ফিচার এলাটিং বেলাটিং

সৃজনশীলতাকে ফিরে পাওয়ার উপায়

শিশুর মতো ভাবো, নির্ভয়ে সৃষ্টি করো

রিয়াজ মোরশেদ সায়েম »

একটা ছোট শিশুকে রঙিন পেন্সিল আর একটা সাদা কাগজ দিলে সে কখনো জিজ্ঞেস করে না, ‘এটা দিয়ে কী আঁকবো আমি? আঁকার পর এটা যথাযথ আর্ট হবে তো?’ সে জিজ্ঞেস করে না, ‘মানুষ কী বলবে?’ সে শুধু আঁকে। কাগজের বাইরেও রঙ চলে যায়, রেখা বাঁকা হয়, তবু তার আনন্দে কোনো ঘাটতি পড়ে না। কিন্তু বড় হতে হতে আমরা প্রায় সবাই এই সহজাত সাহসটা হারিয়ে ফেলি। লেখক অস্টিন ক্লিয়নের বইটি এই হারিয়ে যাওয়া সৃজনশীলতাকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার আহ্বান জানায়। শিশুদের মতো নির্ভার, নির্ভয় আর কৌতূহলী মন নিয়ে সৃষ্টির জগতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান। বইটিতে এমন দশটি পথের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো অনুসরণ করলে যে কেউ নিজের ভেতরের শিল্পীসত্তাকে আবার জাগিয়ে তুলতে পারে। শিক্ষার্থীদের জীবনে এই ভাবনাগুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ পরীক্ষার নম্বর আর প্রতিযোগিতার চাপে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়ই শিক্ষার্থীদের সেই সহজাত কল্পনাশক্তিকে চুপ করিয়ে দেয়।
কেন আমরা বড় হয়ে সৃজনশীলতা হারাই
ছোটবেলায় আমরা আঁকি, গান গাই, গল্প বানাই; এতে কারো অনুমতির অপেক্ষা করা লাগে না। কিন্তু স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে শেখানো হয়, প্রতিটি কাজের একটা ‘সঠিক’ উত্তর থাকতে হবে, একটা মূল্যায়ন থাকতে হবে। এভাবেই ভুল করার ভয়, তুলনা করার অভ্যাস আর নিখুঁত হওয়ার তাড়না আমাদের ভেতরের শিল্পীসত্তাকে নিঃশব্দে চুপ করিয়ে দেয়। অথচ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় বড় আবিষ্কার আর সৃষ্টিকর্মের পেছনে লুকিয়ে আছে- সেই শৈশবসুলভ প্রশ্ন করার সাহস আর খেলাচ্ছলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রবণতা।
দশটি পথ: সৃজনশীলতা ফিরে পাওয়ার সহজ কৌশল
বইয়ের কাঠামো অনুসরণ করে, নিচে অস্টিন ক্লেওনের সে-ই দশটি মূল ভাবনাকে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো, যা আমাদের সবার জন্য জরুরি।
১. নিয়মকানুন ছুঁড়ে ফেলো। প্রতিটি কাজের একটা নির্দিষ্ট নিয়ম বা ছক থাকতে হবে, এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। কোনো কিছু ‘সঠিক নিয়মে’ শেখার আগে নিজে হাতে-কলমে চেষ্টা করে দেখাটাই আসল শেখা। শিক্ষার্থীরা যখন বাঁধাধরা পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে সমস্যার সমাধান খোঁজে, তখনই তাদের ভেতর থেকে আসল প্রতিভা বেরিয়ে আসে।
২. সবকিছুকে এত সিরিয়াসলি নিও না। রসিকতা করো, প্রশ্ন করো, এমনকি নির্বোধের মতো আচরণ করতেও দ্বিধা কোরো না। যে কাজে হালকা মন নিয়ে এগোনো যায়, সে কাজে ভয় কম থাকে আর নতুন কিছু আবিষ্কারের সম্ভাবনা বেশি থাকে।
৩. নিজেকে সময়, সুযোগ আর রসদ দাও। সৃজনশীলতার জন্য একটা নিরাপদ জায়গা আর হাতের কাছে কিছু সরঞ্জাম থাকা দরকার। হোক তা একটা খাতা, রং-পেন্সিল বা নিছক অবসর সময়। ব্যস্ত রুটিনের মধ্যেও নিজের জন্য এই ছোট্ট জায়গাটুকু তৈরি করে নেওয়া জরুরি।
৪. ভুল করার স্বাধীনতা! প্রথমবারেই ভালো কিছু হবে, এই প্রত্যাশা বাদ দাও। ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু করো যা ‘নিয়মমাফিক’ নয়। অসম্পূর্ণ জিনিসের বড় স্তূপ তৈরি করতে দ্বিধা কোরো না, কারণ সেই স্তূপ থেকেই একদিন ভালো কিছু বেরিয়ে আসবে।
৫. জাদুতে বিশ্বাস রাখো। নিজস্ব ছোট ছোট রীতি বা অভ্যাস তৈরি করো, যা তোমাকে সৃষ্টির মুহূর্তে নিয়ে যায়। এটা যুক্তির চেয়ে বেশি অনুভবের ব্যাপার। উদাহরণস্বরুপ, নিজের চারপাশে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কল্পনাশক্তি সহজে জেগে ওঠে।
৬. ভাবনার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসো। শুধু চিন্তা দিয়ে নয়, শরীর আর অনুভূতি দিয়েও ভাবা শেখো। হাঁটতে হাঁটতে, শরীরের ভাষা শুনে বা মনের গভীরের অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে অনেক সময় সবচেয়ে ভালো ভাবনাগুলো উঠে আসে। যা শুধু ডেস্কে বসে থাকলে আসে না।
৭. মাথায় যেমন ইনপুট দিবে, আউটপুটও তেমন আসবে। নতুন কিছু তৈরি করতে না পারার প্রধান কারণ প্রায়ই এই যে, আমরা যথেষ্ট পড়ছি না, দেখছি না বা শিখছি না। নিজের ভালো লাগাকে চিনতে শেখো, অন্যের কাজ থেকে শিখতে দ্বিধা কোরো না। কারণ অনুকরণ থেকেই শেখার শুরু হয়। লাইব্রেরিতে যাওয়া, বই পড়া, নতুন বিষয় নিয়ে ডুবে থাকা; এসবই ভবিষ্যতের সৃষ্টির বীজ বপন করে।
৮. কোনো বাচ্চার সাহায্য নাও। একটা চার বছরের শিশুর সঙ্গে সময় কাটালে দেখবে, সে কীভাবে সহজ চোখে জগৎটাকে দেখছে। শিশুদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থেকে শেখো, লাইব্রেরির শিশু বিভাগে ঘুরে দেখো, বইমেলায় শিশু কর্ণারে যাও, নিজের ভেতরের কৌতূহলী শিশুটাকে জাগিয়ে রাখো।
৯. কোনো কিছু বৃথা যায় না। একঘেয়েমি বা অলস সময়কে ভয় পেয়ো না, এটা আসলে সৃজনশীলতার একটা বিরতি-স্থান মাত্র। কোনো কাজ মাঝপথে ছেড়ে দেওয়াও দোষের কিছু নয়; প্রতিটি অভিজ্ঞতাই এমনকি ব্যর্থ প্রচেষ্টাও, পরবর্তী সৃষ্টির জন্য কাজে লাগে।
১০. আগে থেকে কোনো বিশাল পরিকল্পনার দরকার নেই। ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে, হাতের কাছে যা আছে তা নিয়েই কাজ শুরু করো। বড় স্বপ্ন বা নিখুঁত পরিকল্পনার অপেক্ষায় না থেকে, আজকের মুহূর্তে যা সম্ভব, তা দিয়েই এগিয়ে যাওয়াই আসল কথা।
অভিভাবকদের প্রতি বার্তা
এই ভাবনাগুলো শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুর আঁকা ছবিকে যখন আমরা ‘ভুল’ বলে সংশোধন করে দিই, তখন আমরা না জেনেই তার আত্মবিশ্বাসে আঘাত করি। প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা-পরিবেশ করো, যেখানে প্রশ্ন করা, পরীক্ষা করা আর ব্যর্থ হওয়াকে স্বাগত জানানো হয়। নম্বরের চেয়েও বড় করে দেখা হয় আনন্দ আর আবিষ্কারের প্রক্রিয়াকে। ক্লাসরুমে যদি শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়, তাদের ভুলকে শাস্তি না দিয়ে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তারা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী আর সৃজনশীল হয়ে উঠবে।
শেষ কথা
সৃজনশীলতা কোনো বিশেষ প্রতিভা নয়। এটি প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার, যা আমরা বড় হতে হতে ভুলে যাই। শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকুক, নিজের ভেতরের সেই শিশুসুলভ কৌতূহল আর সাহসকে ফিরিয়ে আনো। ভুল করতে ভয় পেয়ো না, তুলনা কোরো না, প্রশ্ন করতে থাকো, আর সবচেয়ে বড় কথা- আনন্দের জন্য সৃষ্টি করো। কারণ যেদিন সৃষ্টির আনন্দটাই মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে, সেদিনই প্রকৃত শিক্ষা আর প্রকৃত শিল্প জন্ম নেয়।

-advertise-

(অস্টিন ক্লিয়নের গ্রন্থ “উড়হ’ঃ ঈধষষ ওঃ অৎঃ: ১০ ডধুং ঃড় ঈৎবধঃব খরশব ধ করফ অমধরহ”-এর মূলভাব থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রচিত একটি মৌলিক নিবন্ধ)
ডোন্ট কল ইট আর্ট বইটি আন্তজার্তিকভাবে প্রকাশিত হয় জুনের ২ তারিখ। বইটি অনুবাদ করেছেন রিয়াজ মোরশেদ সায়েম।