নিজস্ব প্রতিবেদক »
জাহাজ বণ্টন সংক্রান্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) নির্দেশনা অমান্য করার অভিযোগে চারটি শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের লাইসেন্স ও তালিকাভুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) স্বাক্ষরিত পৃথক দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো মেসার্স বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল শিপিং কর্পোরেশন, মেসার্স ইউনিয়ন ট্রেডার্স, মেসার্স প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এবং মেসার্স সি কোস্ট শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেড।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট নথি ও বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান চারটিকে জাহাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নির্দেশনা ও বিধিবিধান অনুসরণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লাইসেন্স স্থগিত হওয়া প্রতিষ্ঠান চারটি বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালন করেনি বলে কর্তৃপক্ষের নথিতে উল্লেখ করা হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের নির্দেশনা অমান্য করা ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নীতিমালা-২০১৫’-এর অনুচ্ছেদ-গ-এর ৭.৪ ধারার সুস্পষ্ট ব্যত্যয়।
এ ঘটনায় নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভায়। বোর্ডের সিদ্ধান্ত (নং-২০১৬৬, তারিখ ২৭ জুলাই ২০২৬) অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে গত ৭ সেপ্টেম্বর চার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও তালিকাভুক্তি সাময়িক স্থগিতের আদেশ জারি করা হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তের অনুলিপি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, জাহাজ বণ্টন ও শিপ হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নীতিমালা ও নির্দেশনা প্রতিপালন না করার ঘটনায় এমন প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এ সিদ্ধান্তকে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল শৃঙ্খলা ও নির্ধারিত বিধিবিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন বলেই মনে করেছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
জাহাজ বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ
চট্টগ্রাম বন্দরে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের মধ্যে জাহাজ বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এরই মধ্যে সংগঠনটির বৈধতা ও জাহাজ বরাদ্দের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী ‘বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটর্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’কে ২৮ এপ্রিল ২০১০ তারিখে ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে নিবন্ধন দেওয়া হয়। সংগঠনটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ২৫৪৬।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালে ‘বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন’ ওই নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে রিট আবেদন করে। তবে শ্রম অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বিভাগ ১৩ জুন ২০১৬ তারিখের এক সিদ্ধান্তে ‘বার্থ অপারেটরস অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, রেজি. নং-২৫৪৬’-কে আইনসম্মত ঘোষণা করে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এরপর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের জাহাজ বরাদ্দ ও সংগঠন পরিচালনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ আরও জটিল হয়। অভিযোগ রয়েছে, আইনগত এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও একটি সংগঠন চট্টগ্রাম বন্দরে কার্যক্রম এবং শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর কমিটি পরিচালনা করে আসছে।
এ নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একাধিকবার কৈফিয়ত তলব ও সতর্ক করা হলেও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের পক্ষ থেকে সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বোর্ড সভার সিদ্ধান্তে ব্যবস্থা
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজ বরাদ্দের ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও প্রচলিত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভায় ওঠে।
২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রক হিসেবে থাকা চারটি প্রতিষ্ঠানের শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর লাইসেন্সের তালিকাভুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তকে দীর্ঘদিনের জাহাজ বরাদ্দ-সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
‘দেরিতে হলেও সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স ডিভি হাজী আবদুল আজিজ অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মান্নান রানা বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও একটি চক্র তার প্রতিষ্ঠানকে জাহাজ বরাদ্দ দেয়নি।
তিনি বলেন, “বন্দর এবং সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও আমার প্রতিষ্ঠানকে জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। আমি আশা করছি, বন্দর কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জাহাজ বরাদ্দসহ ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।”
নিজের প্রতিষ্ঠানকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ১৯৫৭ সালের দিকে করা তালিকায় ২ নম্বর তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে আবদুল মান্নান রানা বলেন, “দেরিতে হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই।”
তবে চার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।




















































