আব্দুস সাত্তার সুমন »
অনেক অনেক দিন আগে, বাংলার এক শান্ত গ্রাম যার নাম আলিপুর| গ্রামটি ঘেরা ছিল সবুজ গাছপালা, পাখির ডাক আর খাল-বিলের জলে ভরা সৌন্দর্যে|গ্রামের দক্ষিণ পাশে ছিল এক বিশাল বিল ‘শাপলা বিল’ নামে| বছরের ছয় মাস সেখানে ফুটত অসংখ্য লাল শাপলা|
সকালে সূর্যের আলো পড়লে পুরো বিলটা যেন লাল গালিচায় ঢাকা পড়ে যেত| সেই গ্রামেরই এক চঞ্চল শিশু, নাম কায়েস| ও প্রতিদিন বিকেলে বই হাতে নিয়ে বিলে যেত, হাঁটু পানিতে নেমে শাপলার পাপড়িতে হাত ছুঁয়ে হাসত|
ওর দাদি বলতেন, এই শাপলাগুলো আমাদের গ্রামের প্রাণ, এগুলোই বলে দেয় প্রকৃতি এখনো বেঁচে আছে|
কায়েসের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল দাদির সঙ্গে বিলের গল্প শোনা|
দাদি বলতেন, তোর বাবার ছোটবেলায় এই বিল ছিল আকাশের আয়নার মতো, বৃষ্টি হলে শাপলাগুলো মেঘের সঙ্গে মিশে যেত|
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সবকিছু বদলে যেতে শুরু করল| গ্রামের পাশ দিয়ে ˆতরি হলো পাকা রাস্তা, তারপর ধীরে ধীরে লোকজন বিলে মাটি ফেলতে লাগল| কেউ ঘর তুলল, কেউ ধান শুকাতে জায়গা বানাল, কেউ আবার খালের মুখ বন্ধ করে দিল| জল কমে এল, মাছ কমে গেল, আর একসময় শাপলার সংখ্যাও কমতে শুরু করল| কায়েস বুঝতেই পারল না, তার প্রিয় বিলটা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে|
একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখল, পুকুরের পাশে একদল লোক ট্রাক ভর্তি মাটি ফেলে দিচ্ছে|
কায়েস চিৎকার করে বলল, চাচ্চু! চাচ্চু! থামেন! এখানে তো শাপলা ফুল ফোটে!
কিন্তু কেউ শুনল না তার কথা|
এক বৃদ্ধ হেসে বলল, এই বিল এখন খালি জায়গা, ফুল তো অনেক আগেই নেই|
কায়েস দৌড়ে গেল পানির দিকে, সত্যিই, মাত্র কয়েকটা শাপলা বেঁচে আছে যেন শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছে| রাতের বেলা কায়েস ঘুমাতে পারছিল না| জানালা দিয়ে বিলে তাকাতেই দেখল একটা মৃদু আলো জ্বলছে পানির উপর, ঠিক লাল শাপলার ফুলের মতো|
কায়েস নিঃশব্দে বাইরে গেল, আর দেখল সেই শেষ কয়েকটা লাল শাপলা জলে জ্বলজ্বল করছে, যেন কথা বলতে চাইছে|
হঠাৎ এক শাপলা বলল, কায়েস, আমরা চলে যাচ্ছি…
কায়েস কেঁদে ফেলল, তোমরা কোথায় যাবে?
শাপলা উত্তর দিল, মানুষ আমাদের জায়গা কেড়ে নিচ্ছে, খাল-বিল বন্ধ করে ফেলছে| আমরা জল ছাড়া বাঁচতে পারি না, তাই একে একে সবাই হারিয়ে যাচ্ছি|
তুমি কি প্রতিশ্রুতি দেবে, একদিন আমাদের ফিরিয়ে আনবে? কায়েস কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমি বড় হয়ে তোমাদের ফিরিয়ে আনব| সেই রাতে কায়েস দেখল, শাপলাগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল আর সকালের আলো উঠতেই বিলে শুধু মাটি আর আগাছা| বছর কেটে গেল| কায়েস বড় হয়ে শহরে পড়তে গেল, পরিবেশবিজ্ঞানী হলো|
সবাই যখন প্রযুক্তির জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিল, কায়েস তখনও মনে রেখেছিল তার শাপলা বিলের প্রতিশ্রুতি|
বছর পনেরো পর সে ফিরে এলো গ্রামে|
গ্রামের মানুষ অবাক! কায়েস বলল,
আমরা বিল ভরেছি, তাই প্রকৃতি রেগে গেছে| বৃষ্টি কমে গেছে, মাছ নেই, শাপলা নেই| চলো আবার বিলে জল ফিরিয়ে আনি| তার উদ্যোগে খালের মুখ আবার খোলা হলো, মাটি সরানো হলো| একটু একটু করে জল জমল, পাখিরা ফিরল| আর একদিন, এক সকালে, কায়েস দেখল জলে একটা ছোট্ট লাল কুঁড়ি ফুটেছে! কায়েসের চোখে জল এসে গেল|
সে ধীরে ধীরে বলল, তোমরা ফিরেছো… আমি প্রতিশ্রুতি রেখেছি|
বাতাসে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠ, না কায়েস, তুমি শুধু প্রতিশ্রুতি রাখোনি, তুমি প্রকৃতিকে ফিরিয়ে এনেছো|
তারপর থেকে আলিপুর প্রতি বছর ‘প্রকৃতি দিবস’ পালন করা হয়|
সেদিন সব শিশু শপথ নেয়
আমরা গাছ কাটব না
জলাভূমি রক্ষা করব ,
বাংলা মোদের মাতৃভূমি
প্রকৃতিকে ভালোবাসব|





















































