সনেট দেব »
২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেওয়ার পথে চিরবিদায় নিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা। ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি মাত্র সাতান্ন বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও রেখে গেছেন এমন এক চিন্তাভাণ্ডার, যা আজও বাংলাদেশের সাহিত্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতি-আলোচনায় সমান প্রাসঙ্গিক। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা শেষে তাঁকে মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পাশে দাফন করা হয়েছিল। আজ, তাঁর প্রয়াণের পঁচিশ বছর পর, আমরা যখন তাঁকে স্মরণ করছি, তখন সেই স্মরণ শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে নাÑদরকার তাঁর চিন্তার গভীরে প্রবেশ করা।
চট্টগ্রামে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে আহমদ ছফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর ভেতরে জন্ম নিয়েছিল প্রশ্ন করার সাহস, প্রচলিত ধ্যানধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার প্রবণতা। এই প্রবণতাই পরবর্তী জীবনে তাঁকে করে তুলেছিল বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের এক নিঃসঙ্গ অথচ অবিচল কণ্ঠস্বর। আহমদ ছফাকে কোনো একক পরিচয়ে বেঁধে ফেলা কঠিন। তিনি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং রাজনৈতিক চিন্তকÑএকইসঙ্গে সবগুলো ভূমিকায়। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক থেকে শুরু করে সলিমুল্লাহ খানের মতো পণ্ডিতেরা মনে করেন, মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি মুসলমান লেখক আহমদ ছফা। তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে বাংলাদেশি জাতিসত্তার সন্ধান, আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন।
আহমদ ছফার চিন্তার কেন্দ্রে সবসময় ছিল একটি প্রশ্নÑবাঙালি মুসলমান হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয় আসলে কী? তিনি মনে করতেন, ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি জাতির প্রকৃত পরিচয়, আর সেই পরিচয়কে ভিত্তি করেই গড়ে উঠতে পারে প্রকৃত সাংস্কৃতিক জাগরণ। তাঁর কাছে বাংলাদেশ কোনো নিছক রাজনৈতিক সীমারেখা ছিল না; বরং এটি ছিল এক আত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রকল্প, যার ভিত্তি হওয়া উচিত মানুষের মর্যাদা, ন্যায্যতা ও সাম্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি ও সংস্কৃতি একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়Ñবরং একে অপরের পরিপূরক, প্রায় ভাইবোনের মতো সম্পর্কযুক্ত। রাজনীতিতে যদি স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদ শিকড় গাড়ে, তাহলে সাংস্কৃতিক অগ্রগতির কোনো সুযোগই থাকে না বলে মনে করতেন তিনি।
এই ভাবনারই সম্প্রসারণ হিসেবে তিনি ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রশ্নেও ছিলেন স্পষ্টবাদী। গারো, হাজং, চাকমা, মগ কিংবা উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীÑসবাইকে পূর্ণ মানবিক মর্যাদা দেওয়ার কথা তিনি বারবার বলেছেন। তাঁর মতে, মানুষকে প্রকৃত মর্যাদা না দিয়ে কোনো শ্রদ্ধেয় সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এই উদারতা, এই অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সমসাময়িক অনেক চিন্তকের চেয়ে আলাদা করে তোলে।
আহমদ ছফার সবচেয়ে তীক্ষè সমালোচনার জায়গা ছিল দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ। পাকিস্তান আমলে ক্ষমতার তোষামোদ করা বুদ্ধিজীবীরা স্বাধীনতার পরেও একই আচরণ অব্যাহত রেখেছেনÑএই পর্যবেক্ষণ তাঁকে গভীরভাবে পীড়া দিত। তাঁর ভাষ্যে, জাতির সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, যাঁরা চিন্তার দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই মেরুদণ্ডহীন। একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড ভেঙে গেলে সেই জাতি দিশাহীন হয়ে পড়েÑএই সতর্কবাণী আজও যেন প্রাসঙ্গিক, বিশেষত যখন চিন্তাবিদেরা দলীয় আনুগত্যে সত্যকে আড়াল করেন।
১৯৭২ সালে গণকণ্ঠ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় তাঁর আলোচিত গ্রন্থ বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, যা সাহিত্য-সমাজে রীতিমতো আলোড়ন তোলে। সরকার, বুদ্ধিজীবী মহল এমনকি লেখক সমাজও তাঁর তীক্ষè পর্যবেক্ষণের সামনে অনেকটাই নিরুত্তর হয়ে পড়েছিল, কারণ তিনি এমন সব অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরেছিলেন যা অধিকাংশ মানুষ এড়িয়ে যেতে চাইতেন। এই বইয়ে এবং পরবর্তীতে বাঙালি মুসলমানের মন গ্রন্থে তিনি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান শ্রেণির মনস্তত্ত্ব, তাদের ঐতিহাসিক দ্বিধা এবং জাতীয় সংকট। তিনি দেখিয়েছিলেন, কীভাবে পাকিস্তান আমলে অনেক বাঙালি বুদ্ধিজীবী জাতীয় স্বার্থের বদলে ব্যক্তিস্বার্থ বেছে নিয়েছিলেন, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মতো সংকটকালেও দ্বিধাগ্রস্ত থেকেছেন। এই দুই গ্রন্থ কোনো দল বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ নেয়নি; বরং সব ধরনের পক্ষপাতিত্ব ও সুবিধাবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ছফার উপন্যাস কখনোই ইতিহাসের নিছক আশ্রিত হয়ে থাকেনি; বরং ব্যক্তিমানুষের ভেতর দিয়ে ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলেছে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে লেখা ওঙ্কার উপন্যাস প্রসঙ্গে কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেছিলেন, এই উপন্যাসে একটি জনগোষ্ঠীর সম্পূর্ণ জাতিতে পরিণত হওয়ার সংকল্প ঘোষিত হয়েছে। অলাতচক্র উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের যে ছবি তিনি এঁকেছিলেন, তা যেন পরবর্তী বাস্তবতার সঙ্গে আশ্চর্যরকম মিলে যায়। এ ছাড়া গাভী বিত্তান্ত উপন্যাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অপরাজনীতি নিয়ে তাঁর তীক্ষè সমালোচনা উঠে আসে, আর মরণবিলাস-এ মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থাকা এক রাজনীতিকের জবানিতে ফুটে ওঠে ক্ষমতার কদর্য রূপ। শিক্ষা, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষা, ছিল তাঁর আরেকটি বড় ভাবনার জায়গা। তাঁর নিহত নক্ষত্র গল্পে ফুটে ওঠা ষাটের দশকের অরাজক শিক্ষাব্যবস্থার ছবি আজও যেন আমাদের ক্যাম্পাসগুলোয় প্রতিধ্বনিত হয়।
আহমদ ছফার ব্যক্তিজীবন ছিল এক অর্থে বেদনার, অন্য অর্থে বীরত্বের। সংসারজীবনে তিনি কখনো প্রবেশ করেননি, কিন্তু মানুষকে ভালোবেসেছেন প্রায় পিতৃসুলভ মমতায়। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন আশ্রয়স্থল, বন্ধু, শিক্ষক ও অভিভাবক একইসঙ্গে। তিনি মনে করতেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার তরুণদের মধ্যে, আর ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে তুলবে এক চিন্তাশীল, মানবিক ও প্রতিবাদী প্রজন্ম। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি তরুণদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতেন, আড্ডায়-আলোচনায় তাদের প্রশ্ন করতে শেখাতেন, প্রচলিত মতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগাতেন। সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় তাঁর সাবলীল বিচরণ ছিল লক্ষণীয়। উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, সমালোচনা, এমনকি অনুবাদেও তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর। তাঁর ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু বিষয়ের গভীরতা ছিল অতল। এই কারণেই তাঁর লেখা পাঠককে কেবল আলোকিতই করে না, একইসঙ্গে খোঁচাও দেয়, ভাবতে বাধ্য করে। জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আহমদ শরীফের মূল্যায়নে, সুবিধাবাদীর আপসকামী দর্শনে ছফার কোনো আস্থা ছিল না, আর আজকের বাংলাদেশে এমন আরও কয়েকজন স্পষ্টভাষী মানুষ থাকলে শ্রেয়তর পথ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত।
সমসাময়িক অনেক লেখক যখন পদক-পদবি আর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির পেছনে ছুটেছেন, তখন আহমদ ছফা হেঁটেছেন সম্পূর্ণ উল্টো পথে। জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁকে বর্ণনা করেছিলেন এক অসাধারণ শক্তিধর লেখক হিসেবে, আর জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের চোখে তাঁর রচনাবলি ছিল রীতিমতো এক গুপ্তধনের ভাণ্ডার। এই স্বীকৃতিগুলো নিছক সৌজন্যমূলক প্রশংসা ছিল নাÑবরং তাঁর কাজের গভীরতা ও সততার প্রতি সমকালীন মেধাবীজনদের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মান। ছফা নিজে কখনো কোনো সংখ্যাগুরু চিন্তাধারার অংশ হননি। তিনি ছিলেন শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের পক্ষে কলম ধরা এক বিরল লেখক, যাঁর অবস্থান সাহিত্যে, সাংবাদিকতায় কিংবা বক্তৃতায়Ñসবখানেই ছিল অবিচল। তাঁর কাছে লেখকের কাজ কেবল সাহিত্য রচনা নয়; বরং সময়ের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ব্যক্তিজীবনে ছফা ছিলেন আজীবন সংগ্রামী। চিরকুমার এই মানুষটি নিজের লেখালেখির আয়ের বাইরে অন্য কোনো উপার্জনের পথ রাখেননি, ফলে দারিদ্র্যরে সঙ্গে তাঁকে লড়তে হয়েছে শেষদিন পর্যন্ত। তবু ভাই-বোন, ভাগ্নে-ভাইপোদের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা ছিল গভীর। প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যিক মহলের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব ছিল প্রায় নিয়মিত ঘটনাÑকারণ সুবিধাবাদ আর আপসের রাজনীতি তিনি কখনো মেনে নেননি। এমনকি লেখক শিবির পুরস্কার ও বাংলা একাডেমির সাদত আলী আখন্দ পুরস্কারও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহারের ভাষায়, আহমদ ছফাকে শুধু সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিচার করাটাই একধরনের ভুলÑতিনি নিজেই একটি ঘটনা। আর প্রাবন্ধিক সরদার ফজলুল করিমের মূল্যায়নে, ছফা কেবল পাঠ করার বিষয় নন, চর্চা করারও বিষয়।
২০০১ সালে যখন তিনি মারা যান, তখন রাজনৈতিক কারণে তাঁকে মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের মূল অংশে দাফন করতে দেওয়া হয়নি; পাশের এক টুকরো জমি কিনে সেখানেই সমাহিত করা হয়েছিল তাঁকে। ২০০২ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়। দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে অবশেষে তাঁর দেহাবশেষ মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের মূল অংশে স্থানান্তর করা হয়েছেÑএকধরনের বিলম্বিত স্বীকৃতি, যা মনে করিয়ে দেয় সত্যভাষী মানুষদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ কতটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আহমদ ছফা ছিলেন একা, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ ছিল লাখো মানুষের প্রতিনিধি। সাহিত্যের আরামদায়ক প্রাসাদে বন্দী না থেকে তিনি ছিলেন মাঠে, মিছিলে, প্রতিবাদে। চারপাশের মানুষ যখন নিশ্চুপ থেকেছে, তখন তিনি উচ্চারণ করেছেন অপ্রিয় সত্যÑতা যত অস্বস্তিকরই হোক না কেন। এই সাহসের মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে নিঃসঙ্গতা দিয়ে, দারিদ্র্য দিয়ে, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা দিয়েÑএমনকি মৃত্যুর পরও সম্মানজনক সমাধিস্থল পেতে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে পঁচিশ বছর। যতদিন এই দেশে ন্যায়, সত্য ও মানবিকতার প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক থাকবে, ততদিন আহমদ ছফাও থেকে যাবেন সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর নিজের ভাষাতেই বলা যায়, চরিত্রের যা কিছু মহৎ ও সত্য, তার ওপর দাঁড়িয়েই একটি জাতি তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেÑআর সেই নির্মাণকাজে আহমদ ছফা চিরকালই থেকে যাবেন এক অবিচল প্রেরণা।














































