ফিচার এলাটিং বেলাটিং

অবাধ্যতার শাস্তি

আব্দুস সালাম »

লাইবা আর কায়েস দুই ভাইবোন। লাইবা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে, আর কায়েস এখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। দুজনের মধ্যে খুব ভাব। বাবা প্রতিদিন অফিসে যান, আর মা সংসারের নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। কখনো কখনো প্রয়োজন হলে মা তাদের ঘরে রেখে কাছের বাজারে যান। যাওয়ার আগে তিনি সবসময় একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে করিয়ে দেন—
“আমি না থাকা পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই দরজা খুলবে না। অপরিচিত কাউকে বিশ্বাস করবে না।”
সেদিনও মা বাজারে যাওয়ার আগে একই কথা বললেন। লাইবা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,
“তুমি চিন্তা করো না মা। আমি কায়েসকে দেখব, আর দরজাও খুলব না।”
মা চলে গেলে দুই ভাইবোন খেলনায় মেতে উঠল। কিন্তু সেদিন বাজারে ভিড় বেশি থাকায় মায়ের ফিরতে একটু দেরি হচ্ছিল।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
খট… খট… খট…
কায়েস খুশি হয়ে বলল, “আপু! মনে হয় মা এসে গেছে!”
লাইবা দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কে?”
বাইরে থেকে দুর্বল কণ্ঠে উত্তর এল, “মা, আমি একজন বৃদ্ধ মানুষ। অনেকক্ষণ ধরে রোদে হাঁটছি। খুব পিপাসা পেয়েছে। একটু পানি খেতে দেবে?”
লাইবার মন নরম হয়ে গেল। সে ভাবল, একজন অসহায় মানুষকে পানি দেওয়া তো ভালো কাজ। কিন্তু তখনই তার মনে পড়ল মায়ের নিষেধের কথা।
কায়েস বলল, “আপু, মা তো দরজা খুলতে মানা করেছে।”
লাইবা কিছুক্ষণ দ্বিধায় রইল। কিন্তু করুণ কণ্ঠ শুনে তার মায়া হলো। সে ভাবল, “একটু পানি দিলেই তো হয়।”
এই ভেবেই সে দরজার ছিটকিনি খুলে দিল।
কিন্তু দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ভয়ংকর ঘটনা ঘটল।
বৃদ্ধ লোকটির পেছন থেকে দুজন চোর বেরিয়ে এলো। তারা জোর করে ঘরে ঢুকে পড়ল। একজন লাইবার মুখ চেপে ধরল, আরেকজন কায়েসকে ধরে ফেলল।
“চুপ! কোনো শব্দ করলে বিপদ হবে!”—চোরদের একজন গর্জে উঠল।
ভয়ে কায়েস কাঁদতে শুরু করল। চোরেরা দুই ভাইবোনকে বাথরুমে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দিল।
অন্ধকার বাথরুমে বসে কায়েস কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আপু, আমরা কি আর বাঁচব না?”
লাইবার চোখে পানি চলে এল। সে ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল, “না রে, কিছু হবে না। কিন্তু আমি খুব বড় ভুল করেছি। মায়ের কথা শোনা উচিত ছিল।”
এদিকে চোরেরা ঘরের আলমারি খুলে টাকা, গয়না আর মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর মা বাড়ি ফিরলেন। দরজা খোলা দেখে তাঁর বুক কেঁপে উঠল। ঘরে ঢুকে দেখলেন সবকিছু এলোমেলো।
তিনি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন, “লাইবা! কায়েস! তোরা কোথায়?”
অনেক খোঁজাখুঁজির পর বাথরুমের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। দ্রুত দরজা খুলে দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।
সব ঘটনা শুনে মায়ের চোখ ভিজে গেল।
তিনি বললেন, “তোরা কি জানিস, আজ কত বড় বিপদ হতে পারত? চোরেরা শুধু জিনিসপত্র নিয়েছে, কিন্তু তোদেরও ক্ষতি করতে পারত। পৃথিবীতে সবাই ভালো মানুষ নয়। তাই বড়দের উপদেশ সবসময় মেনে চলতে হয়।”
লাইবা মাথা নিচু করে বলল, “মা, আমি বুঝতে পেরেছি। শুধু ভালো কাজ করার ইচ্ছা থাকলেই হয় না, বুদ্ধি দিয়েও কাজ করতে হয়। তোমার কথা না শুনে আমি ভুল করেছি।”
কায়েসও বলল, “আমিও আর কখনো অপরিচিত কাউকে বিশ্বাস করব না।”
মা স্নেহভরে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
সেদিনের ঘটনার পর থেকে লাইবা ও কায়েস একটি বড় শিক্ষা পেল—দয়া করা ভালো, কিন্তু সতর্কতা আরও জরুরি। বড়দের অভিজ্ঞতা আমাদের নিরাপদ রাখে। তাই তাদের উপদেশ অমান্য করলে কখনো কখনো বড় বিপদ নেমে আসতে পারে।

-advertise-