বিজনেস

প্রকৌশলী ও স্থপতিদের বার্ষিক সম্মেলনে নৈতিকতা, গবেষণা ও টেকসই উন্নয়নের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক >>

চট্টগ্রামে দি ফোরাম অব ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের উদ্যোগে বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (২১ আগস্ট) নগরীর লালখান বাজারস্থ ইস্পাহানি ট্রেড সেন্টারের কপার চিমনিতে আয়োজিত এ সম্মেলনে চট্টগ্রামের প্রায় ৪০০ জন প্রকৌশলী অংশগ্রহণ করেন।

---------

দি ফোরাম অব ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সেক্রেটারি প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় এবং ফোরামের সভাপতি ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি), চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলমের সভাপতিত্বে বিকেল সাড়ে ৫টায় সম্মেলনের কার্যক্রম শুরু হয়।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম।

সম্মেলনের শুরুতে দারসুল কুরআন পেশ করেন সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ইসলামী স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হাফেজ মাওলানা মহিউদ্দিন মাহবুব।

স্বাগত বক্তব্যে প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে প্রকৌশলীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বিদেশি প্রকৌশলীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের প্রকৌশলীদের দক্ষতা ও সক্ষমতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ এমপি বলেন, ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরিতে ফোরামকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ ও অ্যাটাচমেন্টের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি শিল্পখাতও দক্ষ মানবসম্পদ পাবে।

তিনি প্রকৌশল খাতে গবেষণা ও উদ্ভাবন এগিয়ে নিতে একটি কার্যকর গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি মাসে অন্তত একবার সিনিয়র প্রকৌশলীদের অভিজ্ঞতা ও কর্মজীবনের গল্প জুনিয়রদের সঙ্গে শেয়ার করার নিয়মিত কর্মসূচি আয়োজনের পরামর্শ দেন। তার মতে, অভিজ্ঞদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ তরুণ প্রকৌশলীদের পেশাগত ও নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি ইটের বিকল্প পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শুরুতে কোনো বিকল্প প্রযুক্তি ব্যয়বহুল মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।

পারিবারিক মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি সন্তানদের জন্য পরিকল্পিত সময় দেওয়া, তাদের সঙ্গে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং বই উপহার দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা মোবাইল থেকে বিরতি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর পরামর্শ দেন।

অপর বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, প্রকৌশল ও স্থাপত্য পেশায় নৈতিকতার চর্চা ও প্রসার ঘটানো ফোরামের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

তিনি পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আসর-এর শিক্ষা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, সময়ের মূল্য, সত্যের প্রতি অবিচল থাকা এবং পরস্পরকে সৎকাজের উপদেশ দেওয়া—এসব নৈতিক মূল্যবোধ পেশাজীবনেও অনুসরণ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মানুষের বিবেক ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে সক্ষম। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিবেক, নৈতিকতা ও পেশাগত দায়িত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে।

পেশাগত উৎকর্ষ অর্জনের বিষয়ে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানো এবং জাপানের ‘Kaizen’ দর্শনের মতো ধারাবাহিক উন্নয়নের নীতি অনুসরণের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, শুধু সমস্যা হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলে হবে না; সম্ভাব্য সমস্যা আগে থেকেই শনাক্ত করে Reactive-এর পরিবর্তে Proactive হতে হবে।

তিনি প্রকৌশলীদের জন্য খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ব্যাপক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে নতুন উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। পাশাপাশি পরিবর্তনশীল আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রকৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সম্মেলনে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরীর সেক্রেটারি অধ্যক্ষ নুরুল আমিন, আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন চট্টগ্রামের সভাপতি অধ্যাপক মো. নূরুন্নবী এবং ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি ডা. এ টি এম রেজাউল করিম।

এছাড়া বিষয়ভিত্তিক বক্তব্য দেন দি ফোরাম অব ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের উপদেষ্টা প্রকৌশলী মোহাম্মদ মিয়ান তালুকদার, সহ-সভাপতি প্রকৌশলী মোমিনুল হক, সহ-সভাপতি প্রকৌশলী এস এম লোকমান কবির, সহ-সভাপতি প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, আইইউসির অধ্যাপক মো. আতহার উদ্দীন এবং চুয়েট ফোরাম ঢাকার সভাপতি প্রকৌশলী আতিকুর রহমান।

সম্মেলনের সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম সবার সহযোগিতায় ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে সম্মেলন আয়োজনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পরে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।