চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি >>
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কাঞ্চন পেয়ারা এখন আর শুধু স্থানীয় কিংবা দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। অনন্য স্বাদ, আকর্ষণীয় রং, মচমচে গঠন ও দীর্ঘ সময় সতেজ থাকার বৈশিষ্ট্যের কারণে এই পেয়ারা দেশের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও জায়গা করে নিয়েছে। মৌসুমের শুরুতেই প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি কাঞ্চন পেয়ারা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশের বাজারে। এতে কৃষকের আয় যেমন বাড়ছে, তেমনি দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চন্দনাইশের উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়ায় উৎপাদিত কাঞ্চন পেয়ারা দীর্ঘদিন ধরে স্বাদ ও গুণগত মানের জন্য দেশের ফলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ পরিচিত। বর্তমানে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, সিলেট, খুলনা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করছেন। একই সঙ্গে রপ্তানিকারকদের মাধ্যমেও বিদেশে যাচ্ছে এই ফল।
উপজেলার হাশিমপুর, কাঞ্চননগর, ধোপাছড়ি, দোহাজারী, জামিজুরীসহ পাহাড়ি ও সমতল এলাকায় ব্যাপকভাবে কাঞ্চন পেয়ারার চাষ হয়। মৌসুম শুরু হলে প্রতিদিন ভোর থেকেই বাগান ও স্থানীয় বাজারগুলোতে জমে ওঠে বেচাকেনা। ট্রাক, পিকআপ ও অন্যান্য পরিবহনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে তাজা পেয়ারা। রপ্তানির জন্যও বিশেষভাবে বাছাই করা ফল প্যাকেজিং করে পাঠানো হচ্ছে।
পেয়ারা চাষি মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বলেন, “অন্যান্য ফলের তুলনায় কাঞ্চন পেয়ারার উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম, অথচ বাজারমূল্য ভালো পাওয়া যায়। সঠিক পরিচর্যা করলে ফলনও অনেক বেশি হয়। এখন এ অঞ্চলের বহু পরিবার এই পেয়ারা চাষের ওপর নির্ভরশীল।”
ব্যবসায়ী জসিম মিয়া বলেন, “চন্দনাইশের কাঞ্চন পেয়ারা স্বাদ ও মানের কারণে ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ। বাজারে আনার পর অল্প সময়েই বিক্রি হয়ে যায়। প্রতি বছর দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহও বাড়ছে।”
চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আজাদ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলার পাহাড়ি ও সমতল মিলিয়ে প্রায় ৭৫০ হেক্টর জমিতে পেয়ারার আবাদ হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও এবার ফলন সন্তোষজনক। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে উৎপাদন ও গুণগত মান আরও উন্নত করা যায়।
তিনি আরও জানান, সম্প্রতি বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে এসে কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার চন্দনাইশে একটি আধুনিক হিমাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পেয়ারাসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং কৃষকরা আরও ন্যায্যমূল্য পাবেন।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক চাষাবাদ, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং, কোল্ড চেইন ব্যবস্থা এবং রপ্তানি সুবিধা আরও সম্প্রসারণ করা গেলে চন্দনাইশের কাঞ্চন পেয়ারা দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি কৃষিপণ্যে পরিণত হতে পারে। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়বে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতি হবে আরও শক্তিশালী এবং হাজারো কৃষকের জীবন-জীবিকায় আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন।
স্থানীয়দের মতে, কাঞ্চন পেয়ারা এখন শুধু চন্দনাইশের একটি ঐতিহ্যবাহী ফল নয়; এটি এ অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা গেলে এই পেয়ারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষি রপ্তানির একটি উজ্জ্বল ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।
এব্যাপারে ফল ও সবজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ফুডস অ্যান্ড ভেজিটেবলস-এর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইসমাইল চৌধুরী হানিফ বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে শাকসবজি ও ফলের সঙ্গে আমরা পেয়ারা এবং লেবু মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে থাকি। তন্মধ্যে কাঞ্চন পেয়ারা উল্লেখযোগ্য।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এই পেয়ারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকার কাঞ্চন পেয়ারাসহ অন্যান্য জাতের পেয়ারা রপ্তানি হয়ে থাকে।চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হতে বহির্বিশ্বে মানসম্পন্ন শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্যাকিং হাউস নির্মাণ হলে আরও বেশি পরিমাণে পেয়ারাসহ দেশীয় ফলমূল ও শাকসবজি রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটানো যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।



















































