নিজাম সিদ্দিকী »
প্রতিদিন বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা অভিমুখে ছুটে চলে অসংখ্য যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন। কিন্তু সেই চলাচল সরাসরি না হয়ে ঘুরে যেতে হয় আখাউড়া, ভৈরব ও টঙ্গী হয়ে। এতে বেড়ে যায় যাত্রার সময়। সেই ভোগান্তি লাঘবে ঢাকা-কুমিল্লা অংশে নতুন কর্ডলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত এ কর্ডলাইন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে আসবে গতি। বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দুয়ার হবে উন্মোচিত। এক কর্ডলাইনেই বদলে যাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলযোগাযোগ।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর্ডলাইনের কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, প্রস্তাবিত তিনটি রুটের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুর থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত একটি রুট প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এই কর্ডলাইন চালু হলে গতিশীল হবে চট্টগ্রাম বন্দর, বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাও । তবে প্রকল্পটির জন্য বাজেটে আলাদা কোনো বরাদ্দ, সম্ভাব্য ব্যয় কিংবা বাস্তবায়নের সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রকল্পটির বিশদ নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি – ডেভেলাপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পের পটভূমি
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেনের বর্তমান রুটটি টঙ্গী, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে আখাউড়ার দীর্ঘ ঘুরপথের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সড়কপথে দূরত্ব ২৪৮ কিলোমিটার হলেও রেলপথে তা ঘুরে দাঁড়ায় প্রায় ৩২০ কিলোমিটারে। এই দীর্ঘসূত্রিতা দূর করতে ১৯৬৮ সালে প্রথম কর্ডলাইনের ধারণা দেওয়া হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক জাতীয় বাজেটে সরকার নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুর থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত সরাসরি কর্ডলাইন নির্মাণের ঘোষণা দেয় এবং এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) বর্তমানে চলমান রয়েছে।
প্রস্তাবিত কর্ডলাইনটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে সরাসরি নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া হয়ে কুমিল্লার সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে রেলপথের বর্তমান দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২০ কিলোমিটার থেকে কমে প্রায় ২৪০ কিলোমিটারে নেমে আসবে। সরাসরি রেল সংযোগের ফলে দুই শহরের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার কমে আসবে। ভ্রমণ সময় ৫-৬ ঘণ্টা থেকে নেমে মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা হবে।
পণ্য পরিবহনে সম্ভাবনা
ঢাকা-চট্টগ্রাম দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডর। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে অবস্থিত। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নির্মাণের অপেক্ষায় থাকা বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। এসব অবকাঠামো পুরোপুরি চালু হলে পণ্য পরিবহনের চাপ আরও বাড়বে।
বর্তমানে পণ্যবাহী ট্রেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম পথ পাড়ি দিতে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা সময় লাগে। কখনো কখনো ইঞ্জিন ও ট্রেন সংকটের কারণে ব্যবসায়ীদের আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। রেলওয়ের সূত্র মতে, পণ্য পরিবহন খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হচ্ছে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১ হাজার ৮৩৮টি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করেছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে চলাচল করেছে ৯৮৫টি ট্রেন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা।
একই সময়ে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭১৫টি ওয়াগন পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও পরিবহন হয়েছে মাত্র ৪৯ হাজার ৪৭৬টি ওয়াগন। রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকটই এর প্রধান কারণ বলে জানা গেছে। কারণ প্রতিদিন গড়ে ১৩টি ইঞ্জিন প্রয়োজন হলেও পাওয়া যায় তিন থেকে চারটি। ফলে পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা রেলপথে আস্থা হারাচ্ছেন।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন জানান, পূর্বাঞ্চল রেলে চাহিদা অনুযায়ী ইঞ্জিন নেই। মন্ত্রণালয়ে ইঞ্জিনের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্ড লাইন চালু হলে একই সময়ে আরও বেশি ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হবে। এতে যাত্রী ও পণ্য উভয় পরিবহনেই সক্ষমতা বাড়বে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, এই সরকার এটাকে (কর্ড লাইন) গুরুত্ব দিচ্ছে, এটার বিনিয়োগটা কিন্তু অনেক বেশি। তাঁর মতে, শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য কিন্তু এত বড় বিনিয়োগ করে কখনোই রিটার্নটা আনা সম্ভব না। তাহলে সমন্বিত উন্নয়ন মানে আমার যে অর্থনৈতিক কনট্রিবিউশনটা রেল দিতে পারত, কন্টেইনার পরিবহনের মাধ্যমে ভর্তুকি কমাতে পারত, সেই ধরনের কোনো উদ্যোগ আমরা রেলের দেখি না। পুরোনা পথটিকেও যেন বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই কর্ড লাইন নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি আমিরুল হক গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ড লাইন বাস্তবায়িত হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। চট্টগ্রাম বন্দর, বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাড়ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেলসংযোগও প্রয়োজন।
কর্ডলাইন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সবুক্তগীন বলেন, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা কর্ডলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার (ফিজিবিলিটি স্টাডি) কাজ চলমান রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ডলাইন প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট বাজেট, অর্থায়ন এবং সময়সীমা এখনও চূড়ান্ত হয়নি, কারণ প্রকল্পটি বর্তমানে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বিশদ নকশা (ডিটেইল ডিজাইন) প্রণয়নের স্তরে রয়েছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ রেলওয়ে এর কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।
সম্ভাব্য ব্যয়ের ধারণা
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র এবং সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্ববর্তী সময়ে একই রুটে অন্যান্য বড় প্রকল্পের (যেমন হাই-স্পিড রেল লাইন বা অন্যান্য ডাবল ট্র্যাকিং) জন্য প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০০ কোটি টাকার খসড়া প্রাক্কলন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে নতুন চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্টের সঠিক ব্যয় ডিপিপি তৈরির পর জানা যাবে। সরকার এই মেগা প্রকল্পের জন্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা (যেমন এডিবি বা বিশ্ব ব্যাংক) এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের উৎস খোঁজার পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে আগামী ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি – ডেভেলাপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) চূড়ান্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। নির্মাণ শুরুর সম্ভাব্য সময় ডিপিপি অনুমোদন এবং অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর ২০২৭ বা ২০২৮ সালের দিকে মাঠপর্যায়ের নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে।
প্রকল্প শেষের সম্ভাব্য সময়কাল
এই ধরনের বড় রেলপথ নির্মাণে সাধারণত ৪ থেকে ৫ বছর সময় লাগে। সেই হিসেবে কোনো বড় জটিলতা না হলে ২০৩২ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে এই কর্ডলাইনের কাজ পুরোপুরি শেষ হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।


















































