বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬
ফিচার শিল্প-সাহিত্য

আঞ্চলিক গানের আকাশে উজ্জ্বল ধ্রুবতারা বুলবুল আক্তার

সাইয়্যিদ মঞ্জু »

স্মৃতি বড় অদ্ভুত এক আয়না, কখনো তা ঝকঝকে রোদেলা দুপুরের মতো উজ্জ্বল, কখনো আবার মেঘলা বিকেলের মতো কিছুটা বিষণ্ণ। দ্বীপ মহেশখালীর ধূলিকণা আর লোনা বাতাসের পরতে পরতে যেমন মিশে আছে সংগ্রামের গল্প, তেমনি মিশে আছে গানের সুর। ছোটবেলা থেকেই গান লেখার একটা সুপ্ত নেশা ছিল। সেই নেশার সূত্র ধরেই একদিন কক্সবাজার শিল্পী ও সাস্কৃতিক সংস্থার সদস্য হওয়া। আর সেই সংস্থার বার্ষিক মিলনমেলা আমরা পরষ্পরে দেখা প্রাপ্তির সুযোগ করে দেয়। সেখানে দেখা হলো জন্মদ্বীপের গর্ব, আঞ্চলিক গানের জীবন্ত কিংবদন্তি- বুলবুল আক্তারের সাথে।
কিংবদন্তিদের যখন আমরা দূর থেকে দেখি, তাদের চারপাশে একটা অলৌকিক আভা কল্পনা করি। কিন্তু বুলবুল আপার সাথে যখন আলাপ শুরু হলো, বুঝলাম তিনি মাটির কত কাছাকাছি থাকা একজন মানুষ। দীর্ঘ সময় আমরা কথা বললাম। সেই আলাপে উঠে এল চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের সোনালি অতীত, হারানো দিনের স্মৃতি আর বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা।
কথায় কথায় আমরা ফিরে গেলাম সেই নব্বইয়ের দশকে। আজকের মতো ইউটিউব বা স্পটিফাইয়ের যুগ ছিল না তখন। ক্যাসেটের মাধ্যমে গান পৌঁছাত মানুষের দুয়ারে। বুলবুল আক্তার যখন কথা বলছিলেন, আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল কক্সবাজারের সিনেমা রোডের সেই দিনগুলো। আলাউদ্দিন রেকর্ডিং হাউস, হারুন ইলেকট্রনিক কিংবা কলিকার মতো দোকানগুলো তখন ছিল গানের তীর্থস্থান। চট্টগ্রামের আমিন স্টোর, এস এস প্রোডাকসন হাউস, শাহ আমানত, জেবিএল-এসব প্রতিষ্ঠানের নাম যেন এক একটি ইতিহাস। ক্যাসেট রিলিজ হওয়া মানেই ছিল এলাহি কাণ্ড। হাজার হাজার ক্যাসেট বিক্রি হতো, শিল্পীদের কদর ছিল আকাশচুম্বী।
বুলবুল আপা স্মৃতিচারণ করছিলেন তাঁর গুরু এবং জীবনসঙ্গী রশিদ কাওয়ালের কথা। মাত্র সাত বছর বয়স থেকে তাঁর বাবা মাইজভান্ডারি সাধক আলম ফকিরের কাছে যে হাতেখড়ি হয়েছিল, তাকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন রশিদ কাওয়াল। ১৯৭৮ সালে তাঁদের বিয়ে যেন ছিল সুরের সাথে সুরের এক মহেন্দ্রক্ষণ।
আমরা আলোচনা করছিলাম আমান উল্লাহ গায়েন, আহমেদ বশির সিরাজুল ইসলাম আজাদের কথা। বুলবুল আক্তার মানেই ছিল এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী কণ্ঠস্বর। শেফালী ঘোষ ও কল্যাণী ঘোষের পাশাপাশি যে নামটি পুরো চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার দাপিয়ে বেড়াত, তিনি এই ‘মহেশখালীর কন্যা’। ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শতাধিক ক্যাসেট প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। ভাবতে অবাক লাগে, একজন শিল্পীর কণ্ঠের কী বিপুল বিস্তার!
বুলবুল আপার কণ্ঠের বিশেষত্ব হলো তার মেঠো সুর। পাহাড়, লোনা জল আর মাটির সোঁদা ঘ্রাণ যেন তাঁর গলায় মিশে আছে। আলাপের এক ফাঁকে আমি তাঁকে আমার লেখা একটি গানের কথা শোনালাম। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং অবলীলায় গুনগুন করে সুর করার চেষ্টা করলেন। বললেন, “মঞ্জু, এই গানটা আমি নিজের সুরে গাইব।”
একজন কিংবদন্তির মুখে নিজের লেখা গানের সুর শোনার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো, ‘ও কালা ভ্রমরা আঁই আইজো ফুলর করা’ কিংবা ‘বাঁকখালীর মাঝি ও ভাই সোনাদিয়া বাসা’- যাঁর কণ্ঠে এই গানগুলো অমরত্ব পেয়েছে, তাঁর কাছে আমার সামান্য লিরিক যেন এক নতুন জীবন পেল।
তাঁর গাওয়া ‘অহ হালা চাঁন গলার মালা পেট পুরেদ্দে তোয়াল্লাই’ যা আজও বাংলার পথে-প্রান্তরে ধ্বনিত হয়। বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিল্পী হয়তো গানটি গেয়ে তারকা হয়েছেন, কিন্তু এর পেছনের মূল কারিগর যে এই মহেশখালীর বুলবুল, তা অনেকেই ভুলে গেছে।
গল্পের আনন্দঘন মুহূর্তগুলো একসময় কিছুটা ম্লান হয়ে আসে যখন তিনি তাঁর বর্তমান জীবনের কথা বলতে শুরু করলেন। যে কণ্ঠস্বর একসময় মঞ্চ কাঁপিয়ে হাজার হাজার মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত, সেই বুলবুল আক্তার আজ জীবন-যুদ্ধের প্রান্তে দাঁড়িয়ে। ৬৩ বছর বয়সী এই গুণী শিল্পী আজ নানা শারীরিক জটিলতায় জর্জরিত। অথচ তাঁর চিকিৎসার খরচ জোগাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
দীর্ঘ ৫৬ বছরের সংগীত জীবনে তিনি মানুষের ভালোবাসা অঢেল পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আর্থিক সঞ্চয় করতে পারেননি বললেই চলে। বর্তমানে কক্সবাজারে তাঁর মেয়ের করে দেওয়া একটি সাধারণ কুঁড়েঘরে দিন কাটছে তাঁর। ভাবতে অবাক লাগে, যে শিল্পীর নাম শুনলে একসময় গ্রাম-গঞ্জ ভেঙে পড়ত, আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁকে লড়তে হচ্ছে দারিদ্র্যের সাথে। রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা যখন তাঁকে গ্রাস করছিল, তখন কেবল সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে কিছু মানুষ তাঁর অসহায়ত্বের কথা জানতে পারে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) তাঁকে ‘স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা’ প্রদান করেছে। এই খবরটি যেন মরুভূমিতে বৃষ্টির মতো। সাবেকমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান কিংবা আকরাম খানের মতো ব্যক্তিত্বদের সাথে একই মঞ্চে যখন আমাদের বুলবুল আক্তার সম্মানিত হলেন, তখন মনে হলো তাঁর যোগ্যতার প্রতি সামান্যতম হলেও সম্মান দেখানো হলো।
বুলবুল আপা আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “মেয়র মহোদয় আমার কথা মনে রেখেছেন, এতেই আমি খুশি। আমার জন্য যাদের ‘পেট পুড়ে’ তাদের সবার প্রতি আমার সালাম।” তাঁর কণ্ঠে সেই চিরচেনা বিনয় আর গানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ফুটে উঠছিল। তিনি স্পষ্টভাবে জানালেন, কিছু পান আর না পান, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি গেয়ে যাবেন।
বুলবুল আক্তার কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের এক জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। শেফালী ঘোষের প্রয়াণের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা তিনি আগলে রেখেছেন মমতায়। তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে এখন তাঁর মেয়ে সুমি সংগীতে নিজের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছেন- এটিও একটি বড় স্বস্তির বিষয়।
তবে শুধু সম্মাননা বা পুরস্কারেই কি সব শেষ? একজন কিংবদন্তির শেষ বয়সে প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা, আর্থিক সচ্ছলতা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। মহেশখালীর রত্ন বুলবুল আক্তার যেন অবহেলায় হারিয়ে না যান। বাঁকখালীর ঢেউ আর সোনাদিয়ার বালুকাবেলার মতো তাঁর কণ্ঠ যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে।
স্মৃতিচারণের শেষে যখন আমি ফিরে আসছিলাম, তখন তাঁর সেই গুনগুন সুরটি আমার কানে বাজছিল। মনে হচ্ছিল, আমাদের শেকড়ের গানগুলো এই বুলবুল আক্তার আপাদের কণ্ঠেই সুরক্ষিত। তাঁদের যত্ন নেওয়া, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের কেবল দায়িত্ব নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের ঋণ শোধ করার নামান্তর। চাটগাঁইয়া গানের এই প্রদীপ যেন নিভে না যায়, সেই অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। কারণ বুলবুল আক্তারের মতো শিল্পীরা যুগে যুগে জন্মায় না।