টপ নিউজ

চট্টগ্রাম মহাপথের যোগসূত্র

মহাপথের যোগসূত্র

রুশো মাহমুদ »

কানেক্টিভিটি বা সংযোগ উন্নয়নের অন্যতম মূল চাবিকাঠি। কানেক্টিভিটি যত বিস্তৃত হবে, টেকসই উন্নয়নের সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

---------

একটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নির্ভর করে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে তার কানেক্টিভিটির ওপর। গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন বা বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন হলো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। যে নেটওয়ার্ক বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশের মধ্যে কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন, গুদামজাতকরণ এবং পণ্য বা সেবা চূড়ান্ত গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ পরিচালনা করে।

১৯৯০-এর দশকে ‘কুনমিং ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের ধারণাটি সামনে আসে। এরপর এই চারটি দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে সম্মতি দিয়েও পরে ভারতের আপত্তির কারণে সেই উদ্যোগ স্থবির হয়ে যায়।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই-এর অংশ হিসাবে বৈশ্বিক সংযোগের উদ্যোগ ছিল বিসিআইএম বা বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মায়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর। মূল পরিকল্পনায় রুটটি ছিল কলকাতা থেকে শুরু হয়ে ঢাকা, মান্দালে হয়ে কুনমিং শহর পর্যন্ত। সেই পরিকল্পনার মূল রুটে চট্টগ্রামকে রাখা হয়নি, রাখা হয়ে ছিল সিলেটের তামাবিল। দেখানো হয়েছিলো ঢাকা-চট্টগ্রামের বিদ্যমান রোডটিকে একটি শাখা রুট বা সেকেন্ডোরি রুট হিসেবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হবে এই করিডোর। সেটি যাবে মিয়ানমারের মান্দালয়ে। সেখান থেকে করিডোরের একটি অংশ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন এবং অন্য অংশ বিস্তৃত হবে রাখাইন রাজ্যের চকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত। মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সংযোগটি সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হবে।

এই করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আসবে। চট্টগ্রাম বন্দর, বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে সক্ষম।

এই করিডোর কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক প্রকল্প হিসাবে না দেখে একটু বিস্তৃত পরিসরে ভাবা যায়। যদি এই করিডোরে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা যায় তবে সেটি হয়ে উঠতে পারে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রুট।  এটি মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর সংযোগ ব্যবস্থার একটি সম্ভাব্য অংশ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে ভারত নেতৃত্বাধীন বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল) এবং বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় অবস্থিত সাতটি দেশ (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড) নিয়ে গঠিত বিমসটেক। চীনের প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় করিডোর ভবিষ্যতে বিবিআইএন বা বিমসটেকের অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বিত হলে সমগ্র অঞ্চলের বাণিজ্যচিত্র বদলে যাবে।

এই করিডোর ভবিষ্যতে আমাদের থাইল্যান্ডের সঙ্গেও যুক্ত করবে। এর ফলে আসিয়ান এবং আরসেপ ভুক্ত বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ ও বাণিজ্যিক সুযোগ আরো সম্প্রসারিত হতে পারে।

আরসেপকে চীনের নেতৃত্বাধীন বাণিজ্যিক ব্লক বলা হলেও – যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়াও এই ব্লকের সদস্য। এছাড়া ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম এরমধ্যেই আরসেপ- এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হলেও তার অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়।

করিডোরের প্রকৃত সুফল তখনই মিলবে, যখন বাংলাদেশ শুধু ট্রানজিট দেশ হয়ে থাকবে না। এর সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানিমুখী শিল্প, কোল্ড চেইন, লজিস্টিকস পার্ক এবং মূল্যসংযোজনভিত্তিক বা ভ্যালু এডেড উৎপাদন গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় আমরা কেবল পণ্য চলাচলের পথ হয়ে থাকব। সেই পণ্যের মূল্যসংযোজনের বড় অংশ থেকে যাবে অন্য দেশেই।

এখন আর শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ বা বিপুল জনসংখ্যা উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি নয়। যারা ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পেরেছে, তারাই এগিয়ে গেছে।

ভূরাজনীতির হিসাব-নিকাশ মেলানো বা ভারসাম্য রাখাটাই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ। আমাদের নিকট প্রতিবেশী, দূর নিকট প্রতিবেশী সব বিষয় মাথায় নিয়েই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে আবেগ নয়, মানতে হবে ভূগোলের বাধ্যবাধকতাও।

করিডোর বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ। রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবর্তে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে করিডোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন হবে।

কানেক্টিভিটিতেই ভবিষ্যত অর্থনীতির গতিপথ। ভৌগোলিক সান্নিধ্য আর সংযোগের যোগসূত্র হতে পারে চট্টগ্রাম। আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হওয়ার সুযোগ পাবে চট্টগ্রাম। যদি বিসিএম আর বিবিআইএন সংযোগকে যুক্ত করা যায় তবে সে পথ পৌঁছে যাবে আসিয়ানে। তৈরি হবে এক মহাপথ।