ফিচার এলাটিং বেলাটিং

ছড়াকার : নাম ও পরিচয়ের শিল্পিত লড়াই

​আব্দুল কাদের »

​বাংলা ভাষায় কার প্রত্যয়টি কেবল শব্দ গঠনের একটি অংশ নয়, এটি সৃজনশীলতার এক একটি পদক। ছড়াকার, গল্পকার, গীতিকার কিংবা স্বর্ণকার এই শব্দগুলো কেবল পেশাগত পরিচয় বহন করে না, বরং ওই ব্যক্তির দক্ষতা, শিল্পবোধ ও নিবেদনের আখ্যান বলে। ছড়াকার শব্দটি কোনো নিছক তকমা নয়, বরং এটি একজন লেখকের দীর্ঘ সাধনার স্বীকৃতি। যখন কোনো লেখক ছড়ার শৈল্পিক কারিগরি, ছন্দ ও ব্যঞ্জনার সূক্ষ্মতা রপ্ত করে পাঠকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন, তখনই তিনি ছড়াকার হিসেবে উন্নীত হন।

-advertise-

​শিল্পের বিবর্তন ও ছড়াসাহিত্যের অভিধা

সাহিত্যের ইতিহাসে প্রতিটি মাধ্যমেরই নিজস্ব পরিভাষা ও অভিধা থাকে। যেমন যিনি উপন্যাস লেখেন তিনি ঔপন্যাসিক, আবার যিনি প্রবন্ধ লেখেন তিনি প্রাবন্ধিক। এই নামগুলো কেবল পরিচয় দেয় না, বরং ওই শিল্পের প্রতি সমাজের শ্রদ্ধাবোধকেও সংজ্ঞায়িত করে। আধুনিক বাংলা ছড়াসাহিত্যের যাত্রাপথে সুকুমার রায়ের কালজয়ী সৃষ্টি থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের অগ্রগণ্য ছড়াকাররা যে শৈল্পিক কাঠামো তৈরি করেছেন, তা ছড়াকে কেবল মিল সর্বস্ব পদ্য থেকে মুক্ত করেছে। ছড়া এখন জীবনবোধের দর্পণ, ব্যঙ্গ বিদ্রূপের তীক্ষ্ণ হাতিয়ার এবং নান্দনিকতার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। এই বিবর্তনের প্রেক্ষিতে ছড়াকার বা ছড়াশিল্পীকে কেবল ছড়ালেখক বলে ডাকা মানে ছড়ার ঐতিহাসিক গুরুত্বকেই খাটো করা।

​শিল্পতত্ত্বের দৃষ্টিতে কারিগর ও শিল্পী

শিল্পতত্ত্বের নিরিখে কারিগর এবং শিল্পীর মধ্যে এক সূক্ষ্ম রেখা বিদ্যমান। একজন কারিগর কেবল নিয়ম মেনে কাঠামো নির্মাণ করেন, আর একজন শিল্পী সেই কাঠামোর ভেতর প্রাণের স্পন্দন ও দর্শন যোগ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা নজরুল ইসলাম বহুমুখী সাহিত্যিক হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের মূল পরিচয় অটুট ছিল কবি হিসেবে, কারণ তাঁদের সৃষ্টির প্রতিটি কোণায় সাহিত্যের মূল নির্যাস ও দর্শন বিদ্যমান। একইভাবে একজন ছড়াকার যখন তার মেধা দিয়ে ছড়াকে কেবল ছন্দের মিল নয়, বরং জীবনবোধ ও সামাজিক উপলব্ধির ধারক করে তোলেন, তখন তিনি ছড়াশিল্পীর মর্যাদায় উন্নীত হন। অথচ যারা -কার শব্দে একধরনের এলার্জি অনুভব করে নাট্যকারকে নাট্যলেখক বা ছড়াকারকে ছড়ালেখক বানাতে চান, তারা মূলত নান্দনিক দারিদ্র্যের পরিচয় দেন। ছড়াকার শব্দে যে আভিজাত্য ও গুরুগাম্ভীর্য আছে, ছড়ালেখক শব্দে তা নেই। এটি নিতান্তই যান্ত্রিক।

​উত্তরণের সিঁড়ি: মিলকার বনাম ছড়াশিল্পী

সাহিত্য কোনো স্থির বিষয় নয়, বরং এটি গতিশীল এক ধারা। ছড়ার আধুনিক প্রকরণ, লয় ও ব্যঞ্জনা সম্পর্কে ধারণা না রেখে কেবল গৎবাঁধা মিল দিয়ে শত শত পদ্য লেখা আর শিল্পের উৎকর্ষ সাধন করা এক নয়। সাহিত্যের ইতিহাসে দেখা যায় স্বর্ণকার আর স্বর্ণ ব্যবসায়ীর পার্থক্যের মতোই, একজন শিল্পীর শ্রম এবং একজন পদ্য লেখকের রচনার ব্যবধানটি বিশাল। বাংলা ছড়াসাহিত্যকে যারা নানা মাত্রায় সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের সেই সৃজনশীলতাকে নিছক ছড়ালেখক শব্দের আড়ালে ম্লান করে দেওয়া কেবল অনুচিত নয়, বরং এটি বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যের প্রতি অবিচার। এই উত্তরণটি লেখকের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল, যা লঘু করার অবকাশ নেই।

​পরিচয়ের রাজনীতি ও সৃজনশীলতার সংকট

যারা ছড়াকারদের পরিচয়কে খর্ব করতে চান, তাদের মনোস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা সম্ভবত নিজেদের সৃষ্টি নিয়ে একধরনের আস্থাহীনতায় ভুগছেন। তারা নিজেরা হয়তো ছড়াকারের যে উচ্চমান, তা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে অন্যদেরও সেই পরিচয়ে দেখতে দ্বিধাবোধ করেন। এই সংকীর্ণতা কেবল ব্যক্তি লেখকের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটি ছড়াসাহিত্যকে তাচ্ছিল্য করার একটি অপকৌশল। পরিচয় সংকট তৈরির এই অনুঘটকরা ভুলে যান যে, ভাষার সৌন্দর্য ও যথার্থ অভিধা বজায় রাখাই একজন লেখকের প্রথম দায়বদ্ধতা।

উপসংহার

সাহিত্যের নির্মেঘ আকাশে ছড়াসাহিত্য একটি স্বতন্ত্র আলোকবর্তিকা। ছন্দ বা মিল মেলালেই সব কিছু ছড়া হয়ে যায় না। ছড়া হতে হয় তীক্ষ্ণ, শাণিত ও শিল্পিত। ছড়াসাহিত্যের এই তথাকথিত পরিচয় সংকট সাময়িক। যারা শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ, যারা মেধা ও শ্রম দিয়ে ছড়াকে আধুনিক করে তুলেছেন, কালের বিচারে তারাই টিকে থাকবেন। সকল অপপ্রয়াস ও বিদ্বেষকে পাশ কাটিয়ে প্রকৃত ছড়াকার ও ছড়াশিল্পীরাই শেষ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন। ছড়াকারের এই লড়াই কেবল নামের লড়াই নয়, এটি শিল্পের মর্যাদা রক্ষার এক শিল্পিত লড়াই।