ফারুক হোসেন সজীব »
বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাটক রয়েছে, যেগুলো কেবল সাহিত্যকর্ম নয়, একটি জাতির ইতিহাস, বেদনা এবং সংগ্রামের জীবন্ত দলিল। বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন সেই বিরল সৃষ্টিগুলোর অন্যতম। প্রখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা ও গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত বিজন ভট্টাচার্য (১৭ জুলাই ১৯১৫ Ñ ১৯ জানুয়ারি ১৯৭৮) এই নাটক রচনা করে বাংলা নাট্যধারায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন। ১৯৪৪ সালে রচিত ও মঞ্চস্থ এই নাটকটির পটভূমি ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ বাংলার দুর্ভিক্ষ। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের অদম্য জীবনসংগ্রামকে তিনি এমন বাস্তবতা ও মানবিক গভীরতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন যে নবান্ন আজও বাংলা নাটকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের ভুল নীতি, খাদ্যসংগ্রহে বৈষম্য, মজুতদারি, কালোবাজারি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফলে বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খাদ্যের চরম সংকট দেখা দেয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। গ্রাম ছেড়ে অসংখ্য মানুষ খাদ্যের সন্ধানে শহরে ছুটে আসে। রাস্তাঘাট, রেলস্টেশন এবং ফুটপাতে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘ সারি। মানুষের মর্যাদা, সম্পর্ক এবং সামাজিক মূল্যবোধ এক ভয়ংকর পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। বিজন ভট্টাচার্য এই নির্মম বাস্তবতাকে দূর থেকে দেখেননি। তিনি মানুষের আর্তনাদ, কৃষকের অসহায়ত্ব এবং সমাজের অবক্ষয়কে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার গভীর বেদনাই নবান্ন নাটকের প্রাণশক্তি হয়ে ওঠে। ‘নবান্ন’ শব্দের অর্থ নতুন ধানের উৎসব। বাংলার কৃষিজীবী সমাজে এটি আনন্দ, প্রাচুর্য এবং নতুন জীবনের প্রতীক। কিন্তু বিজন ভট্টাচার্য এই উৎসবের প্রতীককেই নাটকের নাম হিসেবে ব্যবহার করে গভীর ব্যঙ্গ সৃষ্টি করেছেন। যে সময় নতুন ধান ঘরে ওঠার কথা, সেই সময়ই মানুষ খাদ্যের অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। তাই নবান্ন নামটি একই সঙ্গে আশা, বেদনা এবং সমাজবাস্তবতার এক শক্তিশালী প্রতীক। নবান্ন-এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি দরিদ্র কৃষক পরিবার এবং তাদের চারপাশের গ্রামীণ সমাজ। কৃষক সারাবছর মাঠে পরিশ্রম করেও নিজের পরিবারের জন্য অন্ন জোগাড় করতে পারে না। দুর্ভিক্ষ যত গভীর হয়, ততই মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ক্ষুধা কেবল শরীরকেই দুর্বল করে না, মানুষের মন, সম্পর্ক এবং নৈতিকতাকেও আঘাত করে। নাটকে দেখা যায়, একসময়ের সুখী গ্রাম ধীরে ধীরে মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়। মানুষ একমুঠো ভাতের জন্য ঘর ছেড়ে শহরের পথে বেরিয়ে পড়ে। পথে পথে ক্ষুধা, অপমান, রোগ, মৃত্যু এবং অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। তবুও নাটকটি কেবল হতাশার কাহিনি নয়। মানুষের ভেতরে যে অদম্য বেঁচে থাকার ইচ্ছা এবং একে অপরকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার শক্তি রয়েছে, সেটিও নাটকটির অন্যতম প্রধান সুর। নবান্ন-এর চরিত্রগুলো কোনো অতিমানব নয়। তারা বাংলার সাধারণ কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, গৃহবধূ, বৃদ্ধ, শিশু এবং অনাহারে ক্লিষ্ট মানুষ। তাদের আনন্দ, দুঃখ, ভয়, আশা এবং সংগ্রাম অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এই বাস্তবধর্মী চরিত্র নির্মাণের কারণেই নাটকটি দর্শকের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। নাটকের প্রতিটি চরিত্র যেন দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার একটি মুখ। তারা ব্যক্তিগত চরিত্র হয়েও একটি বৃহত্তর সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। এই বৈশিষ্ট্য নবান্ন-কে কেবল পারিবারিক নাটক নয়, একটি সামাজিক মহাকাব্যের মর্যাদা দিয়েছে। বিজন ভট্টাচার্যের ভাষা সহজ, স্বাভাবিক এবং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষার পরিবর্তে মানুষের মুখের ভাষাকে নাটকের প্রধান শক্তিতে পরিণত করেছেন। সংলাপগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও আবেগ, যন্ত্রণা এবং প্রতিবাদের শক্তিতে পরিপূর্ণ। কোথাও অতিনাটকীয়তা নেই বরং সংযত ভাষার মধ্য দিয়েই ক্ষুধার নির্মমতা ফুটে উঠেছে। নবান্ন দুর্ভিক্ষকে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখায় না। নাটকটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে মানুষের লোভ, শোষণ, মজুতদারি, কালোবাজারি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতাই এই বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। ফলে এটি কেবল মানবিক বেদনার নাটক নয় এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিবাদও। নাটকটি দর্শককে ভাবতে শেখায়Ñক্ষুধার জন্য প্রকৃতি যতটা দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী মানুষের সৃষ্টি করা বৈষম্য। এই উপলব্ধিই নবান্ন-কে একটি সমাজসচেতন নাটকে পরিণত করেছে। নবান্ন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ)-এর ইতিহাসে এক মাইলফলক। ১৯৪৪ সালে নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার পর তা অভূতপূর্ব সাড়া ফেলে। বিভিন্ন শহরে নাটকটি প্রদর্শিত হয় এবং প্রদর্শনী থেকে সংগৃহীত অর্থ দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের ত্রাণকাজে ব্যয় করা হয়। শিল্প যে সমাজের দুঃখে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে, নবান্ন তার উজ্জ্বল উদাহরণ। এই নাটকের মাধ্যমে বাংলা নাট্যমঞ্চে বাস্তববাদী অভিনয়, সমবেত অভিনয় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি নতুন ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে বহু নাট্যকার ও নাট্যদল নবান্ন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে। বাংলা নাটকের ইতিহাসে নবান্ন একটি যুগান্তকারী সৃষ্টি। এর আগে অধিকাংশ নাটকেই পৌরাণিক কাহিনি, অভিজাত সমাজ কিংবা পারিবারিক দ্বন্দ্ব প্রধান বিষয় ছিল। বিজন ভট্টাচার্য প্রথমবারের মতো ক্ষুধার্ত কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নাটকের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। এর ফলে বাংলা নাটক সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে। সমালোচকদের মতে, নবান্ন বাংলা বাস্তববাদী নাটকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এর শিল্পমান, ভাষা, চরিত্র নির্মাণ এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আজও নাট্যগবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে বহু বছর আগে। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখনও যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের ঘটনা ঘটছে। তাই নবান্ন কেবল অতীতের একটি নাটক নয়; এটি বর্তমান সময়েও সমান প্রাসঙ্গিক। আজও যখন কোনো শিশু ক্ষুধায় কাঁদে, কোনো কৃষক ন্যায্য মূল্য পায় না কিংবা কোনো পরিবার দারিদ্র্যরে কারণে ভেঙে পড়ে, তখন নবান্ন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে। এই নাটক মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় মানুষের কল্যাণে, শোষণে নয়। বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন বাংলা নাট্যসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এটি শুধু ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের দলিল নয় মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, প্রতিবাদ, সহমর্মিতা এবং মানবতার চিরন্তন কাহিনি। ক্ষুধার অন্ধকারের মধ্যেও মানুষ যে আশা হারায় না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে জানে এবং নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেÑনবান্ন সেই অমর সত্যের শিল্পিত প্রকাশ। সময়ের প্রবাহে বহু নাটক রচিত হয়েছে, বহু নাটক বিস্মৃত হয়েছে। কিন্তু নবান্ন আজও বেঁচে আছে, কারণ এটি কেবল একটি নাটক নয়; এটি বাংলার মানুষের কান্না, সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা এবং অদম্য জীবনশক্তির এক অনন্য দলিল। বিজন ভট্টাচার্যের এই অমর সৃষ্টি বাংলা সাহিত্য ও নাট্যকলার ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে!



















































