চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল এ অঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তির শেষ ভরসাস্থল। দূর-দূরান্ত থেকে অতিদরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে এখানে আসেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে উঠে আসা চমেক হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য আদালতের তদন্তের নির্দেশ যেন এক রূঢ় সত্যকে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। অসুস্থ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কীভাবে একশ্রেণীর মানুষ পৈশাচিক বাণিজ্যে মেতে উঠতে পারে, চমেক হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট তারই এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ।
অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের নিজস্ব সরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে কৃত্রিম উপায়ে অচল করে রাখা হয়, কিংবা নানা অজুহাতে সেগুলোর সেবা থেকে সাধারণ রোগীদের বঞ্চিত করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই—রোগী ও তাদের স্বজনদের বেসরকারি বা অবৈধ অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের পকেটে ঠেলে দেওয়া। এই সিন্ডিকেট শুধু গলাকাটা ভাড়াই আদায় করছে না, বরং অনেক সময় হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে এক ধরনের জিম্মি দশা তৈরি করে রেখেছে। অ্যাম্বুলেন্সের সিট পাওয়ার জন্য দালালদের পা ধরতে হয় অসহায় স্বজনদের, আর মুমূর্ষু রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নিতে গুনতে হয় স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি ভাড়া। এই যে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের পকেট কাটার মহোৎসব, একে স্রেফ দুর্নীতি বললে ভুল হবে; এটি আসলে এক চরম অমানবিকতা ও মানবতার দেউলিয়াত্ব।
এই দমবন্ধকর পরিস্থিতির মুখে বিজ্ঞ আদালতের তদন্তের নির্দেশ একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ। আদালত যখন কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ ও মানবিক সংকটে স্বপ্রণোদিত হয়ে বা রিটের ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করেন, তখন বুঝতে হবে যে প্রচলিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। চমেক হাসপাতালের মতো একটি সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের অরাজকতা কীভাবে প্রশাসনের চোখের সামনে চলে আসছিল, তা এক মস্ত বড় প্রশ্ন। এই তদন্তের নির্দেশ কেবল অপরাধীদের চিহ্নিত করার জন্য নয়, বরং আমাদের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রশাসনিক নজরদারিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি শেষ সুযোগ।
আমরা আশা করি, আদালতের এই নির্দেশ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। একটি নিরেট, প্রভাবমুক্ত এবং সুক্ষ্ম তদন্তের মাধ্যমে এই অশুভ চক্রের মূল উপড়ে ফেলা দরকার। এই সিন্ডিকেটের পেছনে শুধু বাইরের দালাল বা চালকরাই জড়িত নয়, হাসপাতালের ভেতরের কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন রয়েছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা জরুরি। ভেতরের কালো হাতগুলোকে না কাটলে বাহ্যিক কোনো সংস্কার স্থায়ী ফল দেবে না।
চিকিৎসা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জরুরি পরিবহন বা অ্যাম্বুলেন্স সেবা। চমেক হাসপাতালকে এই সিন্ডিকেটের থাবা থেকে মুক্ত করতে হলে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বাড়াতে হবে, সেগুলোর সার্বক্ষণিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে এবং একটি স্বচ্ছ ও ডিজিটাল বুকিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। আদালতের এই চাবুক যেন চমেক হাসপাতাল তথা দেশের পুরো স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি কঠোর বার্তা হয়—অসহায় মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দিন এবার শেষ হওয়া দরকার। চমেক হাসপাতাল আবার সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।



















































