ফিচার এলাটিং বেলাটিং

মুনতাহার বৃষ্টি মুখর দিন

সাগর আহমেদ »

আষাঢ় মাস চলে গেছে। এখন শ্রাবণ মাসের শুরু। খুকুমণি মুনতাহা তাদের গাজীপুরের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে অঝোর ধারার বৃষ্টিতে কদম ফুলের বৃষ্টি স্নান দেখছে। আহা, কী অপূর্ব এক অনিন্দ্য দৃশ্য! মুনতাহার মন খুব খারাপ। আজ সে স্কুলে যেতে পারেনি। এতো বৃষ্টির মধ্যে ভ্যান মামা ওকে স্কুলে নিতে আসেনি। আসবেই বা কীভাবে? চারিদিকে রাস্তাঘাট জলে ডুবে একাকার। সে সকালে মুনতাহার মাকে মোবাইলে ফোন করে তার আসতে না পারার কথা জানিয়ে রেখেছে। কিন্তু বৃষ্টি পড়ার দৃশ্য ও বৃষ্টি মুখর দিনের আবহাওয়ার স্নিগ্ধতায় মুনতাহার মন আপনাআপনি ভালো হয়ে গেলো।
মুনতাহার বাবা রফিক সাহেব একজন করিৎকর্মা অফিসার। একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উঁচু পদে চাকরি করেন। সারাদিন তিনি কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকেন। অনেক সময় বন্ধের দিনেও তার মিটিং থাকে। সেই তিনিও আজ প্রবল বৃষ্টিতে অফিসে যেতে পারেননি। ঘরে বসে তিনি মুনতাহার আম্মু আর মুনতাহার বড় বোন মিমের সাথে গত মাসে তার অস্ট্রেলিয়ায় অফিসিয়াল ট্যুরের গল্প করছেন। একটু পরেই পাশের ফ্ল্যাটের টুনি এলো তার পুতুলে বাক্স নিয়ে। টুনি মুনতাহাকে বলল, চলো আজ তোমার বর পুতুলের সাথে আমার কনে পুতুলের বিয়ের খেলা খেলি। মুনতাহা খুশি হয়ে বলল, হ্যাঁ তাই চলো। তখন মুনতাহা তার পুতুলের বাক্স নিয়ে আর তার আদরের বিড়াল টুকিকে নিয়ে টুনির সাথে খেলতে ড্রয়িংরুমে চলে এলো। তারপর তারা বর পুতুল মিঠুর সাথে কনে পুতুল মন্টির ধুমধাম করে বিয়ে দিয়ে দিলো। কনে পুতুলের উকিল বাপ সাজলো মুনতাহার বিড়াল টুকি। আম্মু ওদের পুতুল বিয়ের ভোজ উৎসবের জন্য কয়েক প্রকার মিষ্টি ও ছানা সন্দেশ পাঠিয়ে দিলেন। মুনতাহা তখন তার বড় বোন মিমকেও বিয়ের ভোজে আমন্ত্রণ জানালো। মিম এসে বলল, ইস, তোরা তো দারুণ আয়োজন করেছিস। মুনতাহা তখন বড় বোনকে সন্দেশ আর মিষ্টি খেতে দিয়ে, নিজেরাও আনন্দ নিয়ে বিয়ের খানা খেতে লেগে গেলো।
খেলা শেষে কিছুক্ষণ পরে টুনির মা এসে টুনিকে নিয়ে গেলো। মুনতাহাদের বিড়াল টুকি সন্দেশ খেয়ে অলস ভঙ্গিতে জিভ চাটছিলো। কিছুক্ষণ পরেই সে সিঁড়ির ভাঁজে গা এলিয়ে শুয়ে গভীর ভাবে ঘুমিয়ে পড়লো। মুনতাহার আম্মু এই অঝোর বৃষ্টির দিনে একটা বড়সড় ইলিশ মাছ চাক চাক করে কেটে ভাজছিলেন। ইলিশের মন কাড়া সুঘ্রাণ মুনতাহার নাকে এসে লাগলো। মুনতাহা দৌড়ে রান্নাঘরে মায়ের কাছে গেলো। সে বলল, ওয়াও! মা তুমি ইলিশ মাছ ভাজছো! মা বললেন, শুধু ইলিশ নয় রে, আজ বৃষ্টির দিনে ইলিশ খিচুড়ি হবে। এমন সময় মীম কোত্থেকে এসে দিলশান বেগমকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, আম্মু , তুমি কত ভালো! হঠাৎ করে বিকট শব্দে বাজ পড়ল। মুনতাহা আঁতকে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিলো। বৃষ্টি কিছুটা ঝড়ের রূপ নিয়েছে। মুনতাহার আম্মু দিলশান বেগম রান্না শেষ হলে সবাইকে খেতে ডাকলেন। ইলিশ মাছ দিয়ে আচার সমেত খিচুড়ি খাওয়া চলতে লাগলো। ইতোমধ্যে ইলিশের গন্ধ পেয়ে ওদের পোষা বিড়াল টুকিও টেবিলের নিচে এসে হাজির হয়েছে। ওরা সবাই ইলিশ মাছের টুকরা ভেঙ্গে টুকিকে দিলেও, টুকি আরো মাছের জন্য টেবিলে লাফিয়ে উঠার চেষ্টা করছে। রফিক সাহেব লাঠির ভয় দেখিয়ে টুকিকে টেবিল থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছেন। খেয়ে দেয়ে ওরা যার যার রূমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। বৃষ্টির দিনের ঘুম বড় আরাম ও স্বস্তির বটে। মুনতাহা যখন ঘুম থেকে উঠলো, তখন শেষ বিকেল। সে গুটিগুটি পায়ে আবার বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। তখন একটানা বৃষ্টিটা থেমে এসেছে। মুনতাহা দেখলো আকাশে সাত রঙা এক অপূর্ব রংধনু উঠেছে। তার মৃদু আলোতে কদম ফুলগুলো কিছুটা চকমক করছে। এ এক অদ্ভুত, মোহময় ও ভালো লাগার দৃশ্য। মুনতাহা বারান্দার রেলিং ধরে কদম ফুল গুলোর দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।

-advertise-