ফিচার এলাটিং বেলাটিং

পালতোলা সোনার তরী

ফারুক হোসেন সজীব »

গ্রামের নাম চরনগর| গ্রামের একপাশ দিয়ে বয়ে গেছে বিশাল এক নদী| সেই নদী যেন গ্রামের মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস| ভোর হলে নদীর বুক থেকে কুয়াশা উঠে আসত| দূর থেকে মাঝিদের গান ভেসে আসত আর নদীর বুকজুড়ে ভেসে বেড়াত অসংখ্য পালতোলা নৌকা| সাদা পালগুলো দূর থেকে দেখতে ঠিক পাখির ডানার মতো লাগত| কখনো মনে হতো নদীর উপর সাদা মেঘ নেমে এসেছে| কখনো মনে হতো বিশাল সব রাজহাঁস পানির ওপর ভেসে যাচ্ছে| ছোট্ট ইমন প্রতিদিন বিকেলে নদীর ধারে বসে সেই নৌকাগুলো দেখত| তার সবচেয়ে প্রিয় ছিল দাদুর নৌকা| পুরোনো কাঠের ˆতরি পালতোলা নৌকা| নাম সোনার তরী| ইমনের দাদু আবদুল করিম ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে পুরোনো মাঝিদের একজন| ওনার মুখে ছিল সাদা দাড়ি| দেখতে গুরুগম্ভীর | তিনি ছোটবেলা থেকেই নদীতে নৌকা চালিয়েছেন| নদীর প্রতিটি ঢেউ যেন তার চেনা|
দাদু প্রায়ই বলতেন, নদী ভীষণ রহস্যময়! নদী খেলা ভীষণ অদ্ভুত| ভাঙা গড়ার খেলা| নদীকে ভয়ও করতে হয়| নদী কখনো মা| কখনো আবার ভয়ংকর ঝড়| ইমন মুগ্ধ হয়ে দাদুর কথাগুলো শুনত| একদিন বিকেলে দাদু নৌকার পাল ঠিক করছিলেন| ইমন পাশে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল| হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করল, দাদু আগের মতো নদীতে পালতোলা নৌকা দেখি না! পালতোলা নৌকাগুলো হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল? দাদু ইমনের কথা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন| তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সময় বদলে গেছে রে! মানুষ এখন দ্রুত চলতে চায়| আগে নদীর সঙ্গে মানুষের বন্ধুত্ব ছিল| এখন নদীর দ্বারা ব্যবসা করতে চায়| ইমন দাদুর কথাটি পুরো বুঝতে পারল না| সে শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে রইল| দূরে একটা বড় ট্রলার কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চলে যাচ্ছিল| তার বিকট শব্দে নদীর পানি কেঁপে উঠছিল| কয়েকটা ছোট মাছ লাফিয়ে উঠল পানির উপর| দাদু মাথা নাড়িয়ে বললেন, এই শব্দ নদীর ভালো লাগে না| নদীর মাছগুলোও পছন্দ করে না| পরদিন খুব ভোরে দাদু ইমনকে নিয়ে নদীতে বের হলেন| সূর্য তখনও আলো ছড়ায়নি| নদীতে বাতাস ধীরে ধীরে বইছিল| দাদু সোনার তরীর পাল তুলে দিলেন| সঙ্গে সঙ্গে সাদা পালটা ফুলে উঠল| নৌকাটা ধীরে ধীরে এগোতে লাগল| ইমনের মনে হলো নৌকাটা যেন পানির উপর উড়ছে| সে আনন্দে বলে উঠল, দাদু! মনে হচ্ছে আমরা আকাশে উড়ছি! দাদু হেসে বললেন, পালতোলা নৌকার সৌন্দর্য এখানেই| এটা জোর করে চলে না| বাতাসকে বন্ধু বানিয়ে চলে|
নদীর মাঝখানে গিয়ে দাদু পুরোনো দিনের গল্প বলতে লাগলেন| একসময় এই নদীতে শত শত পালতোলা নৌকা চলত| দূর দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসত| মাঝিরা সারারাত গান গাইত| বর্ষাকালে নদীর বুকজুড়ে শুধু পাল আর পাল দেখা যেত| সন্ধ্যায় নদীর দুই পাড়ে ছোট ছোট কুপির আলো জ্বলত| বাতাসে ভেসে আসত ˆবঠার শব্দ| তখন নদীটা আরও সুন্দর দেখাত| কিন্তু এখন আর সেই নদীর জৌলুস নেই| যতই দিন যেতে লাগল| নদীর চেহারা বদলাতে লাগল| গ্রামের মানুষ একে একে তাদের পুরোনো নৌকা বিক্রি করে দিল| কেউ ইঞ্জিনচালিত ট্রলার কিনল| কেউ শহরে চলে গেল| নদীর ঘাটে পড়ে থাকত ভাঙা নৌকার কাঠ| কোথাও ছেঁড়া পাল বাতাসে উড়ত| একদিন ইমন দেখল, পাশের গ্রামের রহিম কাকা নিজের পালতোলা নৌকা কেটে ফেলছেন| ইমন দৌড়ে গিয়ে বলল, কাকা নৌকাটা ভাঙছেন কেন? রহিম কাকা থেমে গেলেন| তারপর ধীরে বললেন, কী করব বাবা| এই নৌকায় আর সংসার চলে না| মানুষ এখন দ্রুত যেতে চায়| কেউ আর ধীরে চলা নৌকায় চড়ে না| উনার কণ্ঠে ছিল কষ্ট| সেদিন রাতে ইমন নদীর ধারে বসে ছিল| আকাশে অগণিত তারা| নদীর পানি কালো হয়ে আছে| সে দাদুকে জিজ্ঞেস করল, তবে কি এক সময় পালতোলা নৌকাগুলো হারিয়ে যাবে? দাদু দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকলেন| তারপর আস্তে বললেন, হয়তো যাবে! পৃথিবীতে পুরোনো জিনিস বেশিদিন থাকে না| সময় বদলে যায় সাথে সবাই বদলাতে শুরু করে| দাদুর কথা শুনে ইমনের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল! তারপর কিছুদিনের মধ্যেই বর্ষা এল| নদীর পানি ফুলে উঠল| স্রোত বেড়ে গেল| প্রায় প্রতিদিন আকাশ কালো হয়ে থাকত| এক সন্ধ্যায় ভয়ংকর ঝড় শুরু হলো| বাতাসে গাছগুলো কাঁপছিল| বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল আকাশে| নদী তখন উত্তাল| দাদু তখনও নদীতে| ইমন বারবার ঘাটে গিয়ে দাঁড়াচ্ছিল| তার বুক কাঁপছিল ভয়েতে| মা বললেন, চিন্তা করিস না! তোর দাদু নদীর মানুষ! ওনার কিছু হবে না! কিন্তু ঝড় আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল| হঠাৎ দূরে নদীর অন্ধকারে ছোট্ট একটা আলো দেখা গেল| সোনার তরী ফিরছে| ইমন আনন্দে চিৎকার করে উঠল, দাদু এসেছে! কিন্তু ঠিক তখনই বিশাল এক ঢেউ এসে নৌকাটাকে আঘাত করল! পাল ছিঁড়ে গেল| নৌকাটা কাত হয়ে গেল| মানুষ দৌড়ে এল| সবাই মিলে অনেক কষ্টে দাদুকে তীরে তুলল| কিন্তু সোনার তরী স্রোতের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে দূরে হারিয়ে গেল| ইমন কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করছিল, আমাদের নৌকা! দাদু! আমাদের নৌকা! দাদু কোনো কথা বললেন না| শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন| সেই চোখে এমন কষ্ট ছিল, যা ইমন আগে কখনো দেখেনি| পরদিন সকালে নদীর অনেক দূরে ভাঙা পালের একটা অংশ পাওয়া গেল| কিন্তু পুরো নৌকাটা আর কখনো পাওয়া গেল না| সেদিন দাদু নদীর ধারে বসে ছিলেন অনেকক্ষণ| বাতাসে তার সাদা চুল উড়ছিল| তিনি ধীরে বললেন, শুধু একটা নৌকা না রে ইমন| একটা যুগও ডুবে গেল| তারপর থেকে দাদু আর নদীতে নামতেন না| ইমন প্রায়ই নদীর পাড়ে গিয়ে বসত| কিন্তু এখন নদী আর আগের মতো নেই| সারাদিন ট্রলারের শব্দ| কালো ধোঁয়ায় আকাশ মলিন| মাঝিদের গান নেই| সাদা পাল নেই| নদীটাকে কেমন অসুস্থ লাগে| একদিন ইমন পুরোনো ঘাটের পাশে একটা কাঠের টুকরো খুঁজে পেল| সেটা সোনার তরীর অংশ| সে কাঠটা বুকের কাছে চেপে ধরল| তার মনে পড়ল দাদুর কথা| পালতোলা নৌকা শুধু কাঠ আর পাল না| এর ভিতরে নদীর প্রাণ আছে|
বছর কেটে গেল| ইমন বড় হলো| শহরে পড়াশোনা করল| কিন্তু যখনই সে গ্রামে ফিরত, নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকত অনেকক্ষণ| এক সন্ধ্যায় সে দেখল, সূর্য ডুবে যাচ্ছে নদীর ওপারে| আকাশ লাল হয়ে আছে| বাতাস ধীরে ধীরে বইছে| কিন্তু কোথাও কোনো সাদা পাল নেই| নদী খালি| আকাশ খালি| ইমনের মনও খালি| তার মনে হলো, নদীর গানগুলোও যেন হারিয়ে গেছে| এখন আর কোথাও নদীর গান শুনতে পাওয়া যায় না| সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে! কিন্তু সমস্ত কিছু যেন মুছে দিয়ে যাচ্ছে| মানুষ দ্রুত চলতে শিখেছে| কিন্তু সেই দ্রুততার ভিড়ে হারিয়ে গেছে ধীর, শান্ত আর সুন্দর কিছু জিনিস| হারিয়ে গেছে মাঝিদের গান| হারিয়ে গেছে বাতাসের সঙ্গে মানুষের বন্ধুত্ব| হারিয়ে গেছে নদীর বুকজুড়ে ভেসে থাকা সাদা পালতোলা নৌকা| একদিন হয়তো শিশুরা বইয়ের পাতায় ছবি দেখে জিজ্ঞেস করবে, পালতোলা নৌকা কি সত্যিই ছিল? তখন হয়তো কেউ উত্তর দেবে, হ্যাঁ! ছিল বৈকি! নদীর বুকজুড়ে তারা ভেসে বেড়াত| বাতাসের সঙ্গে কথা বলত| মানুষের জীবন আর ¯^প্ন বহন করত| তারপর একদিন সভ্যতার ভিড়ে পালতোলা নৌকার গল্পও হারিয়ে যাবে! কত সভ্যতা এভাবেই হারিয়ে গেছে! নদীর জলে! নিঃশব্দে! নীরবে!