সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে জানা গেল, তীব্র জনবল সংকটে ধুকছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল। স্টেশন মাস্টার থেকে শুরু করে গেটকিপার, পয়েন্টসম্যান ও লোকোমাস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ট্রেন পরিচালনা ও যাত্রীসেবা। বন্ধ রয়েছে পূর্বাঞ্চলের ৫৩টি রেলস্টেশন। সংকট মোকাবিলায় নাজিরহাট লোকালসহ ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে বর্তমানে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কোনো আকস্মিক বিপর্যয় নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা, সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। সম্প্রতি প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, স্টেশন মাস্টার, লোকোমাস্টার, পয়েন্টসম্যান ও গেটকিপারের মতো বিকল্পহীন পদগুলোর প্রায় অর্ধেকই শূন্য। পর্যাপ্ত কর্মীর অভাবে পূর্বাঞ্চলের অন্তত ৫৩টি রেলস্টেশন সম্পূর্ণ ও আংশিক বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। কোনো সেবামূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি অত্যন্ত হতাশাজনক চিত্র।
রেল পরিষেবা কেবল যাত্রীদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম নয়, এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ গুরুত্বপূর্ণ পদে লোকবল না থাকায় সেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ট্রেন পরিচালনায় মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একজন চালক কিংবা স্টেশন মাস্টারের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ সৃষ্টি করা মানে সরাসরি যাত্রী নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা। অন্যদিকে বন্ধ থাকা স্টেশনগুলোর সিগন্যাল রুম ও টিকিট কাউন্টারে তালা ঝুলতে থাকায় একদিকে যেমন রাজস্ব আয় কমছে, তেমনি কোটি কোটি টাকার মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি ও যন্ত্রপাতি চুরি কিংবা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। ভূ-সম্পত্তি বিভাগেও প্রায় ৬৮ শতাংশ পদ শূন্য থাকায় রেলের হাজার হাজার একর জমি হাতছাড়া ও দখলের মুখে পড়ছে।
এই সংকট নিরসনে ছয়টি নতুন ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, যার মাধ্যমে বেসরকারি পরিচালিত ট্রেনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৪টিতে। সাময়িকভাবে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি কিংবা টিকিট কালোবাজারি বন্ধের যুক্তিতে এটি একটি তড়িঘড়ি সমাধান মনে হতে পারে, তবে তা মূল সমস্যার স্থায়ী পথ নয়। জাতীয় এই পরিবহন খাতকে কেবল বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল করে তুললে দীর্ঘমেয়াদে তা রেলের নিজস্ব অবকাঠামোকে আরও দুর্বল করে তুলবে।
বর্তমান পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে হলে রেলওয়েকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নিয়ে এগোতে হবে। প্রথমত, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুততম সময়ে শূন্য পদগুলোতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালক বা লোকোমাস্টারদের বন্ধ হয়ে যাওয়া মাইলেজ সুবিধাসহ ন্যায্য দাবিগুলো পুনঃবিবেচনা করে তাদের কাজের প্রেরণা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
একটি নিরাপদ, গণমুখী ও নির্ভরযোগ্য ট্রেন সেবা নিশ্চিত করতে জনবল সংকটের মতো মৌলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের দাবি। অবহেলা ও তালি দেওয়া ব্যবস্থাপনার সংস্কৃতির ইতি টেনে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলকে পুনরায় কার্যকর করে তুলতে সরকার অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা।
মতামত সম্পাদকীয়




















































