ফিচার এলাটিং বেলাটিং

পরির চিঠি

মোস্তাফিজুল হক »

মে মাসেরও ঊনিশ দিন চলে গেছে| গরম অসহনীয় হয়ে গেছে| তবে যে এই গরমেও এতটা ধোঁয়াটে চারদিক! ধূসর না হয়ে এ আবার কেমন নীলচে কুয়াশা? এ তবে কি শুধুই মরীচিকা?
বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কতগুলো চকচকে ফিতে বাঁধা মেডেল| যেন দেয়াল রেখে পাখির মতো ডানা মেলে এক অজানা বিষাদের সুরে গেয়ে চলেছে ওসব মেডেল| ভোর থেকেই সময়ের কাঁটা থেমে আছে| সময় আর কোনোভাবেই সামনের দিকে এগোতে পারছে না|
একটা খুদে পরি আকাশ ফেলে এসেছিল| সে এসেছিল এক হৃদয়বান বাবার ঘরে| সে মানুষের ইশকুলে যায়, বাবার জন্য জুস বানিয়ে রাখে, গলা জড়িয়ে ধরে বায়না শোনায়— তখন বাবা অমৃতলোকের সুধা পান করেন|
একদিন সেই পরিটা একাই একটা পাথরের ওপর বসে আছে| ওর ফড়িঙের মতো দুটো হালকা ডানা| ওর কোমল ডানা যেন থেকে থেকে সপ্তবর্ণা দ্যুতি ছড়াচ্ছে| পরিটা এবার ওর ব্যাগটা খুলে কয়েকটা ফিতে বের করল| ওসব ফিতের নিচে ঝালরের মতো ছোটো ছোটো রঙিন সুতো ঝুলছে| মনে হচ্ছে সে এখন ইনকা যুগের অতি বুদ্ধিমান মানবী| সে কি তবে কিপু গাঁথবে? লাল রঙের ফিতের সুতোয় গোলাপ, হলুদ দিয়ে কাঠগোলাপ আর বাদামি রঙের সুতোয় কি কোনো হায়েনার সংখ্যা গিঁট দিয়ে গাঁথবে?
চারদিকটা কেমন নীলচে ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে| মনে হয় কোনো এক কাপাকোচার ছায়া পরিটাকে ঘিরে ফেলেছে! একটা বিশাল বিশ্রী কালো ছায়ামূর্তি, যার কোনো আকার নেই| যেন সবার সাথে মিলেমিশে থাকা কোনোএক অদৃশ্য ছায়ামূর্তি!
ছায়ামূর্তির শরীর থেকে হিম হিম শীতল বাতাস ছড়িয়ে পড়ছে| যে ফিতেগুলো পাখি হয়ে কিচিরমিচির করে গান গাইছিল, ওগুলোর কণ্ঠ থেমে গেল| একে একে ওরা ভয় নিয়ে আকাশ থেকে নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে যাচ্ছে| পুরো বাগানটা যেন ভূমিকম্পের থাবায় কাঁপছে|
পরি বিস্ময় নিয়ে কপাল কুঁচকে হাসল| কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘তুমি কি আমার ফিতেগুলো কেড়ে নেবে?’ তারপর মুচকি হেসে বলল, ‘তুমি কাঁপুর সুতো কেড়ে নিয়ে কী আমার ক্লাসে প্রথম হওয়া কেড়ে নিতে পারবে?’
সেই ছায়ামূর্তিটা যেন ছোট্ট পরিকে গিলে ফেলতে চায়| তার আগেই পরি কোমল ডানা দুটো মেলে দিলো| তারপর সে দ্রুত গতিতে ওপরের দিকে উড়ে যেতে শুরু করল| পরি এবার মেঘডুবি ইশকুলের দিকে উড়ে চলল| সে যখন উড়ছিল, তখন তার ডান পা থেকে ছোট্ট জুতোটা নিচে পড়ে গেল|
ধীরে ধীরে সেই নীলচে কুয়াশা আর কালো ছায়ামূর্তি অদৃশ্য হয়ে গেল| পড়ে রইল আলোআঁধারি ঘেরা একটা রহস্যময় ঘর| সেই ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ| দরজার এপাশে পাপোশের ওপর পরির জুতো| রুপালি ফিতের জুতো থেকে যেন হীরার দ্যুতি ঝরে পড়ছে| কোনোএক পরি যেন একটু আগেই শীতের শিশিরের মতো হাসির ফোয়ারা রেখে ¯^র্গের পথে চলে গেছে| পাশের শূন্যঘর থেকে হৃদয়বান বাবার বুকভাঙা কান্নার স্রোত গড়িয়ে যাচ্ছে| সেই স্রোতে ভেসে যাচ্ছে ফিতেয় বাঁধা পরির মেডেল|
বাবা শখ করে পরির নাম রেখেছিলেন রামিসা| রামিসার সাজানো-গোছানো বুক সেলফ আর টেবিল| টেবিলের ওপরে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা মেডেলগুলো কান্নার নোনাজলে ভেসে গেছে| এখন টেবিল আর বুক সেলফ মার্বেল পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে| চাইলেই কেউ সেলফে রাখা পাথুরে বইয়ের পাতা উল্টিয়ে পড়তে পারবে না|
রামিসার বাবা এখন আর কাঁদছেন না| তাঁর চোখের জল উবে গেছে| জলীয়বাষ্প হয়ে মেঘের দেশে উড়ে গেছে| হয়তো সেই জলীয়বাষ্প মেঘের ভিড়ে পরিকে খুঁজতে বেরিয়েছে|
রামিসা ¯^র্গের উদ্যানে এসে মেঘডুবি ইশকুলে ভর্তি হয়েছে| ওর এখন নতুন সকাল, নতুন ইশকুল| এখানে কোনো দানব নেই, নেই কোনো কালো ছায়ামূর্তি| নতুন ইশকুলেও পরি সবার সেরা| সে এই ইশকুলেও প্রথম হয়ে থ্রিতে উঠে গেছে|
বছর ঘুরে আবারও ঊনিশে মে এসে গেল| স্যার ক্লাসে এসে সবার হাজিরা নিচ্ছেন| রোল কল করতেই শ্রেণি কক্ষে মায়ায় ভরা নিরবতা নেমে এলো| তারপর ছোট্ট এক পাটি জুতো পরে ইয়েস স্যার বলে পরি দরজায় দাঁড়াল| তখনও পরির ডানায় যেন ভোরের পৃথিবীর রক্তিম আভা|
স্যার হাসিমুখে পরিকে ভেতরে আসতে বললেন| ক্লাস শেষে তিনি ওর হাতে কৃতী শিক্ষার্থীর মেডেল তুলে দিলেন| পরি তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালায় চোখ রেখে পৃথিবীর দিকে তাকাল| সে খুব ভালো করেই দেখতে পেল, বাবা একা বসে আছেন| পরির মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল| সে ওপর থেকে ওর মেডেলটা নিচে ফেলে দিলো| তার আগে সে খুব সুন্দর করে এক টুকরো কাগজে একটা চিরকুট লিখল| তাতে সে লিখল, ‘বাবা, নির্দয় মানুষের দেশে আর কোনো পরি কখনো ভুল করে আসবে না| আমি তোমার জন্য ¯^র্গের বাগানে এখনো বসে থাকি বাবা|’