আব্দুস সালাম »
এক গভীর সবুজ বনে এক হরিণী তার ছোট ছোট ছানাদের নিয়ে শান্তিতে বসবাস করত। চারদিকে গাছপালা, কাছে ঝরনার মতো নদী খাবার আর পানির কোনো অভাব ছিল না। ছানারা আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে খেলত, আর হরিণী তাদের দিকে তাকিয়ে মায়ায় ভরে উঠত।
কিন্তু একদিন বিকেলে হরিণীর চোখে অদ্ভুত এক ভয় দেখা দিল।
একটি ছানা মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “মা, তোমার মন খারাপ কেন?”
হরিণী গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, “আজ আমি আমাদের আস্তানার আশেপাশে একটা বাঘ দেখেছি। আমরা এখন আর নিরাপদ নই। যে কোনো সময় আমাদের ওপর বিপদ নেমে আসতে পারে।”
ছানারা একটু থমকে গেল। তবে একটি সাহসী ছানা বলল, “মা, আমরা তো অনেকজন! আমরা সবাই মিলে বাঘের সঙ্গে লড়াই করব না কেন?”
হরিণী মৃদু কণ্ঠে বলল, “বাবা, বাঘ মাংসাশী প্রাণী। ওর স্বভাবই হলো শিকার করা। ওর ধারালো নখ আর শক্ত দাঁত মুহূর্তের মধ্যে আমাদের শরীর ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে। আমাদের শক্তি আছে, কিন্তু ওর মতো যুদ্ধের জন্য নয়। বেঁচে থাকার জন্য।”
আরেকটি ছানা একটু জেদ করে বলল, “না মা, আমি এই জায়গা ছাড়ব না। এই জায়গা আমার খুব প্রিয়। এখানে খাবার আছে, নদী আছে। আমি কোথাও যাব না।”
হরিণীর চোখে পানি চলে এল। সে ধীরে ধীরে বলল, “শোনো, শুধু ভালো জায়গা থাকলেই হয় না, নিরাপদ জায়গাও হতে হয়। যদি প্রাণে না বাঁচো, তাহলে এই সুন্দর জায়গা দিয়ে কী হবে?”
সে একটু থেমে আবার বলল, “তোমরা কি কয়েক দিন আগে দেখোনি, এক মহিষের কী করুণ মৃত্যু হয়েছিল? মহিষ আমাদের চেয়েও অনেক শক্তিশালী। তার মাথায় বড় বড় শিং ছিল, তবুও বাঘের হাত থেকে সে রক্ষা পায়নি।”
একটি ছানা কাঁপা কণ্ঠে বলল, “মা, তাহলে কি শক্তিশালী হলেও সবাই বাঁচতে পারে না?”
হরিণী উত্তর দিল, “না বাবা। মহিষ শক্তিশালী, সে লড়াই করতে পারে। কিন্তু বাঘ ধূর্ত, চতুর আর হিংস্র। সে সুযোগ বুঝে আক্রমণ করে। তাই শুধু শক্তি নয় বুদ্ধি আর সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়াই আসল সাহস।”
এবার সব ছানারা চুপ হয়ে গেল। তারপর তারা একসঙ্গে বলল, “মা, তুমি যেভাবে বলবে আমরা সেভাবেই করব। আগে আমাদের বাঁচতে হবে। পরে বড় হয়ে শক্তি সঞ্চয় করব, তখন নিজেদের রক্ষা করতে পারব।”
হরিণী স্নেহভরে তাদের মাথায় চুমু খেয়ে বলল, “এই তো আমার সাহসী সন্তানরা! সত্যিকারের সাহস মানে অকারণে লড়াই করা নয়, নিজের জীবন বাঁচানো। জীবনে শুধু শক্তি নয়, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং বুদ্ধিমত্তাই আমাদের রক্ষা করে। আর সত্যিকারের সাহস হলো বিপদ বুঝে সরে আসা।”
সেই রাতেই চাঁদের ম্লান আলোয় হরিণী ও তার ছানারা নিঃশব্দে বন ছেড়ে রওনা হলো। পেছনে ফেলে এলো তাদের প্রিয় জায়গা, পরিচিত পথ, আর নদীর কলকল শব্দ। ছানাদের চোখে জল ছিল, কিন্তু তারা মায়ের পাশে থেকেও শক্ত হয়ে হাঁটছিল।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা বনের অন্য প্রান্তে একটি নিরাপদ জায়গা খুঁজে পেল। সেখানে নতুন করে তারা জীবন শুরু করল।
হরিণী আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “প্রিয় জায়গা ছেড়ে আসা কষ্টের, কিন্তু সন্তানের জীবন বাঁচানোই সবচেয়ে বড় জয়।”





















































