ফিচার এলাটিং বেলাটিং

আপাস্যার

গাজী তারেক আজিজ »

রিতা আর মিতা দুই বোন। রাতে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়েছে। চোখে ঘুম আসি আসি। সকাল সকাল উঠতে হবে। সকাল দশটায় রেজাল্ট প্রকাশের সময়। তাদের দুইজনই পড়াশোনায় খুব সিরিয়াস। ক্লাস রোলও এক দুই থাকে সবসময়।
মজার ব্যাপার হচ্ছে রিতা আর মিতা সকল বিষয়ে একই মার্ক পেয়ে পাস করে। কিন্তু রোল আগে পরে না দিয়ে উপায় নেই। এক্ষেত্রে শিক্ষকরাও এই সমস্যায় মহা বেকায়দায় পড়ে যান। কাকে এক দিবেন, আর কাকে দুইয়ে!
প্রধান শিক্ষকও এ নিয়ে চরম বিপাকে। পরে সকল শিক্ষককে নিয়ে মিটিংয়ে বসেন হেড স্যার। একেকজন পরামর্শ দেন একেকরকম। রবি স্যার প্রধান শিক্ষককে উদ্দেশ করে বাকি শিক্ষকদের দিকে তাকিয়ে বলেন, স্যার নামের আদ্যক্ষর অনুযায়ী হলে কেমন হয়? সুমন স্যার সায় দিয়ে বলেন, মন্দ নয়। সাবিনা ম্যাম বলেন, স্যার উচ্চতা অনুযায়ী হলে কেমন হয়? এই কথা শুনে সবার সে কি হাসির রোল! কারণ সাবিনা ম্যাম অনেকটা সহজ-সরল। সবার হাসিতে সাবিনা ম্যামও কিছুটা বিব্রত হন। অবশ্য সাবিনা ম্যামসহ সকল মহিলা শিক্ষকদের ছাত্র-ছাত্রীরা আপাস্যার ডেকে অভ্যস্ত।
প্রধান শিক্ষক এই পরিস্থিতি দেখে মুখ চেপে নিয়ে অন্যান্য শিক্ষকদের দিকে তাকান। যেন বিস্ময় ভরা। এদিকে অন্যান্য শিক্ষকরাও পরামর্শ দিয়েই চলেছেন। প্রধান শিক্ষকের মনপুত হচ্ছে না। তবে কোন যুক্তিই একবাক্যে গ্রহণ কিংবা বর্জন না করে নিজেও চিন্তা করতে থাকেন।
অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে মারুফা ম্যাম বলে ওঠেন, আচ্ছা স্যার রিতা মিতাকে ডেকে একটা সমাধানে আসা যায়। প্রধান শিক্ষক বললেন, সেটা কেমন? সকল শিক্ষক মনযোগী হয়ে তার দিকে তাকান। সবাই জানে এবার একটা সমাধান বের হবেই হবে। কারণ মারুফা ম্যাম সবসময় গম্ভীর থাকেন। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না। যে কারো সংকট সমাধানে সবার ভরসা মারুফা ম্যাম। ছাত্রছাত্রীদেরও মাতৃস্নেহে পড়ান। তার কোন দুর্নাম নেই। তিনি সিনিয়র শিক্ষক। পেশাগতভাবে এই স্কুলে সকল শিক্ষকের সিনিয়র। তাই তার কথা সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য। ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় আপাস্যার।
তিনি স্কুলের পিয়ন রুস্তমকে ইশারা করলে কাছে আসে। রিতা মিতাকে ডেকে পাঠান। এদিকে সকল ক্লাসের রেজাল্ট রেডি হলেও ঘোষণা করতে সময় গড়াচ্ছে। ফল প্রত্যাশী ছাত্রছাত্রীদের ভিড় ক্রমশঃ বাড়ছে। রুস্তম রিতা মিতাকে নিয়ে হাজির। রিতা মিতা মারুফা ম্যামের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। সবার চোখ স্বভাবতই তাদের দিকে থাকলেও, মাঝে মাঝে চোখ বোলাচ্ছে রেজাল্ট শিটে। আর তাদের পরীক্ষার খাতাও প্রধান শিক্ষকের সামনে। তিনি চোখ বুলিয়ে দেখেন কী সুন্দর গোছানো পরিপাটি হাতের লেখা। তারা দুই বোন জমজ।
তাদের মূল নাম আরিফা নাওয়ার ও আরিফা নাওয়াল। জন্ম তারিখও একই। রেজাল্টে প্রাপ্ত মার্ক সমান। মারুফা ম্যাম একটা নিখুঁত হিসেব করে বের করলেন, নামের আদ্যক্ষরে ক্রমান্বয়ে কে আগে আর কে পরে। উচ্চতা ও ওজন। গায়ের রং। চুলের লম্বা। কে বেশি পরিপাটি। কার কন্ঠ কত সুন্দর। কার উচ্চারণ কত শুদ্ধ। এভাবে নিখুঁত হিসাবে মার্ক করতে লাগলেন। তাও কাউকে আগপিছ করতে হিমশিম অবস্থা। এদিকে প্রধান শিক্ষক অন্যান্য ক্লাসের রেজাল্ট প্রকাশ করতে বলে দিলেন। ক্লাস ফোরের রেজাল্ট শিটে এক এবং দুই ফাঁকা রেখে বাকিদের রেজাল্ট ঘোষণা করে দিলেন। যদিও সবাই রেজাল্ট শিট দেখে দুইটা ঘর খালি দেখে কিছুটা বিস্মিত হল ঠিকই, বুঝেও গেলো ওই নাম দুটো বরাবরের মতোই রিতা মিতার।
প্রধান শিক্ষক উঠে এসে মারুফা ম্যাম এর পাশে বসলেন। এই দৃশ্য দেখেও কেউ কেউ মুখ চেপে হাসছেন। প্রধান শিক্ষক কিংবা মারুফা ম্যামের সেদিকে মোটেই ভ্রুক্ষেপ নেই। পাশে বসে মারুফা ম্যাম তার মার্কিং করা শিটটি প্রধান শিক্ষকের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আর সিদ্ধান্ত নিলেন, উপস্থিত গল্প বলা প্রতিযোগিতা হবে দুই বোনের মধ্যে। অন্যান্য শিক্ষকদের বিতর্ক প্রতিযোগিতার মতো করে মার্ক দিতে বললেন মারুফা ম্যাম। এদিকে প্রধান শিক্ষক মারুফা ম্যামের মার্কিং করা শিটটি দিলেন মতিন স্যারের কাছে। মতিন স্যার যোগ করে পুনরায় প্রধান শিক্ষকের কাছে দিলেন।
মারুফা ম্যাম বিষয় নির্ধারণ করে দিলেন, বাঘের নাম হালুম।
রিতা মিতা একে একে গল্প বললো। শিক্ষকরাও আশ্চর্য হয়ে যায়, এতো সুন্দর উপস্থিত গল্প বলা শুনে। তারপরও তারা নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ। মার্ক দিয়ে তাদের স্থান নির্ধারণ করতেই হবে।
সবার দেয়া ফলাফল অবশেষে প্রধান শিক্ষকের হাতে। আগের করা মারুফা ম্যামের মার্কিং, গল্প বলার মার্কিং মিলিয়েও দুইজনের মার্ক সমান। তারপর সবার সম্মতিতে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে বলা হয়। শিক্ষকদের কেউ কাউকে না দেখিয়ে মার্কিং করেও যোগফল সমান।
প্রধান শিক্ষক উপায়ন্তর না পেয়ে আবার মারুফা ম্যামের দ্বারস্থ হন। মারুফা ম্যাম এবার দুইটা কাগজে দুইজনের নাম লিখে বলেন, তোমরাই সিদ্ধান্ত নাও কে টোকেন নিবে। আর এই টোকেন একজনই নিতে পারবে। যে নিবে সে অন্যজনকে হস্তান্তর করবে, সবশেষে যার হাতে থাকবে সে-ই খুলবে। ব্যস এটুকুতেই সমাধান। প্রধান শিক্ষক সকল শিক্ষকদের এই নিয়মে আপত্তি আছে কি না জিজ্ঞেস করতেই, সবাই বললেন না স্যার নেই। তখন মারুফা ম্যামের হাত থেকে রিতা নাম লেখা একটা টোকেন নিল। নিয়ে যথারীতি মিতার হাতেই দিল। মিতা খুলে দেখে তারই নাম। আর খুশি হয়ে যায়। এদিকে রিতাও এমন নিয়মে বেশ উৎফুল্ল হয়। তারা দুইজনই মারুফা ম্যামকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, ‘আপাস্যার।’ অমনি সবাই হো হো করে হাসতে থাকে। এই সমাপ্তি সবার কাছেই আনন্দের ঢেউয়ে ছুঁয়ে যায়।

-advertise-