এ জেড এম হায়দার »
চট্টগ্রামের মাঠ বাংলাদেশ দলের জন্য ‘লাকিগ্রাউন্ড’ হিসেবে খ্যাত। সেই মাঠেই ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত পারফর্ম করে দীর্ঘসময় পর নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক যুগ পর ওয়ানডে সিরিজ জয় করতে সক্ষম হয়েছে টিম টাইগার। এরই সাথে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডেতে ২০১৩-১৪ সালের পর এই প্রথম সিরিজ জিতলো বাংলাদেশ।
শান্ত ম্যাচসেরা ও ৮ উইকেট শিকারী নাহিদ রানা সিরিজ সেরা হেেছন। প্রচন্ড তাপদাহে বৃহস্পতিবার তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে চট্টগ্রামের বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে প্রথমে ব্যাট করা স্বাগতিকদের শুরুটা ভালো হয়নি। শেষ পর্যন্ত নাজমুল হোসেন শান্ত ও লিটনের ব্যাটিং দৃঢ়তা ও পরে মোস্তাফিজের ৫ উইকেট এবং মিরাজ-রানার জোড়া উইকেট তুলে নেয়ার কৃতিত্বে অনেকটা ফাঁকা গ্যালারিতে ৫৫ রানে কিউইদের বধ করে মিরাজবাহিনী। এতে ২-১ এ সিরিজ নিজেদের করে নেয় বাংলাদেশ।
এর আগে ঢাকায় প্রথাম ওয়ানডেতে ২৬ রানে হারের পর দারুনভাবে ঘুড়ে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৬ উইকেটের জয় তুলে নেয় টাইগাররা। সেই দাপট চট্টগ্রামের মাঠেও বজায় রেখে শেষ হাসি হাসে স্বাগতিকরা। এরমধ্য দিয়ে ওয়ানডেতে নিজেদের সর্বশেষ তিন সিরিজেই জয় পেল বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানের কাছে হারের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানের পর এবার নিউজিল্যান্ডকে হারাল মিরাজের দল।
বাংলাদেশের পঞ্চম অধিনায়ক হিসেবে টানা তিন সিরিজ জিতলেন মিরাজ। ২৬৬ রান তাড়া করতে নেমে দলীয় ৮ রানে প্রথম উইকেট হারায় নিউজিল্যান্ড। ওপেনার হেনরি নিকোলসকে ৪ রানে বিদায় দেন মুস্তাফিজ। দ্বিতীয় উইকেটে ৪৬ রানের জুটিতে শুরুর ধাক্কা সামলে উঠেন নিক কেলি ও উইল ইয়ং। ১৯ রান করা ইয়ংকে শিকার করে জুটি ভাঙ্গেন পেসার নাহিদ রানা। চার নম্বরে নামা অধিনায়ক ল্যাথামকে ৫ রানে আউট করে নিউজিল্যান্ডকে চাপে ফেলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। ৬১ রানে ৩ উইকেট হারায় কিউইরা। চতুর্থ উইকেটে ৪৭ রানের জুটিতে নিউজিল্যান্ডের স্কোর ১শ পার করেন কেলি ও মুহাম্মদ আব্বাস। এই জুটিতে হাফ-সেঞ্চুরির স্বাদ নেন কেলি। দলীয় ১০৮ রানে হুমকি হয়ে দাড়ানো কেলিকে বিদায় দেন মুস্তাফিজ। ৬টি চার ও ১টি ছক্কায় ৫৯ রান করেন কেলি।
এরপর আব্বাসকে ২৫ রানে শরিফুল ইসলাম এবং জশ ক্লার্কসনকে ৬ রানে শিকার করে বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্ন দেখান রানা। ১৩৭ রানে ৬ উইকেট পতনে ধুঁকতে থাকা নিউজিল্যান্ডকে বড় হারের মুখে ঠেলে দেন মুস্তাফিজ। ন্যাথান স্মিথ ও লেনক্সকে ২ এবং ও’রুর্ককে ১ রানে সাজঘরে ফেরত পাঠান তিনি। এতে ১৬০ রানে নবম উইকেট হারায় নিউজিল্যান্ড। এসময় ইনিংসে ৫ উইকেট পূর্ণ করেন ফিজ। শেষ উইকেটে বেন লিস্টারকে নিয়ে ৩১ বলে ৫০ রানের জুটিতে নিউজিল্যান্ডকে বড় হারের লজ্জা থেকে রক্ষা করেন ডিন ফক্সক্রফট। ৪৫তম ওভারে মিরাজের বলে ফক্সক্রফট আউট হলে ২১০ রানে গুটিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। ৭টি ছক্কায় ৭৫ রান করেন ফক্সক্রফট। ৯ ওভারে ৪৩ রানে ৫ উইকেট নিয়েছেন মুস্তাফিজ। এনিয়ে ষষ্ঠবার ইনিংসে ৫ বা ততোধিক উইকেট নিলেন তিনি।
এছাড়া মিরাজ ও রানা ২টি করে উইকেট নেন। এর আগে টস হেরে প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে নিউজিল্যান্ড পেসার উইলিয়াম ও’রুর্কের তোপে ৩২ রানে ৩ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। ইনিংসের দ্বিতীয় বলে বিদায় নেন বাংলাদেশ ওপেনার সাইফ হাসান। রানের খাতা খোলার আগে ও’রুর্কের বলে উইকেটরক্ষক টম ল্যাথামকে ক্যাচ দেন প্রথম ম্যাচে হাফ-সেঞ্চুরি করা সাইফ। আগের ম্যাচে হাফ-সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশের জয়ে অবদান রাখা তানজিদ হাসান ১ রান করে ও’রুর্কের ডেলিভারিতে বোল্ড হন। ৩টি চারে ইনিংস শুরু করা সৌম্য সরকার বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ও’রুর্কের তৃতীয় শিকার হবার আগে ২৬ বলে ১৮ রান করেন তিনি। নবম ওভারে টপ অর্ডারের তিন ব্যাটারকে হারিয়ে চাপে পড়া বাংলাদেশকে লড়াইয়ে ফেরানোর চেষ্টা করেন শান্ত ও লিটন দাস। সাবধানে খেলে ২৫তম ওভারে দলের রান ১শতে নেন তারা। পরের ওভারে হাফ-সেঞ্চুরির দেখা পান ৭০ বল খেলা শান্ত।
এসময় ৪টি চার ও ১টি ছক্কা মারেন তিনি। অন্যপ্রান্তে ৬০ বলে এসে প্রথম বাউন্ডারির দেখা পান লিটন। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১৩তম হাফ-সেঞ্চুরির স্বাদ নিতে ৭১ বল খেলেন তিনি। ১৯ ইনিংস পর ওয়ানডেতে পঞ্চাশের দেখা পেলেন লিটন। ৩৯তম ওভারে দলীয় ১৯২ রানে নিউজিল্যান্ডের বাঁ-হাতি স্পিনার জেডেন লেনক্সের বলে বোল্ড হন লিটন। ৩টি চার ও ১টি ছক্কায় ৯১ বলে ৭৬ রানে থামেন তিনি। চতুর্থ উইকেটে শান্তর সাথে ১৭৮ বলে ১৬০ রানের জুটি গড়েন লিটন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চতুর্থ উইকেটে এটিই সর্বোচ্চ রানের জুটি। লিটন ফেরার পর ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৬৪তম ম্যাচে চতুর্থ সেঞ্চুরির দেখা পান শান্ত। ২৫ মাস ও ২০ ইনিংসে পর ওয়ানডেতে সেঞ্চুরির দেখা পেলেন তিনি। ২০২৪ সালের মার্চে সর্বশেষ চট্টগ্রামে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে ১২২ রানের ইনিংস খেলেছিলেন শান্ত। সেঞ্চুরির পর বেশি দূর যেতে পারেননি শান্ত। ১১৯ বল খেলে ৯টি চার ও ২টি ছক্কায় ১০৫ রানে আউট হন বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ক।
৪৩তম ওভারে দলীয় ২২১ রানে পঞ্চম ব্যাটার হিসেবে শান্ত ফেরার পর তাওহিদ হৃদয় ও অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের ছোট-ছোট ইনিংসের সুবাদে ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৬৫ রানের সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। হৃদয় ২৯ বলে ৩৩ এবং মিরাজ ১৮ বলে ২২ রান করেন। নিউজিল্যান্ডের ও’রুর্ক ৩টি, বেন লিষ্টার ও জেইডেন লেনক্স ২টি করে উইকেট নেন। এদিকে ওয়ানডে সিরিজ শেষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ড।
২৭ ও ২৯ এপ্রিল চট্টগ্রামে টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ২ মে তৃতীয় ও শেষ টি-টোয়েন্টি ঢাকার মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, সময়ের সমস্যায় এবারের বিপিএল’র আসর চট্টগ্রামে বাতিল করতে হয়েছে বিসিবিকে। তাই দীর্ঘ সময় পর চট্টগ্রামের ক্রিকেটপ্রেমীরা ওয়ানডে ও টি-২০ ম্যাচ নিয়ে স্টেডিয়াম মাতিয়ে রাখবেন বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রচন্ড গরম ও এসএসসি পরীক্ষার কারণে ক্রিকেটপ্রেমীদের উপস্থিতি ছিল খুবই নগন্য।






















































