বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬
ফিচার শিল্প-সাহিত্য

সত্যের পথ দেখায় সত্যজিৎ

আশীষ নন্দী »

সত্য সুন্দর। সত্যের মধ্যে সৌন্দর্য মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে বলে সত্যের শক্তি অনেকে বুঝে উঠতে পারে না। আর সত্যকে ধামাচাপা দিতে গিয়ে শক্তিমান খেয়াল করতে পারে না সত্যের নিজ স্বকীয়তা কী ভয়াবহতা নিয়ে জনগণের সম্মুখে আবির্ভূত হয়। শেষ পর্যন্ত শক্তিমান হয় স্বীকার করতে বাধ্য হয় নতুবা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে পালায়।
সংক্রামক রোগ ছড়ায় একজন থেকে আরেকজনে অথবা পুরো জনপদে ছড়িয়ে পড়ে পানি বা বায়ুতে। সমাজ বা জনপদের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে বলি মহামারী । বছর কয়েক আগে একটি ভাইরাস সনাক্ত করে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের ডাক্তার লি ওয়েন লিয়াং। সে যখন ভাইরাসটির অস্তিত্ব সনাক্ত করে সকলকে সতর্ক করলো তখন সে পেলো শাস্তি। যেহেতু চীনের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণরূপে সরকার নিয়ন্ত্রিত। সত্য প্রকাশ করতে দিল না চীন সরকার। কিন্তু সত্য ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হলো না। ওই যে সত্য, সে তার স্বমহিমায় প্রকাশ পেল ঠিকই। আমরা সকলে জানলাম চীনের প্রাণঘাতী ভাইরাসটি সম্পর্কে। সমগ্র পৃথিবীতে করোনা ভাইরাস চালালো ভীষণ তাণ্ডব। আর সেই ডাক্তার লি নিজের প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করে গেলো সে মিথ্যে বলেনি, সে মানুষের প্রাণ রক্ষা করতে সবাইকে সতর্ক করতে চেয়েছিলো। সত্য গোপন করে কী লাভ হলো? শেষ পর্যন্ত চীনকে স্বীকার করতে হলো। কী অদ্ভূত মিল চীনের সেই ডাক্তার লি’র (২০১৯) সাথে সত্যজিৎ রায় নির্মিত “গণশক্র” (১৯৮৯) চলচ্চিত্রের ডাক্তার অশোক গুপ্তের।
উনিশ শ তিরাশি সালে সত্যজিৎ রায় মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হন হৃদরোগে। তিনি তো আর চুপচাপ বসে থাকতে পারেন না। ডাক্তারদের কঠোর অনুশাসনের মধ্যে তিনি ভাবলেন এমন চলচ্চিত্র কাঠামো, যা নির্মাণ করতে তাকে বাইরে যেতে হবে না। তিনি ঈযধসনবৎ উৎধসধ তৈরি করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি একে একে নির্মাণ করলেন “ঘরে বাইরে”, “শাখা প্রশাখা”, “গণশক্র”, “আগন্তুক”। “গণশক্র” নির্মাণে তিনি বেছে নিলেন হেনরিক ইবসেনকে। ইবসেনের অহ ঊহবসু ঙভ ঞযব চবড়ঢ়ষব নাটককে তিনি বিনির্মাণ করবেন ভাবলেন। ভাবনাটাকে পুরোপুরি মিলিয়ে নিলেন ভারতীয় তথা পশ্চিমবঙ্গীয় সমাজ বাস্তবতার সাথে।
চণ্ডীপুর পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোট পৌর শহর। সেই পৌর শহরের ডাক্তার অশোক গুপ্ত। তিনি বেশ কয়েক দিন থেকে লক্ষ্য করছেন তিনি যে সমস্ত রোগী দেখছেন তাদের অনেকে অন্ত্র রোগে ভুগছেন। যে কারণে রোগটি ছড়াতে পারে বা রোগটির মূল বাহক হতে পারে তা হলো পানীয় জল। তিনি তার দৃঢ় বিশ্বাস থেকে নির্দিষ্ট একটি এলাকার পানীয় জল পরীক্ষা করতে পাঠালেন। ফলাফল যা পেলেন তাতে তিনি সন্তুষ্ট ও নিশ্চিত হলেন তার অনুমান সঠিক। পানীয় জল থেকে ছড়াচ্ছে জন্ডিস রোগটি।
ফলাফলটি প্রকাশ করা ডাক্তার হিসেবে তার নৈতিক কর্তব্য মনে করলেন। তিনি খবরটি প্রকাশের জন্য ডাকলেন স্থানীয় পত্রিকার এক সম্পাদককে। আর ডাকলেন পৌরসভার চেয়ারম্যানকে। সত্যজিৎ রায় সুচারু ভাবে প্রক্ষেপণ করলেন দুইটি চরিত্র। যাদের চরিত্রে ফুটিয়ে তুললেন আমাদের অসাধুতা, স্বার্থপরতা, শঠতা। আমাদের ভেতরে বাস করা অনৈতিক চরিত্রের দুটি রূপ।
প্রথম চরিত্র, স্থানীয় দৈনিক জনবার্তা পত্রিকার সম্পাদক হরিদাস। স্থানীয় দৈনিকে সাধারণত এলাকার ভালো-মন্দ সকল খবর প্রকাশ পায়। সম্পাদক হিসেবে তার প্রধান কাজ হলো সততা ও নিষ্ঠার সাথে সঠিক তথ্যটি পাঠক সমাজের কাছে পৌঁছে দেয়া। সম্পাদকটি এমন ভাব দেখালেন তিনি ডাক্তার অশোক গুপ্তের অনুরাগী এবং সত্য প্রকাশ করতে আগ্রহী। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত তা থাকলেন না, হয়ে উঠলেন আপাদমস্তক এক সুবিধাবাদী চরিত্র। সত্যজিৎ ফুটিয়ে তুললেন আমাদের ভেতরের লোভ, নিজের আত্ম প্রতিষ্ঠা আমাদের সৎ থাকতে দেয় না।
দ্বিতীয় চরিত্র, পৌরসভার চেয়ারম্যান নিশিথ গুপ্ত। যিনি আবার সম্পর্ক সূত্রে ডাক্তার অশোক গুপ্তের আপন ছোট ভাই । সম্পর্ক যাই হোক না কেন তিনি জন প্রতিনিধি বা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্র অনেক সত্য প্রকাশে আগ্রহী নয়। নিশিথ গুপ্ত সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠা বলতে যা বোঝায় তাতে অনেক লোকের শ্রেণী স্বার্থ বা সামাজিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক জড়িয়ে থাকে। ত্রিপুরেশ্বর মন্দিরের চরণামৃত পান করে চণ্ডীপুরের হাজার হাজার ভক্ত। এছাড়া আসে অন্যান্য জায়গা থেকে ভক্তরা। যার সাথে সম্পর্ক পর্যটনের। পর্যটক আসা মানে স্থানীয় অনেক ব্যবসার আয় বৃদ্ধি। ভক্তের আগমনের সাথে প্রণামী বাক্সের সমৃদ্ধি। ভক্তের প্রণামীতে চলে মন্দিরের খরচ। খরচ বাদে যা থাকে তা দিয়ে বৃদ্ধি পায় মন্দিরের তহবিল। মন্দিরের তহবিল বৃদ্ধি মানে মন্দির কমিটির সদস্যদের উদর বৃদ্ধি। পৌর চেয়ারম্যান নিশিথ গুপ্ত হয়ে পড়েন সমস্ত স্বার্থান্বেষী মহলের প্রতিনিধি। সেই শ্রেণী প্রতিনিধি হিসেবে ওনার যা করণীয় উনি তা করতে এতটুকু কসুর করেননি। এছাড়া জড়িয়ে আছে সমাজে লালিত ধর্ম বিশ্বাস ও কুসংস্কার। অনেকে এখনো বিশ্বাস করে তুলশী পাতা মেশানো চরণামৃত পানে অনেক রোগ সেরে যায়। আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা সংস্কার বা কুসংস্কারের সাথে বিজ্ঞানের তর্ক বিতর্ক অনেক পুরনো বিষয়। ডাক্তার বিজ্ঞানের ছাত্র ও যুক্তিবাদী এবং সংস্কার মুক্ত বলে মন্দিরে যান না। চলচ্চিত্রের প্রায় শেষ অংশে পৌর চেয়্যারম্যান নিশিত গুপ্ত আপন ভাইয়ের সংস্কারমুক্ত মনের খবর জেনেই প্রকাশ্য মিটিংয়ে ডাক্তার অশোক গুপ্তকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন তিনি হিন্দু কিনা? ডাক্তার অশোক গুপ্ত জোর দিয়ে বললেন তিনি অবশ্যই হিন্দু। আমাদের দুই বাংলায় খুব বিশ্রীভাবে আক্রান্ত হতে হয় হিন্দু বা মুসলিম ধর্মাবলম্বী পরিবারে জন্ম নেয়া সংস্কারমুক্ত প্রথাবিরোধী মনের ডাক্তার অশোক গুপ্তের মতো মানুষদের। তৈরি হয় আমাদের সমাজ বাস্তবতায় নাস্তিক ও আস্তিক দ্বন্দ্ব। আর তাকে পুঁজি করে পৌর চেয়ারম্যান নিশিথ গুপ্ত ডাক্তার অশোক গুপ্তকে পরিণত করেলেন গণশক্রতে। অপূর্ব কুশলতায় দেখালেন আমাদের দ্বান্ধিক সর্ম্পকগুলো।
এই চলচ্চিত্রের অন্যতম দুটি চরিত্র ডাক্তার অশোক গুপ্তের পরিবারের সদস্য স্ত্রী ও কন্যা। কন্যা রানুর যতটুকু ভূমিকা প্রয়োজন ঠিক ততটুকু সত্যজিৎ পর্দায় তাকে দেখিয়েছেন। তবে অত্যন্ত গৌণ কিন্তু অদ্ভূত মোড় ঘোরানো চরিত্র ডাক্তার অশোক গুপ্তের স্ত্রী মায়া। সাধারণত বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে স্ত্রীরা অত্যন্ত ধর্মশীলা হয়ে থাকেন। তারা স্বামীদের সাধারণত কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথাগত পথে ডাকে। এখানে তিনি তা নন। তিনি অতি সাধারণ কিন্তু অদ্ভূত বিশ্লেষণী ক্ষমতার অধিকারী। তাকে দিয়ে সত্যজিৎ বলিয়ে নিলেন, “একজন মানুষ ঈশ্বর না মেনেও কতটা সৎ হতে পারে”। অথচ তারও ইচ্ছে হয়েছে মন্দিরে যেতে। কিন্তু স্বামীর সততা ও যুক্তিবাদীতায় মুগ্ধ হয়ে তিনিও ত্যাগ করেছেন অনেক সংস্কার। কিন্তু তার স্বামী ডাক্তার অশোক গুপ্ত কখনো তাকে কোনো কাজে বাঁধা দেননি।
“গণশক্র” চলচ্চিত্রে আমরা আরো দুটি চরিত্রের দেখা পাই। যারা এই চলচ্চিত্রে এসেছে গণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে। একজন জনবার্তা পত্রিকার সহকারী সম্পাদক বীরেশ গুহ। যে ডাক্তার অশোক গুপ্তের অনুরাগী। সে ডাক্তার অশোক গুপ্তের প্রবন্ধটি পত্রিকায় ছাপতে সম্পাদক হরি দাসকে অনুরোধ করেন। লেখাটি ছাপলে তাদের পত্রিকার সুনাম বৃদ্ধি পাবে বলে তার বিশ্বাস। কিন্তু সে যখন দেখতে পায় তার সম্পাদক ও প্রকাশক সত্য প্রকাশ করতে অনাগ্রহী। তারা তাদের শ্রেণী স্বার্থের বিষয়ে মনোযোগী। বীরেশ কোনো কিছু পরোয়া না করে সে তার স্বীয় পদে ইস্তফা দিয়ে হয়ে উঠে স্বাধীন সাংবাদিক। সত্য প্রকাশ করা তার কর্তব্য মনে করে সে রিপোর্টটি প্রেরণ করে বিভিন্ন সংবাদপত্রে।
অপর চরিত্রটি রণেন। যার সাথে ডাক্তার অশোক গুপ্তের কন্যার বিবাহ স্থির হয়ে আছে। সে একটি ব্যাংকে চাকরি করে। এছাড়া সে গ্রুপ থিয়েটার কর্মী। ভারত ও বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটার চর্চা বড় ভূমিকা পালন করেছে সামাজিক, সাংস্কতিক আন্দোলনে। রণেন এগিয়ে আসে সমস্যাটি জনগণের সামনে তুলে ধরতে। সে তার এলাকার তরুণদের সংগঠিত করে জনগণের সামনে তুলে ধরে সমস্যাটি। জনগণ বিষয়টি বুঝতে পেরে এগিয়ে আসে। তারা সকলে মিলে আওয়াজ তোলে ডাক্তার অশোক গুপ্ত জিন্দাবাদ। যুথবদ্ধ হয়ে সংগঠিত শক্তি যে কোনো সমস্যা বা দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পারে তাই প্রক্ষেপণ করলেন সত্যজিৎ রায় “গণশক্র” চলচ্চিত্রে।
চলচ্চিত্রটির নির্মাণ কুশলতার প্রধান দিক সংলাপ। মূল কাহিনীটি যেহেতু নাটক থেকে নেয়া তাই এই চলচ্চিত্রটি এগিয়ে গেছে সংলাপের পর সংলাপে। চলচ্চিত্রটিতে বর্হিদৃশ্যের সংযোজন নেই বললেই চলে। তাই সংলাপ কুশলতার দিকে অধিক মনোযোগী ছিলেন সত্যজিৎ রায়। তবে চলচ্চিত্রে ক্যামেরার ফোকাস ছিলো অধিক কৌশলী। একটি অ্যাঙ্গেলে কয়টি মুখ বা চরিত্র দেখাবেন এবং সংলাপ প্রক্ষেপণে কে গুরুত্ব পাবে সেসব দিকের বিবেচনা ছিলো প্রধান একটি বিষয়। সত্যজিৎ রায়ের কুশলী সীমিত সংগীত আবহ চমৎকার।
আমাদের সমাজ বাস্তবতা বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রথমে কোনো কিছু স্বীকার করতে চায় না। সমাজ ও রাষ্ট্র যন্ত্রের মধ্যে বিরাজ করে পারস্পরিক শ্রেণী স্বার্থ। তাই রাষ্ট্র যন্ত্র অনেক তথ্য গোপন করতে চায়। করোনা কালে আমরাও দেখেছি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম। কি অদ্ভূত মিল ছিলো আঠারো শতকে লেখা ইবসেনের নাটক আর বিশ শতকে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র এবং একবিংশ শতকে করোনা মহামারীর বাস্তবতা।
সত্যজিৎ রায়ের জন্ম ২ মে ১৯২১ কলকাতায় এবং মৃত্যু ২৩ এপ্রিল ১৯৯২ কলকাতায়। তিনি ছিলেন একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সংগীত পরিচালক এবং লেখক। তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়।