এ মুহূর্তের সংবাদ

সাতকানিয়ার আল হায়াত হাসপাতালে দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কী?

জনপ্রিয় চিকিৎসকের চেম্বারে তালা, মানববন্ধন

সাতকানিয়া প্রতিনিধি »

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আল হায়াত হাসপাতালকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক সামনে এসেছে। হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও জনপ্রিয় স্ত্রী রোগ ও প্রসূতি রোগের চিকিৎসক ডা. হামিদা ইয়াছমিন জেসির চেম্বারে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া, রোগীদের মানববন্ধন, উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ এবং হাসপাতালের ডাইরেক্টর ও শেয়ারহোল্ডারদের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ—সব মিলিয়ে হাসপাতালটির অভ্যন্তরীণ সংকট এখন প্রকাশ্যে।

-advertise-

একদিকে ডা. জেসির দাবি, পরিকল্পিতভাবে তাকে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, তিনি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। ইতোমধ্যে এসব বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে।

এক নবজাতকের মৃত্যুর পর শুরু বিতর্ক

জানা গেছে, গত ২৮ জুন এক জটিল প্রসূতি ডা. হামিদা ইয়াছমিন জেসির কাছে চিকিৎসার জন্য আল হায়াত হাসপাতালে আসেন। ডা. জেসির ভাষ্য অনুযায়ী, রোগীর অবস্থা জটিল হওয়ায় তিনি হাসপাতালে ভর্তি না করে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

পরে রোগীর স্বজনরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। শেষ পর্যন্ত অন্য একটি হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু হয় এবং প্রসূতির সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়।

ডা. জেসির দাবি, ওই হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম বা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। কিন্তু নবজাতকের মৃত্যুর পরদিন একদল লোক আল হায়াত হাসপাতালে এসে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং তার চেম্বারে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

‘ঘটনা সাজানো’—ডা. জেসির অভিযোগ

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে ডা. হামিদা ইয়াছমিন জেসি দাবি করেছেন, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাহেদ হোসেন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু জাফরসহ কয়েকজন পরিচালক পরিকল্পিতভাবে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন।

তার অভিযোগ, হাসপাতালের একজন চিকিৎসককে তার সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও রক্ষা করার পরিবর্তে কিছু পরিচালক উত্তেজিত লোকজনকে উসকে দিয়েছেন। এমনকি এমডি ডা.জাহেদের মোবাইলে ধারণকৃত ঘটনাস্থলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তার বিরুদ্ধে জনমত তৈরিরও চেষ্টা করা হয়েছে।

জনপ্রিয়তাই কি বিরোধের কারণ?

হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ডা. হামিদা ইয়াছমিন জেসি আল হায়াত হাসপাতালে স্ত্রী রোগ ও প্রসূতি বিভাগে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। তার কাছে রোগীর চাপও তুলনামূলক বেশি।

ডা. জেসির দাবি, চলতি বছরের জুন মাসে তিনি একাই প্রায় ১ হাজার ৯১৭ জন রোগী দেখেছেন এবং ১৪৭টি নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ৩৭টি ছিল সিজারিয়ান।

তার অভিযোগ, এই জনপ্রিয়তা এবং রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধিই হাসপাতালের একটি পক্ষের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য তাকে সরিয়ে অন্য চিকিৎসকের কাছে রোগী স্থানান্তর করা।

তবে এ দাবির স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

রোগীদের মানববন্ধন

গত ২ জুলাই বিকেলে আল হায়াত হাসপাতালের সামনে ডা. জেসির চেম্বার খুলে দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেন এলাকাবাসী ও তার সেবাগ্রহীতারা। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, চেম্বার বন্ধ থাকায় নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং নারী রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।

মানববন্ধনে হাসপাতালের কয়েকজন পরিচালনা পর্ষদের সদস্যও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

হাসপাতালের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আবু জাফর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ডা. হামিদা ইয়াছমিন জেসি হাসপাতালের চিকিৎসক ও পরিচালক হয়েও রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতেন। এতে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছিল।

তিনি দাবি করেন, হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য ভাঙচুর এড়াতেই সাময়িকভাবে চেম্বারে তালা দেওয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে ডা.জেসির কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান এমডি ডা.জাহেদ এবং ডিএমডি জাফরের নির্দেশে তার চেম্বারের তালা লাগানো হয়েছে বলে হাসপাতালের ম্যানেজার জাহেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এ ছাড়া তিনি বলেন, প্রতিটি অপারেশনের জন্য অতিরিক্ত সম্মানীর বিষয়ে মতবিরোধও ছিল।

ডা. জেসির জবাব

ডা. হামিদা ইয়াছমিন জেসি বলেন, অপারেশনপ্রতি হাসপাতাল চালু হবার পর থেকে সার্জনের সহকারি হিসেবে যে পরিমাণ সম্মানি আমাকে এবং হাসপাতালের অন্য একজন ডাইরেক্টর ডা.খাদিজা বেগমকে দেয়া হত তাতে আমাদের কোন দ্বিমত ছিল না। হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময় পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে হওয়া সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে গত আট মাস ধরে একই হারে সম্মানী দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টর হলেও তাকে কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। লেবার ও ডেলিভারি ওয়ার্ডে প্রয়োজনীয় নার্স ও সহায়ক কর্মীও কমিয়ে দিয়ে তার কাজ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।

তার ভাষ্য, “এ হাসপাতাল গড়ে তুলতে আমি দিনরাত শ্রম ও মেধা দিয়েছি। এখন পরিকল্পিতভাবে আমাকে সরানোর চেষ্টা চলছে।”

শেয়ারহোল্ডারদের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

চিকিৎসক-সংক্রান্ত বিরোধের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদকে ঘিরেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

বঞ্চিত কয়েকজন শেয়ারহোল্ডারের দাবি, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময় পরিচালক করার আশ্বাস দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু পরে তাদের বাদ দিয়ে সীমিতসংখ্যক ব্যক্তিকে নিয়ে জয়েন্ট স্টক কোম্পানির নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানান অভিযোগকারীরা।

ডাইরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার আরাফাত, মোহাম্মদ আরমান ও মো. জামাল উদ্দিন বলেন, তারা এখনো পরিচালক হিসেবে স্বীকৃতি পাননি এবং তাদের অর্থেরও সঠিক হিসাব দেওয়া হয়নি।

আগেও তদন্তের নির্দেশ

জানা গেছে, হাসপাতালের মালিকানা ও আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও সহকারি কমিশনার ভূমি বিষয়টি তদন্ত করেন।

তদন্ত শেষে বঞ্চিত পরিচালকদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জয়েন্ট স্টক কোম্পানির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বুঝিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন। তবে তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই নির্দেশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য মেলেনি

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাহেদ হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

প্রশাসনের ভূমিকার দিকে তাকিয়ে সংশ্লিষ্টরা

একই হাসপাতালকে ঘিরে চিকিৎসাসেবা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা পর্ষদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং রোগীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সেবাগ্রহীতা এবং সংশ্লিষ্ট ডাইরেক্টর ও শেয়ারহোল্ডাররা।