সুপ্রভাত ডেস্ক >>
চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানা ঘিরে চলছে মামলাবাণিজ্য। সন্ত্রাসীবিরোধী আইনের মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় নিরীহ লোকজনকে আসামি করে হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি আসামি বাবাকে না পেয়ে কলেজপড়ুয়া ছেলেকে হয়রানি করার মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে পুলিশ। থানা পুলিশকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হচ্ছেন কেউ কেউ। আর যারা টাকা দিতে পারছেন না, তারা এখন অনেকেই এলাকাছাড়া।
একটি ঘটনায় দেখা গেছে, সরকারবিরোধী মিছিলের চেষ্টা করছিল ১০-১৫ জন। অথচ মামলায় সুনির্দিষ্ট ৩৬ জনসহ ৮৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতা ও এমপির ঘনিষ্ঠ লোকজন ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত শত্রুতা হাসিল করতে প্রতিপক্ষের লোকজনকে মামলায় ফাঁসাচ্ছে। এ নিয়ে পুরো চান্দগাঁও এলাকায় সাধারণ ও নিরীহ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
জানা যায়, ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলন চলাকালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় চান্দগাঁও থানায় ১৪টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলো তদন্তাধীন আছে। আর এখন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হচ্ছে। এসব মামলায় অনেকের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
জানা গেছে, গত ২৫ জুলাই বহদ্দারহাট বাসি টার্মিনাল স্বাধীনতা পার্কের সামনে আওয়ামী লীগের ১০-১৫ জন নেতাকর্মী মিছিল বের করার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চারজন এবং আশপাশ থেকে আরও ৯ জনসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় ২৬ জুলাই চান্দগাঁও থানায় সন্ত্রাসীবিরোধী আইনে মামলা হয়। পুলিশের এসআই (নিরস্ত্র) হৃদয় মাহমুদ লিটন মামলাটি করেন।
এজাহারে ২৮ নম্বর আসামি করা হয় মোহাম্মদ হারুন নামে বহদ্দারহাট স্বজন সুপার মার্কেটের একজন ব্যবসায়ীকে। তার বাড়ি চান্দগাঁও থানার ঢালিপাড়া এলাকায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হারুন কোনো রাজনীতির সঙ্গে কখনোই জড়িত ছিলেন না। স্বজন সুপার মার্কেটে নিজ মালিকানাধীন ‘জনাবা ক্লথ স্টোর’ নামে একটি কাপড়ের দোকান চালান। হারুন জানান, তিনি সকাল ১০টায় দোকানে আসেন ও রাত ১০টায় বের হন। গত ১৫-১৬ বছর ধরে দোকান চালাচ্ছেন। কিন্তু মামলার আসামি করায় আর দোকানে বসতে পারছেন না। তার অনুপস্থিতিতে কলেজপড়ুয়া ছেলে তামজিদ দোকানে বসছিলেন। পরে পুলিশ ফের অভিযান চালালে তামজিদ কোনোমতে পালিয়ে বাঁচেন।
সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র তামজিদ জানান, ‘পুলিশি হয়রানির ভয়ে আব্বু বসতে না পারায় আমি দোকানে বসি। রুটি-রুজির তাগিদে আমাকে বসতে হচ্ছে। কিন্তু আব্বুকে না পেয়ে পুলিশ এখন আমাকেও খুঁজছে। এ কারণে আমিও আর দোকানে বসতে পারছি না।’
দোকান কর্মচারী আসিফ জানান, ‘জাফর আহম্মদ নামে চান্দগাঁও থানার এক এসআই দোকানে এসে প্রথমে হারুন সাহেবকে পরে তার ছেলে তামজিদকে খুঁজতে থাকেন। না পেয়ে বাসা ঘেরাও করার হুমকি দেন।’
তবে তদন্ত কর্মকর্তা জাফর আহম্মদ বলেন, ‘আমি মামলার আসামি হারুনকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। তাকে না পেয়ে তার ছেলের খোঁজও করেছি। তবে গ্রেফতারের জন্য নয়, তথ্য নেওয়ার জন্য।’
স্বজন সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন লিটন ও সদস্যসচিব নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া নিশ্চিত করেছেন হারুন কোনো রাজনীতি করেন না। তাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে।
ঢালিপাগাড় জামে মসজিদ ও সমাজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি বশির আহম্মদ ও সাধারণ সম্পাদক দিদারুল ইসলাম বলেন, এলাকায় হারুনের সুনাম রয়েছে। তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জড়িয়ে পুলিশ হয়রানি করছে।
একইভাবে মামলার ৩১ নম্বর আসামি করা হয়েছে চান্দগাঁও থানাধীন হামিদচর এলাকার মোহাম্মদ ইউসুফের ছেলে ইকবালকে।
ইকবালের বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘আমার ছেলে ঘটনাস্থলে ছিল না। আদৌ এ ধরনের কোনো মিছিলের চেষ্টা হয়েছিল কি-না তাও তারা জানেন না। এরপরও পুলিশ তার ছেলেকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আসামি করেছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমি টুকটাক গার্মেন্ট এক্সেসরিজের ব্যবসা করি। সেই ব্যবসা হাতিয়ে নিতেই স্থানীয় এমপির লোকজন মিথ্যা মামলায় আমার ছেলেকে আসামি করেছে।’ স্থানীয় বিএনপি নেতা ওসমান ও আবদুর রহিমসহ এমপির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন লোক প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে পুলিশের সঙ্গে হাত করে মিথ্যা মামলায় জড়াচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দিন বলেন, বাবাকে না পেয়ে ছেলেকে গ্রেফতার বা খোঁজার কোনো সুযোগ নেই। মামলা নিয়ে পুলিশ ব্যবসা করছে-এমন অভিযোগ মিথ্যা।




















































