বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গেছে, তখন নতুন করে জ্বালানি তেলের পর তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ানো জনমনে চরম অসন্তোষ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। গতকাল ঘোষিত এলপিজির এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি খাতের খরচ বৃদ্ধি নয়, বরং এটি সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ‘ডোমিনো ইফেক্ট’ তৈরি করবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।
এলপিজি এখন শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্র রান্নার অপরিহার্য উপাদান। বিশেষ করে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। সিলিন্ডার প্রতি এই বাড়তি খরচ সরাসরি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে।
তবে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব কেবল রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি সরাসরি পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেয়। পরিবহন খরচ বাড়লে বাজারে চাল, ডাল, সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু-হু করে বাড়তে শুরু করে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। যখন সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে কমছে, তখন নিত্যপণ্যের এই আকাশচুম্বী দাম মানুষের জীবনযাত্রার মানকে তলানিতে নামিয়ে দিচ্ছে।
অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, আগে থেকেই মূল্যস্ফীতি ডাবল ডিজিটের কাছাকাছি অবস্থান করছিল। নতুন এই দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও হ্রাস পাবে। মানুষ এখন খাদ্য তালিকায় কাটছাঁট করছে, শিক্ষার খরচ বা চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
সরকার প্রায়ই আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম কমে, তখন তার সুফল দেশের সাধারণ মানুষ খুব কমই পায়। জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, সিস্টেম লস কমানো এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা গেলে হয়তো বারবার সাধারণ মানুষের পকেট কাটার প্রয়োজন হতো না।
আমরা মনে করি, বর্তমান পরিস্থিতিতে এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। বিকল্প হিসেবে নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য সরকারের উচিত ওএমএস বা টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহের পরিধি আরও বাড়ানো। একই সঙ্গে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার অজুহাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে।
সরকারকে বুঝতে হবে যে জনগণের সহ্যক্ষমতার একটি সীমা আছে। ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে কেবল অর্থনৈতিকভাবেই পঙ্গু করছে না, বরং সামাজিক অস্থিরতাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সামনের দিনগুলোতে জনদুর্ভোগ আরও চরম আকার ধারণ করবে। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুত এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে অথবা সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় শক্ত কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে।
মতামত সম্পাদকীয়



















































