ফিচার এলাটিং বেলাটিং

সাত নম্বর সেলাই

শামীমা নাসরিন »

চরকলসা গ্রামের একেবারে শেষ মাথায়, বাঁশঝাড়ের ছায়ায়, সেলিম দর্জির ছোট্ট দোকান। দোকানের নাম ‘নতুন ফিটিং টেইলার্স’। নাম শুনে মনে হয় শহরের নামকরা দোকান। কিন্তু টিনের সাইনবোর্ডের রঙ এমনভাবে খসে পড়েছে যে, দূর থেকে পড়লে মনে হয় লেখা আছে ‘নতুন চিন্তা টেইলার্স’।
সেলিম দর্জি অবশ্য নতুন চিন্তাও খুব একটা করতে পারে না। সে জামা সেলাই করে ঠিকই, কিন্তু তার সেলাই যেন বহু বছর আগের গল্প। এখনকার ছেলেরা চায় স্মার্ট কাট, নতুন ডিজাইন, অদ্ভুত পকেট, রঙিন কলার। সেলিম এখনও একই মাপে জামা বানায়। ফলে যার জামা বানায়, সে পরে আয়নায় নিজেকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কেউ মুখে কিছু বলে না। গ্রামের মানুষ ভদ্র। কিন্তু দ্বিতীয়বার আর আসে না।
দিন গড়িয়ে যায়। দোকানে কাপড় কমে, দেনা বাড়ে। একদিন এমন হলো, দোকানের কাঠের ড্রয়ার খুলে সেলিম দেখল, ভেতরে শুধু একটি সুই, সাত রঙের কয়েক গজ সুতা আর আধখানা সাদা কাপড় পড়ে আছে। বাড়ি ফিরে সে চুপচাপ বসে থাকে। তার বৃদ্ধা মা হাঁড়িতে ভাত নেড়ে বলেন, মানুষের ভাগ্য কখনো সুতোয় জট লাগে, আবার খুলেও যায়। জট দেখে সুতো ফেলে দিতে নেই।
সেলিম শুধু হেসে মাথা নাড়ে। পরদিন সেই আধখানা কাপড় বিক্রি করতে বাজারে বের হয়। পথে দেখে, রাস্তার পাশে এক অন্ধ বৃদ্ধ বসে আছেন। তাঁর গায়ে ছেঁড়া চাদর। কাঁপতে কাঁপতে বললেন, বাবা, পুরোনো একটা কাপড় হলেও দাও।
সেলিম অনেকক্ষণ কাপড়টার দিকে তাকিয়ে রইল। এটাই তার শেষ সম্বল। তবু সে কাপড়টা বৃদ্ধের হাতে তুলে দিল। খালি হাতে বাড়ি ফিরল। সেদিন রাতে দোকান খুলল না। শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো মেঝেতে এসে পড়ল। ভোরে দোকানে এসে সে থমকে দাঁড়াল। কাঠের টেবিলের ওপর একটি ছোট্ট ছেলের জামা রাখা। কিন্তু সে জীবনে এমন জামা দেখেনি। জামাটার সেলাই যেন সুতো দিয়ে নয়, সকালের আলো দিয়ে করা। হাতার ভাঁজ নদীর ঢেউয়ের মতো নরম। কলারের বাঁক দেখে মনে হয়, কেউ হাসতে হাসতে কাপড় ভাঁজ করেছে।
সেলিম অবাক। কে বানাল? কোথা থেকে এল? কিছুই বুঝল না। জামাটা বাজারে নিয়ে যেতেই এক ধনী ব্যবসায়ী দাম না করেই কিনে নিলেন। সেলিম সেই টাকা দিয়ে কাপড়, সুতা, বোতাম কিনল। ফেরার পথে দুজন গরিব শিশুর জন্য বিস্কুটও কিনে দিল। রাতে তিনটি জামার কাপড় কেটে রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে উঠে দেখে তিনটি জামাই তৈরি। আর প্রতিটি আগেরটার চেয়েও সুন্দর। এভাবে দিন চলতে লাগল। যতবার সে মন ভালো রেখে মানুষের উপকার করে, ততবার সকালে আরও নিখুঁত জামা পায়। কিন্তু রহস্যটা আর সহ্য হয় না।
এক রাতে সে আর তার মা দোকানের আলমারির আড়ালে লুকিয়ে রইল। মাঝরাত। চারদিক নিস্তব্ধ। হঠাৎ জানালার ফাঁক দিয়ে তিনটি ক্ষুদ্রাকৃতি বৃদ্ধা ভেতরে ঢুকলেন। তাঁদের উচ্চতা হাঁটুর বেশি নয়। একজনের চুল তুষারের মতো সাদা। একজনের হাতে রুপোর কাঁচি। আরেকজনের কোমরে সাত রঙের সুতার গোলা। তাঁরা কোনো কথা বলেন না। শুধু কাজ করেন। কাঁচির শব্দও হয় না। সুইয়ে সুতা পরানোরও দরকার পড়ে না। মনে হয় কাপড় নিজেই বুঝে যায় কোথায় সেলাই বসবে। ভোর হওয়ার আগেই তিন বৃদ্ধা জানালা দিয়ে মিলিয়ে গেলেন।
পরদিন সেলিম অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার মা বললেন, যারা নিজের পরিচয় না দিয়ে উপকার করে, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হলো কৃতজ্ঞতা।
সেলিম মাথা নেড়ে বলল, ওদের জন্য আমি কিছু বানাব।
কয়েক দিন ধরে সে নিজের হাতে তিন জোড়া নরম জুতা বানাল। মা সেলাই করলেন তিনটি উষ্ণ জামা। সেই রাতে কাপড় না রেখে শুধু উপহারগুলো টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা হলো। মধ্যরাতে তিন বৃদ্ধা এলেন। উপহার দেখে তাঁরা প্রথমে অবাক হলেন। তারপর এমন এক হাসি হাসলেন, যেন শুকনো পাতায় হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছে। তাঁরা নতুন জামা পরলেন। জুতা পরে কয়েক পা নাচলেন। তারপর সবচেয়ে বয়স্ক বৃদ্ধা বাতাসে আঙুল দিয়ে একটি সেলাই টেনে দিলেন। সেলাইটি সোনালি আলো হয়ে ভেসে গিয়ে সেলিমের পুরোনো সেলাই বাক্সের ভেতরে ঢুকে গেল।
তিনজন একসঙ্গে বললেন, শেষ সেলাই আমরা দিলাম। এবার থেকে বাকি সেলাই তোমার।
এই বলে তাঁরা চলে গেলেন। সেদিনের পর আর কোনো অলৌকিক জামা তৈরি হলো না। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। সেলিম যখনই নতুন কোনো জামা বানাতে বসে, মানুষের মুখটা আগে কল্পনা করতে পারে। কে দৌড়াবে, কে গাছে উঠবে, কে বই পড়বে, কে বৃষ্টিতে ভিজবে সব যেন বুঝতে পারে। তাই তার প্রতিটি জামা হয়ে ওঠে আলাদা। কোনোটার পকেট গভীর, কারণ ছেলেটা কাঁচের গুলি রাখে। কোনোটার কাঁধ শক্ত, কারণ মেয়েটা ঘুড়ি ওড়াতে ভালোবাসে। কোনোটার হাতা একটু ঢিলা, কারণ তার মালিক সব সময় হাতা গুটিয়ে কাজ করে। মানুষ দূরদূরান্ত থেকে তার দোকানে আসতে শুরু করল। কেউ শুধু জামা কিনত না। গল্পও নিয়ে যেত। অনেক বছর পরে সেলিমের দোকানের নতুন সাইনবোর্ডে লেখা হলো, ‘সাত নম্বর সেলাই’। গ্রামের ছোটরা নামটার মানে জিজ্ঞেস করলে সেলিম শুধু মুচকি হেসে বলত, প্রথম ছয়টা সেলাই সুই আর সুতা দেয়। কিন্তু সাত নম্বর সেলাইটা দিতে হয় মন দিয়ে। সেই সেলাই ঠিক হলে, জামা শুধু গায়ে মানায় না মানুষের মনেও মানিয়ে যায়।

-advertise-