এ মুহূর্তের সংবাদ

চট্টগ্রামে চরম গ্যাসসংকট কাটবে কবে

দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রামে নতুন করে দেখা দেওয়া তীব্র গ্যাস-সংকট আমাদের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার এক চরম ভঙ্গুর চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্যমতে, বন্দরনগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুটÍযা চাহিদার মাত্র ৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ দৈনিক প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ঘনফুটের বিশাল ঘাটতি নিয়ে ধুঁকছে কেজিডিসিএলের সরবরাহ ব্যবস্থা। এর সরাসরি নির্মম প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের লাখ লাখ আবাসিক গ্রাহক, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিভিন্ন ভারী শিল্পকারখানার ওপর।

আবাসিক এলাকায় দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চুলা না জ্বলা কিংবা রাতে কম চাপের গ্যাসে রান্না করতে না পারা নগরবাসীর নিত্যদিনের চরম ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। বাসাবাড়িতে বিকল্প হিসেবে কেরোসিন বা এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে।
এই আকস্মিক সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বা টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি কিংবা দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে; কিন্তু প্রশ্ন হলোÍএকটিমাত্র টার্মিনালে সরবরাহ বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই কি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরীর উৎপাদনব্যবস্থা ও নাগরিক জীবন স্থবির হয়ে পড়বে? এটি আমাদের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাহীনতা ও বিকল্প ব্যবস্থার চরম ঘাটতিকেই উন্মোচিত করে। জাতীয় গ্রিডে আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসার খেসারত সবচেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে চট্টগ্রামকে।
এই সংকটের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে। চট্টগ্রামের স্পিনিং, পোশাক, স্টিল ও সিরামিক খাতগুলো গ্যাস সংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। কম চাপের গ্যাসে কারখানা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী খাতের জন্য বড় বিপর্যয়ের বার্তা নিয়ে আসছে। ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ হ্রাস পাওয়ার ফলে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় পণ্যের উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় স্থল ও সমুদ্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ না নিয়ে কেবল এলএনজি আমদানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করাই আজকের এই গভীর সংকটের মূল কারণ। এ অবস্থায় কেজিডিসিএল ও পেট্রোবাংলাকে দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস পুনর্বণ্টন করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সরবরাহ বাড়াতে হবে। একই সাথে মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল দ্রুত মেরামত এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার বিকল্প নেই। দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড চট্টগ্রামকে এভাবে জ্বালানি সংকটে স্থবির হতে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

-advertise-