এ মুহূর্তের সংবাদ

সামর্থ অনুযায়ী বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ান

টানা কয়েকদিনের রেকর্ড ভাঙা বর্ষণে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রায় প্রতিটি জেলাই এখন জলমগ্ন। বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামসহ আশেপাশের উপজেলাগুলোর জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। চারদিকে থৈ থৈ করছে পানি; গ্রামীণ জনপদের ফসলি জমি, সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, এমনকি শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলোও এখন পানির নিচে। এই অভূতপূর্ব দুর্যোগে একদিকে যেমন লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবিক সংকটে পড়েছে, অন্যদিকে স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ জীবনযাত্রা। বিশেষ করে, এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি মাড়িয়ে, কিংবা উত্তাল জলস্রোত পাড়ি দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া এবং পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় কোনো আনুষ্ঠানিকতার দিকে না তাকিয়ে, সর্বোচ্চ মানবিকতা নিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় জাতীয় দায়িত্ব।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব যে আমাদের কত বড় বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে, চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি তারই এক নির্মম প্রমাণ। ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে, যা আগামী দিনে এই অঞ্চলের খাদ্য সুরক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর চেয়েও বড় সংকট এখন জনস্বাস্থ্যের। বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শুকনা খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানি বাড়ার সাথে সাথে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে একটি জাতির মেরুদণ্ড, সেখানে দুর্যোগের কারণে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে যাওয়া বা নিয়মিত ক্লাসে অংশ নেওয়া দুরূহ হয়ে পড়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেক স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বর্তমান বাস্তবতায় জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত এবং জোরালো উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। প্রশাসনকে অবিলম্বে উপদ্রুত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়কে প্রতিটি উপজেলায় জরুরি মেডিকেল টিম এবং নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি, দুর্যোগের তীব্রতা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও চলমান পরীক্ষাগুলোর বিষয়ে দ্রুত এবং সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তবে কেবল সরকারি উদ্যোগের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে এই বিশাল ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। দেশের যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে এ দেশের বেসরকারি খাত, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সাধারণ তরুণ সমাজ সবসময় অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়া চলবে না। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে দুর্গত এলাকার মানুষের জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে সাধ্যানুযায়ী শুকনো খাবার, পোশাক ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের পানিবন্দি মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার এখনই সময়।
চট্টগ্রামের এই বন্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের তৈরি বিপত্তি আর প্রকৃতির রুদ্ররূপ মিলেমিশে কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে দোষারোপের রাজনীতি বা গাফিলতির হিসাব খোঁজার চেয়েও বড় কাজ হলো মানুষের প্রাণ বাঁচানো এবং তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সামর্থ্য অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি স্তর থেকে যদি আমরা দুর্গত মানুষের পাশে এসে দাঁড়াই, তবে এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়। আসুন, যে যার অবস্থান থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের বানভাসি ও বিপন্ন মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসি এবং মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করি।

-advertise-