বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৬, ২০২৬
ফিচার শিল্প-সাহিত্য

বৈশাখী ঝড়ের মতো

জাকিয়া রহমান »

আজ সন্ধ্যায় জাহিদের বাড়িতে ঈদ করতে আসার কথা। সে ভালো একটি বিদেশী কোম্পানিতে চাকরি করে ঢাকায়, কাজে দারুণ ব্যস্ততা। প্রায় চার মাস হয়ে গেছে বাড়ি আসতে পারেনি। শহরের উপকণ্ঠে হাজী পাড়ায় ওদের বাড়ি। একসময় এই শহরতলি একদম গ্রামীন ছিল কিন্তু, সভ্যতা এবং জনসংখ্যা বিস্তার হতে হতে পাড়াটা প্রায় শহর হয়ে উঠেছে। মানুষের স্বভাবও পাল্টেছে অনেক। এখনকার বিয়েশাদীতে এবং ঈদেও নাচ গানের আসরের আয়োজন হয় অনেকের বাড়িতে। হিন্দি সিনেমার গানের ধুয়ায় ছেলে ও মেয়ে উভয়েই নাচে কোমড় দুলিয়ে দুলিয়ে, যদিও প্রবীণ মুসল্লিরা কানে তুলো দিয়ে দূরে দূরে থাকেন। এই সমস্ত ইভেন্টে মোটেও অংশ গ্রহণ করেন না। জাহিদের মা আবেদা একসময় চমৎকার গীত গাইতেন, তাই পুরানো আমলে তাকে নিয়ে টানাটানি বেশ চলতো। সুমিষ্ট এবং দারুণ ধাঁচের কণ্ঠ ছিল তার। এখন তাকে কেউ মনে রেখেছে কিনা সন্দেহ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম এ ব্যাপারে একেবারে অজ্ঞ।
মা আবেদা অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে। বাড়িতে রয়েছে জাহিদের বউ পান্না, এক বছর বয়সের নাতি টুটু আর এক বোন মিলি। জাহিদের বাড়ি ফেরার বিলম্ব আর কারো সইছে না। এত্তোটুকু বাচ্চাটি ‘বা বা বাববা’ করে মিষ্টি শব্দে ডেকেই চলছে। তার মুখে বেবল কথা ফুটেছে।
মিলি একমাত্র বোন বয়সে অনেক ছোট। জাহিদের আদরের ধন, তার যত কিছু আবদার ভাইয়ের কাছে। এই যেমন, কী পরবে ঈদে, কেমন জুতো বা স্যান্ডেল, কী খাবে ইত্যাদি। ওদের বাবা ওয়াহিদুল ইসলাম সাহেব বেঁচে নেই। প্রায় চারবছর আগে কঠিন কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক কষ্ট ভোগ করে পরপারে চলে গেছেন। সে ধনী না হলেও সবার চলার মত কিছু সহায় সম্পত্তি রেখে গেছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর আবেদা ধীরে ধীরে কেমন যেন নিঃসঙ্গ হয়ে গেছেন। সংসারের সমস্ত ভার পান্নার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। সে যেন হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছে কবে সেও চলে যাবে এই দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে। শরীর স্বাস্থ্য তেমন ভালো নয় দেখে ছেলে অনেক অনুরোধ করেছে ভালো করে খেতে এবং কিনে দিয়ে গেছে মাল্টিভিটামিন- এর কৌটা। কিন্তু আবেদার কথা হচ্ছে, আর ভালো হয়ে লাভ কি? সে মনে করে জাহিদের বাবা বসে আছে তার জন্য অপেক্ষা করে। কাজেই, তাকে আর অত অপেক্ষা করতে দেয়া ঠিক হবে না। দিনে দিনে রুগ্ন হয়ে গেছে, শরীরে তেমন শক্তি নেই।
পান্না খুব কৌশলের সঙ্গে সংসার চালায় বেশিরভাগ সময়ই সামান্য অভাব রয়েই যায়। তবে, সেটা দারিদ্রতা বলে আখ্যা দেয়া যাবে না। পান্নার তাতে দুঃখ নেই। জাহিদের সাথে বিয়ের আগে তাদের জানাশোনা ছিল। বেশ রোমান্টিকভাবেই তাদের পরিচয় হয়েছিল এক বৈশাখের মেলায় প্রায় সাত-আট বছর আগে। মেলাতে ওরা একদল বান্ধবী হাসাহাসি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখানে ওখানে জিনিস দেখছে। সবার হাতে হাতে ঠোঙ্গায়, কি যেন সব ভাজা। চুরমুর করে খেয়ে দারুণ খুশিতে কখনো হাসিতে গলে পড়ছে কিংবা অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। এটা ওটা হাতে তৈরি জিনিস কিনছে কি কিনছে না, কিন্তু দরাদরি করেছে বেশ।
জাহিদ বেড়াতে এসে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সেও মেলায় গিয়েছে। ওদের উদ্দেশ্য ঘুরে বেড়ান আর আনন্দ করা। শহরে পড়াশুনা করে জাহিদ। হঠাৎ করে তার পান্নার দিকে চোখ পড়ে যায়। কেমন যেন এক বিদ্যুতের মতন ঝাপটা জাহিদের মনের উপর দিয়ে বয়ে গেল মনে হলো। যেন বৈশাখীর দাপ্টা ঝড় এসেছে, সবকিছু ল-ভ- করে দিতে। একটা দুর্দান্ত ইচ্ছা জাগলো জাহিদের মনে, তার এই মেয়েটি সম্পর্কে জানতে হবে। কি নাম তার? কোথায় থাকে?
জাহিদ কান খাড়া করে শুনছে মেয়েটির এবং তার বন্ধুরা কে কি কথা বলছে। তাদের মধ্যেই একজন বলে উঠলো,
– এই পান্না তোর এই শাড়িটা কেমন লাগেরে? আমাকে এটা মানাবে?
পান্না খিল খিল করে হেসে উঠলো বলল,
– তোকে এটা মোটেও মানাবে না! তোর রং এর সাথে যাবে না!
বান্ধবী তখন অভিমান করে বলল,
– আমার এত ভালো লেগেছে, না আমি এটা কিনবই।
পান্নার মুখটা চুপসে গেল। তা দেখে বন্ধুটি বলে উঠল,
– ওরে শয়তান! তোর ভালো লেগেছে তাই না? আমি না কিনলে তুই কিনে নিবি তাইতো?
পান্না বলল,
– না আমার মোটেও ভালো লাগেনি আর আমার মনে হয় না এই রংটা তোকে মানাবে। আরেকজন বলে উঠল,
– কি বলিস পান্না! এটা ওর গায়ে খুব সুন্দর লাগবে।
সেই বান্ধবী শাড়ি কিনে নিল আর পান্না বেশ মুখ ভার করে রইল। আসলে শাড়িটা পান্না নিজেই পছন্দ করেছিল আর ছল ছল চোখে তাকিয়ে বলল,
– নারে, তোকে মানাবে খুব ভালো। আমি আসলে নিজেই ওটা কিনতে চেয়েছিলাম তো, তাই তোকে বানিয়ে বলেছি।
জাহিদের খুব ভালো লাগলো কথাগুলো, মেয়েটি ভালো মনের আর সত্য বলে। সেই সাথে সে জেনে গেল মেয়েটির নাম। সুন্দর নামটি! ওর মনে জুড়ে রইল এই পান্না নামের এক ছন্দময় শব্দটি।
তারপর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। সবার যাওয়ার পালা। জাহিদ নজরে নজরে রেখেছে পান্নাকে, পিছু পিছু তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে হাঁটতে শুরু করলো পান্নার অস্তিত্বের কথা জানবার জন্যে। দেখল, সে একটা বিরাট গৃহস্ত বাড়িতে ঢুকে পড়ল। পরে খবর নিয়ে জানা গেলো, সেটা এক ব্যবসায়ীর বাড়ি। খুব ধনী এবং বদমেজাজি। জাহিদ একটু হতাশ হলো বটে! মনে মনে ভাবল আমরা তো মধ্যবিত্ত! হয়তো, এইটাই অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে কে জানে? সে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল ঠিক! কিন্তু মন নাছোড়বান্দা। পান্না নামের এক ছন্দ মনে অনুরণিত হতেই থাকল।
পান্নার সাথে জাহিদের আবার একদিন হঠাৎ দেখা হয়ে গেল কলেজে। জাহিদ চোখ ফেরাতে পারলো না এবারও। মনে আবার সেই বৈশাখী ঝড় যত জঞ্জাল নিয়ে এসে জড়ো করল- প্রেমের জঞ্জাল। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। পান্না ঠিক জানে এই ছেলেটিই তাকে বৈশাখী মেলা থেকেই ফলো করছে। আসলে তারও ভাল লেগেছিল জাহিদকে সেই দিন থেকেই। এবার সাক্ষাতে দুজনের কথা বার্তা হলো। তারপর, আরও কত আভিসার চলল সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে।
জাহিদের এমবিএ শেষ। ঠিক সে সময়ে মা আবেদা জেনে গেল ছেলের প্রেমের কথা। তিনি কাউকে কিছু না বলে সরাসরি পান্নার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। কিন্তু তারা কিছুতেই রাজি হলেন না। পান্নার বাবা কটাক্ষ বললেন,
– ঢাল নেই তরোয়াল নেই নিধিরাম সরদার! আমার মেয়েকে বিয়ে করবে ওই ছেলে! ওর বাড়ি ঘরের অবস্থা আমি সব জানি, ওয়াহিদ মাস্টারের বেটা। আমার মেয়েকে সে কি দিয়ে সুখী করবে?
জাহিদের আতœসম্মানে আঘাত করলো এইসব কথা। শপথ করল সে ঢাকায় ভালো একটি চাকরি খুঁজে বের করবেই। তখন পান্নার বাবা বাধ সাধবেন না নিশ্চয়ই। শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছিল আর কি!
সবাই অপেক্ষা করছ। আজ জাহিদের বাড়ি আসবার দিন। দুই দিন পরেই ঈদ। তাকে ফেরিতে যমুনা নদি পার হতে হবে।
পান্নাকে আবেদা বলছে,
– বৌমা আজ কি রান্না করবে ঠিক করেছ?
পান্না বলল,
– মা, সব রান্না হয়ে গেছে। আপনি চিন্তা করবেন না। জাহিদ যা যা ভালোবাসে আর আপনি যা যা গতবার রান্না করে খাইয়েছেন, সেগুলো সব তৈরি করেছি।
আবেদা একটা স্বস্তি নিঃশ্বাস ফেলে বড় শোবার ঘরের বারান্দায় রাখা খাটলাটায় বসে মনে হয় যেন অধীর অপেক্ষায় পথের দিকে চেয়ে বসে রইল।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা হল পাখিরা চারদিকে কিচিরমিচির করে, দল বেঁধে যার যার বাসায় ফিরে গেছে। জাহিদের দেখা নেই। সে যে কখন আসবে কেউ জানে না। কখন লঞ্চে ঘাটে ভিড়বে তার কোন ঠিক নেই। মা আবেদা অনড় বসে রইলো খাটলাটায়। পান্না সব কাজ সেরে একটা সুন্দর শাড়ি পরে ছেলের কাছে ঘরে বসে রইলো। চারদিকে ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে এলো। তবুও, জাহিদের ছায়াও দেখতে পাওয়া গেল না। আসলে, অনেকেরই আসার কথা ছিল এক সাথে, কেউ ফেরেনি তখনও।
তারপরের দিন আরও আশা নিয়ে বসে রইল আবেদা, পান্না আর মিলি জাহিদের ফেরার পথের দিকে চেয়ে। মিলি তার লাল জামাটা, যেটা তার ভাইয়া নিয়ে আসবে, সেটা কেমন হবে ভাবতে গিয়ে কাঁদতে শুরু করলো আর বলতে লাগলো,
– মা! মা! ভাইয়া আর আসবেনা মা! কখন আসবে ভাইয়া? কখন নিয়ে আসবে আমার ঈদের লাল জামা? কাল ঈদ! কি হইচই হবে! কত সুন্দর সুন্দর নাস্তা তৈরি করেছে ভাবি। না, মা আমার মন বলছে ভাইয়া আর আসবেনা। কি হবে তখন?
না জাহিদের কোন খোঁজ নেই। আর কারোই কোনও খোঁজ নেই।
ঈদের দিন! সব অন্ধকার! পাড়াতে আরো কয়েকজনের আত্মীয়-স্বজন অপেক্ষা করে করে বুক ফাটিয়ে কাঁদছে। ওদের ঈদ বুঝি চিরকালের মত আঁধার হয়ে গেছে। বুঝতে পারছে কিছু একটা ভয়ংকর ঘটেছে।
এমন করে ঈদের দিনটাও কেটে গেল।
জাহিদের মত মানুষের এই নদী পার হয়ে বাড়ি আসার যাত্রাটা বেশ কষ্টকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। এত মানুষের ভিড় চিন্তাই করা যায় না! ঈদ উদযাপন উদ্দেশ্যে বাড়ির পথে রওয়ানা দেয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। পশুর মতন গাদাগাদি হয়ে, সে সব মানুষ স্টিমার কি লঞ্চে উঠে পড়ে। নিরাপত্তার কোন তোয়াক্কা কৃত্রিপক্ষের নেই। ভাবটা এমন, এতো জনবহুল দেশে এমন কয়েক লক্ষ বলি হলে কি আসে যায়? যাদের আসে যায়, তাদের কথা ভাববারও কেউ নেই! জানিতেও চায় না কেউ!
পরের দিন ভোর সাতটার দিকে ওপাড়ার রহিম একটি বাক্স হাতে দৌড়ে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে খবর দিল জাহিদের স্টিমারটা ডুবে গেছে, খুব কম সংখ্যক লোক জানে বেঁচে আছে।
না জাহিদকে আর চেনা কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার হাতের বাক্সটার ঢাকনায় নকশা করে ‘জাহিদ’ লেখা, ভেসে উঠেছিল জলের উপর, তাই সে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছে। পিছনে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে পান্না দেখল, তার হাতের আঁকা নকশাওয়ালা বাক্সটির ঢাকনা… জাহিদ বলেছিল,
– এতো সুন্দর! আমি এটা কোনদিন হারাবো না দেখো!
বাক্সটি পাওয়া গেলেও জাহিদের কোনো খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি।