বাঙালির জীবনে ঈদ মানেই আনন্দের জোয়ার, নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, প্রতি বছরের মতো এবারও আমাদের উৎসবের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়েছে সড়কের বুক চিরে বয়ে যাওয়া রক্তের স্রোতে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এবারের ঈদের ছুটিতেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৯ জন মানুষ। এই ৭৯টি প্রাণ কেবল সংখ্যা নয়, ৭৯টি পরিবার। কারো উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন, কারো কোলের সন্তান, আর কারো স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেছে এই ছুটির দিনগুলোতে। উৎসবের সমান্তরালে সড়কের এই অন্তহীন মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একে আর দুর্ঘটনা বলা চলে না; বরং এটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড।
এই মরণফাঁদের নেপথ্যে রয়েছে বহুস্তরীয় অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা। প্রথমত, চালকদের চরম অদক্ষতা এবং লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা এর অন্যতম প্রধান কারণ। উৎসবের মৌসুমে বাড়তি ট্রিপ মেরে অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় পরিবহন মালিকরা অদক্ষ, লার্নার লাইসেন্সধারী কিংবা ক্লান্ত চালকদের হাতে দূরপাল্লার গাড়ির স্টিয়ারিং তুলে দেন। একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালানোর ফলে চালকের ক্লান্তি ও ঘুম-ঘুম চোখ নিয়ে ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতাই এই ট্র্যাজেডিগুলোকে ডেকে আনে। দ্বিতীয়ত, ফিটনেসবিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের অবাধ চলাচল। মহাসড়কে চলাচলের অনুপযোগী গাড়িগুলো উৎসবের সময় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা ‘ম্যানেজ’ করে রাস্তায় নেমে পড়ে। ব্রেক ফেইল, টায়ার বার্স্ট কিংবা স্টিয়ারিং লক হয়ে যাওয়ার মতো যান্ত্রিক ত্রুটির মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।
সবচেয়ে বড় দায় কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতার। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং হাইওয়ে পুলিশের যে তৎপরতা উৎসবের দিনগুলোতে দৃশ্যমান হওয়ার কথা ছিল, তা মাঠপর্যায়ে চরমভাবে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। মহাসড়কে নিষিদ্ধ ঘোষিত থ্রি-হুইলার, নসিমন, করিমন এবং অনভিজ্ঞ চালকদের মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতি রুখতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগে রয়েছে শৈথিল্য ও দুর্নীতির কালো ছায়া। চালক ও মালিক সমিতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের কাছে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বারবার জিম্মি হয়ে পড়ছে।
এই মরণকূপ থেকে উত্তরণের পথ আমাদের জানা, প্রয়োজন কেবল কঠোর সদিচ্ছা। প্রথমত, মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অবৈধ থ্রি-হুইলার চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালকদের লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও আধুনিকায়ন করা জরুরি এবং তাদের কাজের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। তৃতীয়ত, আইন অমান্যকারী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন চালকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে আইনকে ভয় পাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়। সর্বোপরি, বিআরটিএ এবং হাইওয়ে পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং মহাসড়কগুলোতে সিসিটিভি নজরদারি ও স্বয়ংক্রিয় গতি পরিমাপক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
সড়ক রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু একক কোনো সংস্থার নয়, এটি একটি সম্মিলিত রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত। আমরা আর কোনো মায়ের বুক খালি হতে দেখতে চাই না, কোনো উৎসবের রঙ রক্তে রঞ্জিত হতে দিতে চাই না। এবারের ঈদে ঝরে যাওয়া ৭৯টি প্রাণ যেন আমাদের নীতিনির্ধারকদের বিবেককে জাগ্রত করে। অবিলম্বে সড়ক ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন এনে মানুষের যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করা হোক—এটাই আজকের সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।
মতামত সম্পাদকীয়






















































