সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় : সৃজনশীল অভিনয়শিল্পী ও কবি

0
128

রতন কুমার তুরী :

সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করেছেন ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত অভিনয়শিল্পী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৫-২০২০)। তাঁর শূন্যতায় এখনও কাঁদছে ভারতীয় উপমহাদেশ। যাঁর অভিনয়ের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে ছিল বৈচিত্র্য এবং মননশীলতা। অভিনয় জগতের মহিরুহতুল্য এই মানুষটির নান্দনিক অভিনয় দেখেনি এমন মানুষ খুব কমই আছে। কারণ তিনি দীর্ঘদিন অভিনয় করে গেছেন ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

২০০৪ সালে ‘পদ্মভূষণ’, ২০০৬ সালে ‘জাতীয় পুরস্কার’, ২০১২ সালে ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার, ২০১৮ সালে ‘লিজিওন অব অনার’ পুরস্কার পাওয়া সৌমিত্র আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। মৃত্যু তো সবার ইবে, এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু চারিদিকে শূন্যতা তৈরি করতে ক’জন পারে?  সৌমিত্রের মৃত্যু চারিদিকে  সেই শূন্যতা তৈরি করেছে। তাঁর প্রস্থান অনেকের চোখেই জল এনে দিয়েছে।  সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম কলকাতার মির্জাপুর স্ট্রিটে (এখনকার নাম সূর্যসেন স্ট্রিট ) মধ্যবিত্ত এক পরিবারে। তাঁর জন্মের কয়েক মাস পর কৃষ্ণনগরে পাড়ি জমায় গোটা পরিবার। সমগ্র ভারত তখন স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তেজনায় ফুটছে। তাঁদের বাড়িতে আসা-যাওয়া ছিল নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু এবং বাঘা যতীনের মতো বড় বড় বিপ্লবীদের। ফলে  ছোটবেলা থেকেই সবার সাথে ভদ্র ব্যবহার এবং সবকিছুকে উদারতার সাথে বিচার করার শিক্ষাটা পেয়েছিলেন। পড়াশুনায় তিনি বরাবরই ভালো ছিলেন, তাই কৃষ্ণনগর  থেকে হাওড়া জেলা স্কুলে ভর্তি হন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা শেষ করে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ দেন থিয়েটারে। বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব শিশির ভাদুড়ির কাছে অভিনয় শেখেন। পরবর্তীকালে চাকরি নেন অল ইন্ডিয়া  রেডিওতে এবং পাশাপাশি সিনেমায় অভিনয় করার চেষ্টা চালিয়ে যান। কার্তিক চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’ ছবিতে সুযোগ পেয়েও স্ক্রিন টেস্টে পাস না করায় বাদ পড়েন। এর ফলে তাঁর আত্মবিশ্বাসে ভাটা পড়ে, কিন্তু তবুও তিনি হার মানলেন না। বিভিন্ন সিনেমার সেটে গিয়ে মনোযোগ সহকারে শ্যুটিং দেখতেন। এভাবেই একদিন সুযোগ আসে। ‘জলসাঘর’ চলচ্চিত্রের শ্যুটিংয়ের সময় হঠাৎ সত্যজিৎ রায় স্বয়ং ডাক দিলেন সৌমিত্রকে। সামনে তখন বসা ছিলের প্রখ্যাত অভিনেতা ছবি বিশ্বাস। ছবি বিশ্বাসকে সত্যজিৎ বললেন, এই ছেলেটা শিশির বাবুর কাছে অভিনয়  শেখে এবং আমার পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘অপুর সংসার’-এ অপুর চরিত্রটা করছে। এরপরের ইতিহাস সকলের জানা। ১৯৫৮ সালে কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ এর হাত ধরে বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার জগতে আত্মপ্রকাশ ঘটে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। যিনি তাঁর প্রথম সিনেমাতেই সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি লম্বা রেসের  ঘোড়া। এরপর সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’, ‘ঘরেবাইরে’, ‘অভিযান’, ‘অশনি সংকেত’, ‘গণশত্রু’, ‘হীরক রাজার  দেশে’, ‘সোনার কেল্লা’, জয় বাবা ফেলুদা’র মতো ১৪টি চলচ্চিত্রে তাঁর মনমাতানো অভিনয় বাঙালিদের মনে আজও অমলিন। এছাড়াও ‘অগ্রদানী’, ‘কোনি’, ‘আতঙ্ক’, ‘গণদেবতা’  থেকে হালের ‘বেলাশেষে’, ‘পোস্ত’ কিংবা ‘সাঁঝবাতি’র মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়ের ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন হয়নি, এমন বাঙালি বোধ হয় খুব কমই পাওয়া যাবে। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি আমাদের কাছে পরিচিতি ছিলেন একজন নাট্যকার, আবৃত্তিশিল্পী, কবি, চিত্রশিল্পী এবং সাহিত্য সম্পাদক হিসাবেও। তাঁর কাব্যচর্চাও তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি দিয়েছে। তাঁকে নিয়ে লেখক অমিতাভ চৌধুরীর ছড়া :

 

‘নুন-সাহেবের ছেলে তিনি

সত্যজিতের নায়ক,

অভিনয়ে ছাড়েন তিনি

ফাস্টোকেলাস শায়ক।

 

কখন তিনি অপুবাবু

কখন তিনি ফেলুদা,

মাঝে মাঝে পদ্য লেখেন

যেন পাবলো নেরুদা।’

 

তাঁর ১৪টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম কবিতার বইয়ের নাম ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াব বলে’ (১৯৭৫)। তারপর থেকে একে একে বেরিয়েছে : ‘ব্যক্তিগত নক্ষত্রমালা‘, ‘শব্দেরা আমার বাগানে’, ‘পড়ে আছে চন্দনের চিতা’, ‘হায় চিরজল’, ‘পদ্মবীজের মাল’, ‘হে সায়ংকাল’, ‘জন্ম যায় জন্ম যাবে’, ‘হলুদ রোদ্দুর’, ‘মধ্যরাতের সংকেত’।

তাঁর অভিনিত ‘কিং লিয়ার‘ চরিত্রটি মঞ্চাভিনয়ের জগতে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতাটি তাঁর কণ্ঠে শোনার পর চোখে জল আসেনি এমন খুব কম বাঙালিই আছেন। দীর্ঘ ৬০ বছরের অভিনয় জীবনে তিনি ৩০০’র বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। শিল্প এবং শিল্পী এই অসাধারণত্বের জোরেই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন তিনি। অবশ্য বেঁচে থাকার এই তাগিদ তার মধ্যে বরাবরই ছিল। আর এই তাগিদেই তুমুল তারকাখ্যাতি থাকা সত্ত্বেও তিনি মঞ্চে অভিনয় করেছেন, যাত্রায় অভিনয় করার জন্য ছুটে গেছেন গ্রামে-গঞ্জে। এসব কিছুই টাকার জন্য নয়, সামনা-সামনি তাঁর অভিনয় দেখে দর্শক কি প্রতিক্রিয়া জানায়, তা জানার জন্য! তিনি বলতেন, অভিনয় ছাড়া তিনি বাঁচতে পারবেন না, সত্যিই পারলেন না। কারণ অভিনয় ছিল তাঁর কাছে অক্সিজেনের মতো। সারাজীবন জীবন্ত অভিনয় করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন দখল করে নিয়েছেন। বলতে গেলে অভিনয়দক্ষতা দিয়েই তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছেন।

এই মানুষটা আজ আমাদের মধ্যে নেই, আছে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো আর ওই চলচ্চিত্রগুলেতে তাঁর শালীন অভিনয়শিল্প। সমগ্র ভারত উপমহাদেশের মানুষ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে আজীবন মনে রাখবে শুধু তার বিশাল সৃজনশীল কর্মযজ্ঞের জন্য।