সামছুল আলম শিমুল »
সারাদিন ভ্যাপসা গরম। তার ওপর অফিসে দ্বিগুণ কাজের চাপ। সব মিলিয়ে দিনটা ছিল ভীষণ ক্লান্তিকর। অফিস থেকে বেরোতেই প্রতীকের মনে হলো, এখন যদি একটা ঝুম বৃষ্টি নামত! ভিজতে ভিজতেই বাড়ি ফিরতাম। কিন্তু বৃষ্টি তো কারও ইচ্ছেমতো চলে না; সে আসে নিজের খেয়ালে।
বাসে ঝুলে, ধাক্কাধাক্কি সামলে আরও ক্লান্ত হয়ে যখন বাসায় ফিরল, তখনই ঝুম বৃষ্টি নামল।
ছোটবেলা থেকে মায়ের কাছে বৃষ্টিতে ভেজার অনুমতি চেয়ে কখনোই পায়নি সে। এখন অবশ্য কোনো কাজেই মায়ের অনুমতি লাগে না। চাইলে এই মুহূর্তেই বৃষ্টিতে নেমে যেতে পারে। তবু যায় না। জানে, মা রাগ করবেন। হয়তো আজ রাতে একসঙ্গে খাওয়াও হবে না।
প্রতীক গোসল করতে বাথরুমে ঢুকতে যাবে, এমন সময় মা ডাকলেন,
বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে?
প্রতীক একটু চমকে উঠল। তবে মুখে তা প্রকাশ না করে বলল,
না তো, মা।
মা মৃদু হেসে নরম গলায় বললেন,
মিথ্যে বলিস না। চল, আজ মা-ছেলে খুব করে ভিজি। চল, ছাদে যাই।
মা হাত ধরে প্রতীককে ছাদের দিকে নিয়ে চললেন।
যেতে যেতেই প্রতীকের চোখ হঠাৎ দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে গেল।
আজই সেই দিন।
এক মুহূর্তের জন্য তার পা যেন থেমে গেল। অজান্তেই মায়ের হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল সে। মা একবার শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। কিছু বললেন না।
ছাদে উঠে দুজনেই বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়াল। কালো আকাশ থেকে অবিরাম ঝরে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা। মা দুহাত মেলে যেন বৃষ্টিকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। মনে হলো, এতদিনের ভয়, শোক আর অভিমান বৃষ্টির হাতেই তুলে দিচ্ছেন। আর বৃষ্টিও যেন তার সমস্ত স্নেহ ঢেলে দিয়ে মানুষটাকে শান্ত করতে চাইছে।
প্রতীক শুধু একদৃষ্টে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ বারবার জলে ভরে উঠছিল। তবে সেই জল আর বৃষ্টির ফোঁটার কোনো পার্থক্য করা যাচ্ছিল না।
পঁচিশ বছর আগে ঠিক এই দিনেই প্রতীকের বড় ভাই প্রভাত এমনই এক ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে নেমে আর ফিরে আসেনি। পরদিন সকালে লক্ষ্মণদের পুকুরের ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। তারপর থেকে প্রতি বর্ষায় বৃষ্টি নামলেই মা দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে থাকতেন। কাউকে ভিজতে দিতেন না।
আজ, পঁচিশ বছর পর, তিনি প্রথমবারের মতো বৃষ্টির সঙ্গে সন্ধি করলেন।




















































