এ মুহূর্তের সংবাদ

বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগের ভালো-মন্দ

ইতিহাস, বাস্তবতা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

জাফর আলম »

বিশ্ববাণিজ্যের ইতিহাসের সঙ্গে সমুদ্র, জাহাজ ও বন্দরের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আজও আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ পণ্য সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। দেশের অভ্যন্তরেও নদীপথে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা সম্ভব তুলনামূলক কম খরচে এবং কম পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি করে। তাই একটি দেশের বন্দর কেবল জাহাজ ভেড়ানো কিংবা পণ্য ওঠানো-নামানোর স্থান নয়; এটি সেই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

---------

আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। কিন্তু আজকের আধুনিক বন্দরটি একদিনে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত বিবর্তন, সরকারি বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি উদ্যোগের অংশগ্রহণ। বর্তমানে যখন বাংলাদেশের বন্দর খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরদের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন এই দীর্ঘ ইতিহাসের আলোকে বিষয়টিকে দেখা প্রয়োজন। প্রাচীন পোতাশ্রয় থেকে চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

কর্ণফুলী নদীর মোহনা, আশপাশের পাহাড় এবং প্রাকৃতিক ভূগঠন চট্টগ্রামকে একটি নিরাপদ পোতাশ্রয়ের বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। এ কারণেই বহু শতাব্দী ধরে দেশি-বিদেশি নাবিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে চট্টগ্রাম আকর্ষণীয় ছিল। মানুষ যখন প্রথম নৌযানে উপকূল ধরে এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে চলাচল শুরু করে, তখনই মূলত সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে নৌযানের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চল, এক দেশ থেকে অন্য দেশ এবং শেষ পর্যন্ত এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন শুরু হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে পোতাশ্রয় ও বন্দর হয়ে ওঠে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। চট্টগ্রামও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আরব, পারস্য, ইয়েমেন ও চীনের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময়ে এখানে এসেছেন। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় বণিকদের আগমন ঘটে। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ এবং ইংরেজ বণিকেরা চট্টগ্রামকে শুধু ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবেই দেখেনি; বন্দরের নিয়ন্ত্রণও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম ও এর সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের কর্তৃত্ব নিয়ে পর্তুগিজ, আরাকানি-মগ, ওলন্দাজ এবং স্থানীয় ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সংঘাত হয়েছে। ১৬৬৬ সালে মোগলরা চট্টগ্রাম দখল করে তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করে। পরবর্তী সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব বাড়তে থাকে এবং ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরও ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে। আধুনিক বন্দরের সূচনা দীর্ঘ সময় চট্টগ্রাম মূলত প্রাকৃতিক পোতাশ্রয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এর প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত রূপান্তর দ্রুততর হয়। আইনি কাঠামোর অধীনে বন্দরের ব্যবস্থাপনা সংগঠিত হয় এবং জেটিভিত্তিক আধুনিক বন্দরের বিকাশ শুরু হয়। এই ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে রেলওয়ের সঙ্গে বন্দরের সংযোগ। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানির উদ্যোগে জেটি ও পশ্চাৎভূমির যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটে। অর্থাৎ আজ আমরা যে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা করছি, তার অনেক আগে থেকেই বন্দরকে ঘিরে সরকারি কর্তৃত্বের পাশাপাশি বেসরকারি পুঁজির অংশগ্রহণের নজির এই অঞ্চলে দেখা গেছে। পরবর্তী সময়ে বন্দরের ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন পরিবর্তন আসে। পোর্ট কমিশনার ব্যবস্থা থেকে ১৯৬০ সালে পোর্ট ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২-এর অধীনে বন্দর পরিচালিত হচ্ছে এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে। মুক্তিযুদ্ধ ও চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও চট্টগ্রাম বন্দরের বিশেষ স্থান রয়েছে। ১৯৭১ সালের আগস্টে পরিচালিত ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল চট্টগ্রাম বন্দর। বীর নৌ-কমান্ডোদের অভিযানে বন্দরে অবস্থানরত বেশ কয়েকটি জাহাজ অচল করা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং ও বীমা খাতে ঝুঁকির ধারণা বৃদ্ধি পায় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সমুদ্রপথে রসদ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামনে তাই শুধু একটি বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব ছিল না; যুদ্ধবিধ্বস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথকে আবার সচল করার বিশাল চ্যালেঞ্জও ছিল। কর্ণফুলী চ্যানেলে ডুবে থাকা জাহাজ এবং যুদ্ধকালীন বিস্ফোরক ও মাইন অপসারণ ছিল জরুরি কাজ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নৌ বিশেষজ্ঞ ও সদস্যরা এই বিপজ্জনক কাজে সহায়তা করেন। তাদের অবদান চট্টগ্রাম বন্দরকে দ্রুত সচল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাহাজ এগিয়েছে দ্রুত, বন্দর কেন পিছিয়েছে? বিশ্বের বন্দর ব্যবস্থাপনার একটি ঐতিহাসিক সমস্যা ছিল-জাহাজের প্রযুক্তিগত বিবর্তন এবং বন্দরের অবকাঠামোগত বিবর্তনের গতির মধ্যে ব্যবধান। পণ্যবাহী জাহাজের মালিকানা ও পরিচালনা দীর্ঘদিন ধরেই প্রধানত বেসরকারি খাতের হাতে ছিল। ফলে প্রতিযোগিতার কারণে জাহাজে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঘটেছে দ্রুত। পালতোলা জাহাজ থেকে স্টিমার, ডিজেলচালিত স্টিলের জাহাজ, বাল্ক ক্যারিয়ার, কন্টেইনার জাহাজ, এলএনজি ও এলপিজি ভেসে-প্রতিটি ধাপে জাহাজের আকার, ধারণক্ষমতা এবং প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। অন্যদিকে বন্দরগুলো দীর্ঘদিন সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে তুলনামূলক ধীরগতিতে। বড় জাহাজের জন্য গভীর চ্যানেল, আধুনিক ক্রেন, উন্নত ইয়ার্ড, ডিজিটাল টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম এবং দ্রুত স্থলসংযোগ প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু অনেক উন্নয়নশীল দেশের সরকারি বন্দর সেই গতিতে বিনিয়োগ করতে পারেনি। চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রেও এই ব্যবধান দেখা গেছে।

১৯৭৭ সালে মাত্র ছয়টি কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কন্টেইনার যুগে প্রবেশ করে। প্রথম দিকে জেনারেল কার্গো বার্থের অংশবিশেষ ব্যবহার করে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়। পরবর্তী সময়ে চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল বা সিসিটি এবং নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি নির্মিত হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সার্ভিলেন্স ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামো আধুনিকায়নের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা ও অপারেশনাল কাঠামোর সংস্কার সব সময় একই গতিতে এগোয়নি। বিশ্বে বন্দর ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিশ্বব্যাপী বন্দর সংস্কারের নতুন ধারা শুরু হয়। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বন্দর ব্যবস্থাপনার সংস্কার নিয়ে কাজ শুরু করে।

সাধারণভাবে বন্দর ব্যবস্থাপনার চারটি মডেল আলোচিত হয়-

১. সার্ভিস পোর্ট-যেখানে অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও অপারেশন মূলত সরকারি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকে।

২. টুল পোর্ট-যেখানে সরকার অবকাঠামো ও প্রধান যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে, কিন্তু কিছু অপারেশন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

৩. ল্যান্ড লর্ড পোর্ট-যেখানে ভূমি ও মৌলিক অবকাঠামোর মালিকানা সরকারের হাতে থাকে, সরকার নিয়ন্ত্রক ও তদারককারী ভূমিকা পালন করে, কিন্তু টার্মিনাল উন্নয়ন, যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ ও অপারেশনের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বেসরকারি অপারেটর পরিচালনা করে।

৪. প্রাইভেট সার্ভিস পোর্ট- যেখানে বন্দর অবকাঠামো ও পরিচালনার অধিকাংশই বেসরকারি খাতের হাতে থাকে। বিশ্বের সফল বৃহৎ বন্দরগুলোর মধ্যে ল্যান্ড লর্ড পোর্ট মডেলবিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর প্রধান সুবিধা হলো-রাষ্ট্র কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও ভূমির মালিকানা ধরে রাখতে পারে, আবার বেসরকারি পুঁজি, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অপারেশনাল অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে পারে। বাংলাদেশেও পরিবর্তন শুরু হয়েছে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনাতেও এই পরিবর্তন দৃশ্যমান। চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হয়েছে। কনসেশন চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল-এর সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

অন্যদিকে বে-টার্মিনালের পরিকল্পনা আরও বৃহৎ পরিসরে আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার সুযোগ সৃষ্টি করছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নতুন টার্মিনাল ও বন্দরগুলোতে ল্যান্ডলর্ড মডেল এবং পিপিপি-এর ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি শুধু বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার বিষয় নয়। বরং এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পুঁজি, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং বৈশ্বিক বন্দর নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগের লাভ কোথায় বাংলাদেশের মতো দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক কন্টেইনার টার্মিনাল, উন্নত লজিস্টিকস এবং দ্রুত পণ্য খালাস ব্যবস্থা তৈরি করতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। সরকারের একার পক্ষে সব বিনিয়োগ করা কঠিন। আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হলে কয়েকটি বড় সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

প্রথমত, সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক মূলধনী বিনিয়োগের চাপ কমতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা আসতে পারে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম, অটোমেশন, যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনা এবং পারফর্মেন্স মনিটরিং চালু করা সহজ হতে পারে।

চতুর্থত, একাধিক দক্ষ অপারেটরের মধ্যে বাস্তব প্রতিযোগিতা তৈরি করা গেলে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।

পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন ও লজিস্টিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ শক্তিশালী হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল এবং পণ্য খালাসের সময় কমলে শুধু বন্দরের ব্যবহারকারীরা নয়, পুরো অর্থনীতি লাভবান হয়। কারণ বন্দরের অদক্ষতার মূল্য শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ মানেই কি সব সমস্যার সমাধান? অবশ্যই নয়। বিদেশি বিনিয়োগের সুফল অনেকাংশে নির্ভর করবে কনসেশন চুক্তির গুণগত মানের ওপর। বন্দর টার্মিনালের কনসেশন চুক্তি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয়। ২০, ২৫ কিংবা তারও বেশি সময়ের জন্য একটি অপারেটরকে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো পরিচালনার অধিকার দেওয়া হতে পারে। ফলে আজ একটি ভুল শর্তে স্বাক্ষর করলে তার আর্থিক ও কৌশলগত মূল্য বহু বছর ধরে দেশকে দিতে হতে পারে। অন্যদিকে একটি ভালো চুক্তি রাষ্ট্রের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রেখেও বিপুল বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা আকর্ষণ করতে পারে। তাই চুক্তিতে বিনিয়োগের পরিমাণ, ট্যারিফ নির্ধারণ, রাজস্ব ভাগাভাগি, পারফরম্যান্স স্ট্যান্ডার্ড মিনিমাম গ্র্যান্টেড  থ্রোপুট, পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা, শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা, তথ্যের মালিকানা ও সুরক্ষা, অডিটের অধিকার, চুক্তি বাতিলের শর্ত, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং চুক্তির মেয়াদ শেষে সম্পদ হস্তান্তর-সবকিছু অত্যন্ত স্পষ্ট হওয়া দরকার। আজ যারা চুক্তি করবেন, দশ বা বিশ বছর পর তারা হয়তো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে থাকবেন না। কিন্তু চুক্তি থাকবে। তখন কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে নতুন কর্মকর্তাদের সেই চুক্তির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। তাই বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পিপিপি, পোর্ট ইকোনমিক্স, কনসেশন, ম্যানেজমেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল, কমার্শিয়াল ল গেস ডিসপিউট রেজুলেশন বিষয়ে বিশেষায়িত দক্ষতা তৈরি করা জরুরি।

সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি কোথায়? বন্দর একসময় সরাসরি সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। ইতিহাসের অভিজ্ঞতার কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বন্দর পরিচালনায় অংশগ্রহণ নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি-বন্দরের মালিকানা বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া এবং নির্দিষ্ট একটি টার্মিনাল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কনসেশন চুক্তিতে আন্তর্জাতিক অপারেটরকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া এক বিষয় নয়। ল্যান্ড লর্ড মডেলে ভূমি ও মৌলিক অবকাঠামোর মালিক রাষ্ট্রই থাকে। বন্দর কর্তৃপক্ষ থাকে রাষ্ট্রের হাতে। কাস্টম, ইমিগ্রেশন, পোর্ট স্টেইট কনট্রোল, কোস্ট গার্ড, নেভি, সিকিউরিটি গেস রেগুলেটরি অথোরিটি ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণেই থাকে। বেসরকারি অপারেটরের কাজ প্রধানত বাণিজ্যিক টার্মিনাল পরিচালনা। তাই বিদেশি বিনিয়োগের প্রশ্নকে শুধু ‘বিদেশি বনাম দেশি’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির প্রকৃত অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব ধরা পড়বে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত-রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের স্বার্থ সংরক্ষণ করে চুক্তি করছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। বন্দর একা কাজ করে না। বন্দরের সাথে কাস্টমস, শিপিং এজেন্টস, ফ্রেইট ফরোওয়ার্ডার্স, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস, ব্যাংকস, গ্যারেনটাইন, স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং এজেন্সিস, রোড অ্যান্ড রেল অপারেটর্স, ইম্পোটার্স-এক্সপোটার্স-সবাই মিলে একটি পোর্ট কমিউনিটি তৈরি করে। এর একটি বাস্তব শিক্ষা আমরা পেয়েছি ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময়। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পরও চট্টগ্রাম বন্দর ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। বিদেশি জাহাজ এসেছে, আমদানি পণ্য খালাস হয়েছে এবং রপ্তানি পণ্য জাহাজে তোলা হয়েছে। কিন্তু আমদানিকারকসহ বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় আমদানি করা কন্টেইনার দ্রুত বন্দর থেকে বের হতে পারেনি। ফলে ইয়ার্ডে কন্টেইনার জমতে জমতে একসময় ধারণক্ষমতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। নতুন জাহাজের কন্টেইনার খালাস করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এই ঘটনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে- পোর্ট অ্যাফেসিয়েন্সি ইজ নট দ্য অ্যাফেসিয়েন্সি অফ দ্য পোর্ট অথরিটি অ্যালোন; ইট ইজ দ্য অ্যাফেসিয়েন্সি অফ দ্য এনটায়ার পোর্ট অ্যান্ড লজিস্টিকস কমিউনিটি। অর্থাৎ শুধু বন্দরে আন্তর্জাতিক অপারেটর এনে আধুনিক ক্রেন বসালেই বিশ্বমানের বন্দর তৈরি হবে না। কাস্টমস যদি একই গতিতে কাজ না করে, সড়ক ও রেল যোগাযোগ দুর্বল থাকে, পণ্য পরীক্ষার প্রতিষ্ঠান দেরি করে, আমদানিকারক সময়মতো পণ্য না নেয় কিংবা ডিজিটাল সিস্টেমগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত না হয়-তাহলে আধুনিক টার্মিনালের সক্ষমতার পুরো সুবিধা পাওয়া যাবে না। এখন সময় ল্যান্ড লর্ড পোর্ট মডেল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বিশ্বের বন্দর ব্যবস্থাপনা যে দিকে এগিয়েছে, বাংলাদেশকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। সরকারের ভূমিকা ক্রমশ সরাসরি অপারেটর থেকে শক্তিশালী ল্যান্ডলর্ড, রেগুলেটর এবং ফেসিলিয়েটর-এ রূপান্তরিত হওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডিপি ওয়ার্ল্ড, পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল-সহ বিভিন্ন বৈশ্বিক টার্মিনাল অপারেটর বহু দেশে বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। বড় শিপিং ও লজিস্টিকস গ্রুপও এখন টার্মিনাল ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশেরও এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও পুঁজিকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। তবে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। একটি সরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থাকে যদি কেবল একটি বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল আসবে না। একাধিক দক্ষ অপারেটরের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছ ট্যারিফ ব্যবস্থা, মিজারেবল পারফরম্যান্স ইনডিকেটর্স এবং শক্তিশালী বন্দর কর্তপক্ষ থাকলেই ল্যান্ডলর্ড মডেল -এর প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব। আগামী দশ বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের বন্দর খাতের জন্য আগামী এক দশক সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকালগুলোর একটি। চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর আধুনিকায়ন, বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সংশ্লিষ্ট সড়ক- রেল-লজিস্টিক অবকাঠামো দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির মানচিত্র বদলে দিতে পারে। আজকের সিদ্ধান্তের সুফল বা কুফল কয়েক বছরের জন্য নয়; বহু দশক ধরে অনুভূত হবে। তাই বিদেশি বিনিয়োগকে ভয় পাওয়ারও কারণ নেই, আবার বিনা প্রশ্নে স্বাগত জানানোরও সুযোগ নেই। প্রয়োজন স্মার্ট রাষ্ট্র, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ চুক্তি ব্যবস্থাপনা। বিদেশি অপারেটরের পুঁজি, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আমাদের দরকার। একই সঙ্গে দরকার রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তা, পরিবেশ, শ্রমিকের অধিকার এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত-মালিকানা নয়, দক্ষতা ; মনোপলি নয়, প্রতিযোগিতা; গোপনীয়তা নয়, জবাবদিহিতা; এবং শুধু অবকাঠামো নয়, পুরো লজিস্টিক্স ইকো সিস্টেম-এর আধুনিকায়ন। চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। যে বন্দরকে ঘিরে শত শত বছর ধরে ব্যবসায়ী এসেছে, সাম্রাজ্য প্রতিযোগিতা করেছে, যুদ্ধ হয়েছে, আবার স্বাধীনতার জন্য নৌ-কমান্ডোরা জীবন বাজি রেখেছেন-সেই বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তও নিতে হবে ইতিহাসের শিক্ষা মাথায় রেখে। বাংলাদেশের বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ তাই নিজে ভালো বা মন্দ নয়। ভালো-মন্দ নির্ধারিত হবে বিনিয়োগের কাঠামো, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, কনসেশন চুক্তির মান এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির সক্ষমতা দিয়ে। সঠিক পরিকল্পনা ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পুঁজি ও দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের বন্দরগুলো শুধু দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রবেশদ্বার হয়ে থাকবে না; এগুলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। আগামী দশক তাই শুধু বন্দর নির্মাণের সময় নয়-আগামী শতাব্দীর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতার ভিত নির্মাণের সময়।

লেখক : অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত) ও সাবেক সদস্য, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।