেদিন যদি তুমি একটা কথাও বলতে”
বাচ্চু তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,
“তুমি যদি একবার বলতে, আমিও হয়তো বলতাম।”
শিল্পী থেমে গেল। ঠোঁটে বিষণ্ন হাসি।
“তাহলে আমরা দু’জনেই চুপ থেকে হেরে গেছি।”
সন্ধ্যা নেমে আসছিল।
শিল্পী আবার জিজ্ঞেস করল,
“তুমি বিয়ে করোনি?”
“না।”
“কেন?”
বাচ্চু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “কিছু জায়গা একবার ভরে গেলে, আর কাউকে জায়গা দেওয়া যায় না।”
শিল্পীর চোখে জল ভরে উঠল।
সে বলল, “আমার জীবন অনেক বদলেছে। দেশ, শহর, ঘর, মানুষ, সব। কিন্তু একটা জায়গা বদলায়নি। তোমার জন্য যে জায়গাটা ছিল, সেটা আজও আগের মতোই আছে।”
বাচ্চু আর কিছু বলতে পারল না। গলায় শব্দ আটকে গেল।
বিদায়ের সময় শিল্পী একবার ফিরে তাকাল।
সেই দৃষ্টি পঁচিশ বছর আগের মতোই।
ভিড়ের মধ্যে সে হারিয়ে গেল।
বাচ্চু দাঁড়িয়ে রইল কৃষ্ণচূড়ার নিচে। ঝরাপাতা পায়ের কাছে এসে জমছিল। আকাশে সন্ধ্যার শেষ আলো।
সে মনে মনে ভাবল, সময় অনেক কিছু বদলায়। কিন্তু কিছু অপেক্ষা সময়ের চেয়েও দীর্ঘ। কিছু অনুভূতি বয়স মানে না।
প্রেম হলে হয়তো ভুলে যাওয়া যেত।
বন্ধুত্ব হলে হয়তো সময় মুছে দিতো।
কিন্তু তাদের সম্পর্ক ছিল অন্যরকম। নামহীন, অথচ সবচেয়ে গভীর।
পঁচিশ বছর পরও যার রং ফিকে হয়নি।
বাচ্চু আকাশের দিকে তাকাল। হালকা বাতাস বইছে। কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরছে ধীরে ধীরে।
মনে হলো, কেউ যেন এখনও পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
সময়ের ওপারে, নীরবতায়, অপেক্ষায়।
আর সেই অপেক্ষার নাম- সময়ের ওপারে অপেক্ষা।






















































