ফিচার এলাটিং বেলাটিং

ডাকবাক্স আর খামের সেই সুবাস

নাজমুল হাসান চৌধুরী হেলাল »

কাগজ কেটে খামের মুখ আঠা দিয়ে লাগানোর শৈশব কিংবা নীল রঙের এয়ারমেইল খামের গন্ধ- এসব এখন কেবলই স্মৃতির ড্রয়ারে বন্দি এক যুগের অবশেষ। অথচ একটা সময় ছিল যখন চিঠির জন্য অপেক্ষা করা মানেই ছিল হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া। একটি নির্দিষ্ট দিন, যাকে আমরা ‘চিঠি দিবস’ হিসেবে কল্পনা করতে পারি, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই সোনালী দিনগুলোর কথা, যখন দূরত্ব মাপা হতো ডাক হরকরার পায়ে হাঁটা পথের মাইলে, প্রযুক্তির শীতল স্ক্রিনে নয়।
​আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল যুগে ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের পপ-আপ নোটিফিকেশনে চোখের পলকে বার্তা পৌঁছে যায় ঠিকই, কিন্তু তাতে হাতের লেখার সেই জীবন্ত উষ্ণতা থাকে না। যখন কেউ নিজের হাতে কাগজ কলম নিয়ে বসতেন, তখন প্রতিটি শব্দ লেখার পেছনে গভীর ভাবনা ও আবেগ কাজ করত। কলমের নিবের টান, কালির ফোঁটা, কিংবা কাটার দাগ- সব মিলিয়ে প্রতিটি চিঠি হয়ে উঠত প্রেরকের মনের এক একটি জীবন্ত অবয়ব। চিঠি কেবল তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল দুটি আত্মার মধ্যে অদৃশ্য এক সেতুবন্ধন।
​চিঠির সবচেয়ে বড় জাদু ছিল তার ‘অপেক্ষা’। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা বাজার শব্দ শোনার জন্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকার সেই ব্যাকুলতা আজকের প্রজন্মের কাছে এক রূপকথার মতো মনে হতে পারে। দূরের কোনো শহর থেকে প্রিয়জনের হাতের লেখা খামটি হাতে পাওয়ার পর বুকভরা আনন্দ নিয়ে সিলগালা খামটি খোলা, তারপর পাতার পর পাতা পড়ে যাওয়ার সেই আনন্দ ছিল অতুলনীয়। খামের গায়ে জমে থাকা ডাকটিকিট আর সিলমোহর দেখে বোঝা যেত চিঠিটি কোন পথ পেরিয়ে কার হাত হয়ে এসেছে। অনেক সময় চিঠির ভাঁজে লুকিয়ে থাকত শুকনো মোরগফুল, রজনীগন্ধা কিংবা প্রিয় কোনো কবিতা, যা আজও স্মৃতির সিন্দুকে অমলিন সুবাস ছড়ায়।
​মাঝে মাঝে পুরনো অ্যালবামের মতো জমানো চিঠির প্যাকেটগুলো নাড়াচাড়া করলে মনে হয়, সময় বুঝি থেমে আছে কোনো এক অতীত বিকেলে। খামের ওপর বাঁকা হাতের চেনা লেখাগুলো জানান দেয়, আমরা এমন এক সময়ে বেঁচে ছিলাম যখন আবেগ প্রকাশের জন্য গতির চেয়ে আন্তরিকতাই ছিল প্রধান বাহন। প্রযুক্তির এই কৃত্রিম যুগে দাঁড়িয়ে আজ বড় বেশি অনুভব করি সেই ধীরস্থির সময়টাকে। চিঠি দিবস আমাদের হৃদয়ের সেই কোণটাকে নাড়া দিয়ে যায়, যেখানে জমে আছে ফেলে আসা দিনের এক ফালি নস্টালজিয়া।
​কাগজের আয়ু ফুরিয়ে আসছে, ডাকবাক্সগুলো আজ প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে মরিচা ধরছে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে চিঠির আবেদন চিরকালীন। আজও হঠাৎ পুরনো কোনো চিঠি হাতে পেলে মনের অজান্তেই ঠোঁটে হাসি ফোটে, চোখের কোণ ভিজে ওঠে এক অদ্ভুত মায়ায়। চিঠি শুধু কাগজ আর কালির সংযোগ নয়, চিঠি হলো মানুষের ভালোবাসার সবচেয়ে বিশ্বস্ত দলিল।
​গ্রামগঞ্জের অনেক পরিবারে অক্ষরজ্ঞানহীন বা কম শিক্ষিত মানুষগুলো তখন চিঠি লেখার জন্য ভরসা করতেন গ্রামের কোনো শিক্ষিত যুবকের ওপর। খামের ওপর যত্ন করে প্রাপকের ঠিকানা লেখা থেকে শুরু করে ভেতরের কষ্টের কথাগুলো লিখে দেওয়া- সবকিছুতেই একটা সামাজিক মায়া জড়িয়ে থাকত। আবার প্রবাসী স্বামীর বা ভাইয়ের উত্তর আসার পর সেই একই মানুষের কাছে ছুটে যাওয়া, খাম খোলার আনন্দ আর সেই চিঠি পড়ে শোনানোর মুহূর্তগুলো ছিল গ্রামবাংলার চিরচেনা এক দৃশ্য। ডাকপিয়ন এলেই ছোটোছুটি শুরু হয়ে যেত, কার ঠিকানায় কার চিঠি এল তা নিয়ে আগ্রহের অন্ত ছিল না। সরকারি দপ্তরেও ফাইলপত্র আর চিঠির আদান-প্রদানই ছিল দাপ্তরিক কাজের মূল ভিত্তি।
​আজ প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই চিঠির যুগ হারিয়ে গেছে। খাম হয়তো এখনও রয়ে গেছে, কিন্তু তাতে আর মনের কথা লেখা হয় না। খাম এখন রূপ বদলেছে প্রযুক্তির ব্যবহারে অন্যতম এক মাধ্যমে।

---------