এ মুহূর্তের সংবাদ

বদলে যাবে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্র

ওমর ফারুক »

একদিকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম, অন্যদিকে পর্যটননগরী কক্সবাজার। সাথে মিরসরাইয়ের বিশাল শিল্পাঞ্চল, আনোয়ারা-কর্ণফুলীর দ্রুত বিকাশমান শিল্পভিত্তি এবং মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে একই সড়ক ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্কে যুক্ত করছে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে। ফলে দেশের প্রধান এই মহাসড়ক এখন শুধু রাজধানীর সঙ্গে বন্দর ও পর্যটননগরীর যোগাযোগের পথ নয়; এটি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নতুন শিল্প, বন্দর, জ্বালানি, পর্যটন ও সামুদ্রিক অর্থনীতির সম্ভাব্য মেরুদণ্ড।

---------

গত দেড় দশকে এই অঞ্চল ঘিরে একের পর এক বড় অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারণ, বে-টার্মিনাল, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল, কর্ণফুলী টানেল, মিরসরাই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, আনোয়ারা-কর্ণফুলীর শিল্পাঞ্চল, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ এবং মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর—প্রতিটি প্রকল্পই আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোর প্রকৃত অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি হবে তখনই, যখন ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে, রেলপথ ও সমুদ্রপথের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি হবে। এই করিডোরকে ঘিরে এখন যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তা শুধু চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের অর্থনীতির পরিবর্তন নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক ভূগোলও বদলে দিতে পারে।

মিরসরাই হতে পারে দেশের অন্যতম বড় শিল্পকেন্দ্র, আনোয়ারা-কর্ণফুলী হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্পভিত্তি, চট্টগ্রাম থাকবে বন্দর ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে, কক্সবাজার হতে পারে পর্যটন ও সামুদ্রিক অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র এবং মাতারবাড়ী খুলে দিতে পারে আন্তর্জাতিক গভীর সমুদ্রবাণিজ্যের নতুন দরজা। তবে এই সম্ভাবনার সামনে বড় প্রশ্নও রয়েছে। চার লেনে উন্নীত হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আবার যানজট ও ধীরগতির চাপে পড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহনের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ এখনো সড়কনির্ভর। ফলে বন্দর যত সম্প্রসারিত হচ্ছে, মহাসড়কের ওপরও তত চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে মিরসরাইয়ের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও পানির নিশ্চয়তা নেই, মাতারবাড়ীর সঙ্গে জাতীয় রেল ও সড়ক নেটওয়ার্কের কার্যকর সংযোগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, আর কর্ণফুলী টানেলের কাক্সিক্ষত ব্যবহারও নিশ্চিত হয়নি। অর্থাৎ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বড় সমস্যা এখন আর প্রকল্পের অভাব নয়; বরং প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। এই সমন্বয় নিশ্চিত করা না গেলে বিপুল বিনিয়োগের পরও প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, আমদানি-রপ্তানি ও লজিস্টিকস সুবিধা পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।

চার লেনেও কাটেনি যানজট

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক একসময় ছিল দুই লেনের। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মহাসড়কটি চার লেনে সম্প্রসারণের কাজ শেষ হয় ২০১৭ সালে। তখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাতায়াতের সময় কমে চার-পাঁচ ঘণ্টায় নেমে এসেছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় মহাসড়কটি আবারও আগের সমস্যায় ফিরে যায়। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সাত-আট ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত হলেও প্রয়োজনীয় সার্ভিস লেনসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সব জায়গায় তৈরি না হওয়ায় স্থানীয় যানবাহন, দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও কনটেইনারবাহী গাড়িকে একই সড়ক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে যানবাহনের গতি কমছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে এবং পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে।

যানবাহনের চাপ যে পূর্বাভাসের চেয়েও দ্রুত বাড়ছে, তার প্রমাণ বিভিন্ন সমীক্ষায় পাওয়া যায়। ২০১৬ সালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ২০২৬ সাল নাগাদ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দৈনিক গড়ে ২২ হাজার ৭৫টি যানবাহন চলাচল করতে পারে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) আরেক জরিপে বলা হয়, ২০২২ সালে দৈনিক ২৬ হাজার যানবাহন চলতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) জরিপে দেখা যায়, ২০২০ সালেই মহাসড়কে দৈনিক যানবাহনের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

বর্তমানে স্থানভেদে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ হাজার পর্যন্ত যানবাহনের চাপ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য। অর্থাৎ যে মহাসড়ককে সামনে রেখে দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরভিত্তিক অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, তার বর্তমান সক্ষমতা এরই মধ্যে প্রশ্নের মুখে।

সামনে ১০ লেনের ভাবনা

ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামাল দিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করা কিংবা এলিভেটেড করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। টানেল হয়ে কক্সবাজারমুখী আঞ্চলিক সড়ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি মিরসরাই থেকে মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের সক্ষমতা অনেক বাড়বে। কিন্তু শুধু সড়ক প্রশস্ত করলেই অর্থনৈতিক করিডোর কার্যকর হবে না। মহাসড়কের সঙ্গে বন্দর, শিল্পাঞ্চল, রেলস্টেশন, আইসিডি, কনটেইনার ডিপো, গুদাম এবং শিল্পকারখানার সংযোগও একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কোনো শিল্পকারখানা থেকে পণ্য মহাসড়কে ওঠার পর যদি বন্দরে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে, কিংবা বন্দরে পণ্য নামার পর শিল্পাঞ্চলে নিতে গিয়ে যানজটে আটকে থাকে, তাহলে প্রশস্ত মহাসড়কের সুফলও সীমিত হয়ে যাবে। তাই ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়েকে শুধু সড়ক হিসেবে না দেখে একটি অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে পরিকল্পনা করাই এখন সময়ের দাবি।

চট্টগ্রাম বন্দর হবে করিডোরের প্রাণ

এই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক করিডোরের মূল চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ এ বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নতুন রেকর্ড হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে ৩৫ লাখের বেশি টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়েও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বন্দরের এই প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। কিন্তু এর অর্থ হচ্ছে বন্দরের ওপর চাপও দ্রুত বাড়ছে। আমদানি-রপ্তানি বাড়লে শুধু জেটি ও ইয়ার্ডের সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না; বন্দরে আসা পণ্য দ্রুত শিল্পাঞ্চল, গুদাম, আইসিডি ও দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহনের বড় অংশ সড়কনির্ভর। কনটেইনার ট্রাকের চাপ চট্টগ্রাম নগরী থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। একটি কনটেইনারবাহী ট্রাক একই সঙ্গে সড়কে বেশি জায়গা নেয় এবং জ্বালানি খরচ বাড়ায়। যানজটে আটকে থাকলে পণ্য পরিবহনের সময় আরও বাড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্যের লজিস্টিকস ব্যয়ে। এ কারণে বন্দর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নয়ন জরুরি। বে-টার্মিনাল, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালসহ নতুন টার্মিনাল অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু তখন বন্দরের বাইরে পণ্য পরিবহনের চাপও বাড়বে। তাই বন্দর উন্নয়নকে জাতীয় সড়ক, রেল, শিল্প ও লজিস্টিকস পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত করতেই হবে।

মাতারবাড়ী বদলে দিতে পারে বাণিজ্যের মানচিত্র

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক করিডোরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। প্রায় ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এ প্রকল্পে জাপানের জাইকার ঋণ সহায়তা রয়েছে। মাতারবাড়ীর প্রধান বিশেষত্ব হলো গভীর সমুদ্রের বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করা। চট্টগ্রাম বন্দরে বড় মাদার ভেসেলের ক্ষেত্রে গভীরতার সীমাবদ্ধতা থাকায় ফিডার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য আনার প্রয়োজন হয়। মাতারবাড়ীতে বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুবিধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।

২০২৬ সালে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি এখন বাস্তব নির্মাণপর্বে প্রবেশ করেছে। দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় এটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কিন্তু বন্দর নির্মাণের পরও যদি পণ্য দ্রুত দেশের শিল্পাঞ্চলে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে কাঙ্খিত সুফল মিলবে না।

মাতারবাড়ী থেকে মিরসরাই, আনোয়ারা-কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম এবং ঢাকার শিল্প ও বাজারে দ্রুত পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। অর্থাৎ মাতারবাড়ীকে শুধু একটি গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে নয়, জাতীয় লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এর সঙ্গে সড়ক, রেল, শিল্পাঞ্চল, আইসিডি, গুদাম, কাস্টমস ও অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামোর সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

মিরসরাইয়ে শিল্পের মহাবিস্তার

ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরের সবচেয়ে বড় শিল্প সম্ভাবনার জায়গাগুলোর একটি মিরসরাই। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে এখানে বিশাল শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩৩ হাজার একরজুড়ে বিস্তৃত শিল্পাঞ্চল, মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরী এবং মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা ভারী শিল্প মিলিয়ে অঞ্চলটি ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম বড় শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। মিরসরাইয়ের শক্তি শুধু বিশাল জমি নয়, এর ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর। ভবিষ্যতে মাতারবাড়ীর সঙ্গেও কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করা গেলে আমদানি করা কাঁচামাল কারখানায় আনা এবং উৎপাদিত পণ্য বন্দরমুখী করার সুযোগ আরও বাড়বে। সরকারের পরিকল্পনায় মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও ফেনীর সোনাগাজীজুড়ে বিস্তৃত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চলে পরিণত করার উদ্যোগ রয়েছে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে শিল্প প্লট, অভ্যন্তরীণ সড়ক, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় শিল্পাঞ্চলের বড় দুর্বলতা ইউটিলিটি সুবিধা। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক বিনিয়োগ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হচ্ছে ধীরগতিতে। উদ্যোক্তাদের বড় দাবি শিল্পাঞ্চলে জমি দেওয়ার পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ও সড়ক যোগাযোগ একই সময়ের মধ্যে প্রস্তুত করতে হবে।

পানি না থাকলে শিল্পায়নও থমকে যাবে

মিরসরাইয়ের শিল্পায়নের জন্য গ্যাসের পাশাপাশি পানি সরবরাহও বড় চ্যালেঞ্জ। বড় শিল্পকারখানায় উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, শীতলীকরণ ও শ্রমিকদের ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হবে। পানির সংকটের কারণে বিদ্যমান ভারী শিল্প এলাকাগুলোতেও উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্যের দামও বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েন।

মেঘনা নদী থেকে দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে মিরসরাইয়ে পানি সরবরাহের একটি বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু অর্থায়ন, পানির মূল্য ও বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কয়েক বছর আগে হালদা নদী থেকে পানি সরবরাহের উদ্যোগের কথাও ভাবা হয়েছিল। পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষার বিষয় বিবেচনায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে মিরসরাইয়ের শিল্পায়নের আগে পানির উৎস, শোধনাগার, পাইপলাইন, সংরক্ষণ ও শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা জরুরি। শিল্পায়নের নামে স্থানীয় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত সংকটও তৈরি হতে পারে।

আনোয়ারা-কর্ণফুলীতে দক্ষিণমুখী শিল্পায়ন

চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলা দ্রুত শিল্পায়নের দিকে এগোচ্ছে। কোরিয়ান ইপিজেডের পাশাপাশি চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বিভিন্ন শিল্প উদ্যোগ এ অঞ্চলের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। রয়েছে বেসরকারি জেটি, জ্বালানি শোধনাগার, সার কারখানা, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতসহ বিভিন্ন শিল্প।

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল নগরীর সঙ্গে দক্ষিণ পাড়ের যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। টানেলকে কেন্দ্র করে আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও পটিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প, আবাসন, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও নতুন সেবা খাতের বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে শিল্পাঞ্চল, মহাসড়ক, টানেল, নদী পারাপার ও বন্দরমুখী পণ্য পরিবহনকে সমন্বিত না করলে এই সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ের অর্থনীতিকে ঢাকার বাজার ও চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দ্রুত যুক্ত করার জন্য অভ্যন্তরীণ সড়ক ও বন্দর সংযোগের উন্নয়ন জরুরি।

কক্সবাজারে খুলছে নতুন অর্থনীতির দুয়ার

দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ চালু হওয়ায় কক্সবাজার প্রথমবারের মতো জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। এর তাৎক্ষণিক সুফল পর্যটন খাতে দৃশ্যমান হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই রেলপথের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।

কক্সবাজার শুধু পর্যটনের শহর নয়। মাছ, লবণ, শুঁটকি, কৃষি ও সামুদ্রিক সম্পদভিত্তিক অর্থনীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এসব পণ্য রেলের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা গেলে পরিবহন ব্যয় কমানো সম্ভব।

রামু থেকে মিয়ানমারের গুনদুম পর্যন্ত রেল সংযোগের পরিকল্পনাও ছিল। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটে সেই উদ্যোগ থেমে থাকলেও ভবিষ্যতের ভূ-রাজনীতি ও আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের প্রয়োজন বিবেচনায় এ রুটের সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ।

কক্সবাজার ও মহেশখালী-মাতারবাড়ীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে ভবিষ্যতে এই রেলপথ কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। এজন্য যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রেন, লোডিং-আনলোডিং টার্মিনাল, গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ ও শিল্পাঞ্চলভিত্তিক রেল সংযোগ গড়ে তুলতে হবে।

সড়কনির্ভর অর্থনীতি কতটা টেকসই

ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ যদি সড়কনির্ভর থাকে, তাহলে মহাসড়কের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়বে। চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহনের বড় অংশ সড়কপথে হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও চট্টগ্রাম নগরীতে কনটেইনার ট্রাকের চাপ বাড়ছে।

যানজটের কারণে একটি ট্রাকের যাত্রা দীর্ঘ হলে শুধু সময়ই নষ্ট হয় না; জ্বালানি খরচ, শ্রমিক ব্যয়, পণ্যের সংরক্ষণ ব্যয়সহ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার খরচ বাড়ে। তাই রেলভিত্তিক কনটেইনার পরিবহন বাড়ানো এখন শুধু যানজট কমানোর বিষয় নয়; এটি দেশের রপ্তানি সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। রেলপথের সক্ষমতা বাড়লেও পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ, কনটেইনারবাহী ওয়াগন ও জনবল না থাকায় পূর্ণমাত্রায় সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

ধীরাশ্রম ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো নির্মাণ শেষ হলে রেলভিত্তিক কনটেইনার পরিবহনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক করিডোরে সড়ক ও রেলকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। মহাসড়ক থাকবে দ্রুত ও নমনীয় পরিবহনের জন্য, আর রেল বহন করবে দীর্ঘ দূরত্বের বিপুল পরিমাণ পণ্য।

মাতারবাড়ী-মিরসরাই হবে নতুন শিল্প-সড়ক সংযোগ

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং মিরসরাইয়ের শিল্পাঞ্চলকে একই অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে যুক্ত করা গেলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। মাতারবাড়ীতে আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি নামার পর তা দ্রুত মিরসরাইয়ের কারখানায় পৌঁছাতে পারবে। আবার মিরসরাইয়ে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির জন্য মাতারবাড়ী কিংবা চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো সম্ভব হবে। এতে বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের মধ্যে সরাসরি সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি হবে। তবে এ সংযোগের জন্য শুধু সড়ক নির্মাণ যথেষ্ট নয়।

দীর্ঘমেয়াদে রেল সংযোগ, মাল্টিমোডাল পরিবহন, কনটেইনার ডিপো, গুদাম ও কাস্টমস সুবিধা প্রয়োজন হবে। মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের পরিকল্পনাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এটি পর্যটন ও পণ্য পরিবহন দুই ক্ষেত্রেই নতুন বিকল্প সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ মাতারবাড়ীকে বন্দর এবং মিরসরাইকে শিল্পাঞ্চন হিসেবে আলাদাভাবে উন্নয়ন করার চেয়ে তাদের সংযোগ তৈরি করলে অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি বাড়বে।

টানেল দিয়েছে শিক্ষা

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল চট্টগ্রাম নগরীর সঙ্গে আনোয়ারা ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড় শিল্পায়নের সম্ভাবনাময় এলাকা হলেও নদী পারাপার ছিল বড় বাধা। কিন্তু টানেলের প্রত্যাশিত ব্যবহার এখনো নিশ্চিত হয়নি।

নির্মাণের আগে প্রতিদিন প্রায় ২৩ হাজার যানবাহন চলাচলের প্রাক্কলন করা হয়েছিল। সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সংযোগ সড়কের পর্যাপ্ত উন্নয়ন না হওয়ায় টানেলটি প্রত্যাশিত মাত্রায় ব্যবহার হচ্ছে না। ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামোর অভিজ্ঞতা ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কোনো একটি অবকাঠামো নির্মাণ করে তার আশপাশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রস্তুত না করলে বিনিয়োগের কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যায় না। তাই ভবিষ্যতের মহাসড়ক, টানেল, সেতু কিংবা রেলপথ নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট শিল্পাঞ্চল, বন্দর ও বাজারের সঙ্গে তার সম্ভাব্য সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

বিদ্যুৎ-গ্যাস হবে শিল্পায়নের ভিত্তি

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বড় শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়বে। এ কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আনোয়ারায় বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চট্টগ্রামের প্রধান লোড সেন্টারে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য উচ্চক্ষমতার সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। ৪০০ কেভি ও ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন এবং সাবস্টেশন নির্মাণের মতো প্রকল্প শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অবকাঠামো শক্তিশালী করছে। তবে শুধু উৎপাদন ও সঞ্চালন ক্ষমতা বাড়ানো যথেষ্ট নয়।

শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদাও বিবেচনায় নিতে হবে। মিরসরাই ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে সম্ভাব্য শিল্পায়ন বাস্তবায়িত হলে গ্যাসের চাহিদা বর্তমানের তুলনায় অনেক বাড়বে। ফলে পাইপলাইন ও জ্বালানি সরবরাহ অবকাঠামোর পাশাপাশি আমদানি প্রক্রিয়ার প্রতিবন্ধকতাও দূর করতে হবে।

প্রকল্প অনেক, সমন্বয় কম

ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অর্থনৈতিক করিডোর ঘিরে অবকাঠামোর তালিকা দীর্ঘ। চট্টগ্রাম বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, বে-টার্মিনাল, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী পোর্ট কানেক্টিং রোড, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ, মিরসরাই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল, মিরসরাইয়ের অভ্যন্তরীণ সড়ক ও বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক, পানি সরবরাহ ও পানি শোধনাগার, শিল্পাঞ্চলে গ্যাস অবকাঠামো, সাবরাং অর্থনৈতিক অঞ্চল, আনোয়ারা-কর্ণফুলী অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর্ণফুলী টানেল এবং ধীরাশ্রম ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো—সবই এই বৃহৎ অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ।

এর বাইরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নয়ন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো, কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন এবং মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকার বিভিন্ন প্রকল্পও করিডোরটির অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে। এই বিশাল তালিকা প্রমাণ করে, প্রকল্পের অভাব নেই। বরং এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রকল্পগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করা।

প্রয়োজন শক্তিশালী সমন্বয়

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, রেলপথ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়, বেজা, বেপজা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রকল্পগুলোকে একই অর্থনৈতিক লক্ষ্য অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে।

একটি শিল্পকারখানা যদি গ্যাস না পায়, অর্থনৈতিক অঞ্চল যদি পানি না পায়, বন্দর থেকে পণ্য রেলে উঠতে না পারে কিংবা মাতারবাড়ী থেকে মিরসরাইয়ে পণ্য দ্রুত পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে পৃথক প্রকল্পের সুফল সীমিত হয়ে যাবে। অর্থনৈতিক করিডোরের মূল শক্তিই হলো সংযোগ।

একটি বন্দর, একটি শিল্পাঞ্চল, একটি মহাসড়ক, একটি রেললাইন বা একটি টানেল একা অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি করে না। এগুলোকে একই সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে আনতে হয়। হাইওয়েকে কেন্দ্র করেই সমন্বিত পরিকল্পনা এই করিডোরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অক্ষ ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে। তাই ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় এ মহাসড়ককে কেন্দ্র করে বন্দর, শিল্প ও পর্যটনকে যুক্ত করতে হবে।

প্রথমত, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে বাড়াতে হবে। ১০ লেন বা এলিভেটেড সড়কের যে পরিকল্পনাই নেওয়া হোক, সেটি যেন শুধু যানবাহনের সংখ্যা বাড়ানোর প্রকল্প না হয়; এর সঙ্গে সার্ভিস লেন, আন্তঃসংযোগ, বন্দরমুখী আলাদা পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ও শিল্পাঞ্চলের প্রবেশপথ পরিকল্পনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ভবিষ্যতের বন্দর-পর্যটন-সামুদ্রিক অর্থনীতির উপযোগী করে ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।

তৃতীয়ত, মিরসরাই, আনোয়ারা-কর্ণফুলী ও মাতারবাড়ীর সঙ্গে হাইওয়ের কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে।

চতুর্থত, বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে রেলের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। সড়কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রেল ও সড়কের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।

পঞ্চমত, কক্সবাজারের পর্যটনের পাশাপাশি মাছ, লবণ, শুঁটকি, কৃষি ও সামুদ্রিক অর্থনীতিকে পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

ষষ্ঠত, মাতারবাড়ীকে শুধু গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে নয়, একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পকেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পনা করতে হবে।

সপ্তমত, শিল্পাঞ্চলে জমি বরাদ্দের আগেই গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ অবকাঠামো প্রস্তুত করতে হবে।

বদলে যেতে পারে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্র

বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরকে ঘিরে যে নতুন অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে এই অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।

চট্টগ্রাম হবে বন্দর ও বাণিজ্যের কেন্দ্র। মিরসরাই হতে পারে দেশের বড় শিল্পঘাঁটি। আনোয়ারা-কর্ণফুলী হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্পভিত্তি। কক্সবাজার হতে পারে পর্যটন ও সামুদ্রিক অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র। আর মহেশখালীর মাতারবাড়ী হতে পারে গভীর সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক লজিস্টিকসের নতুন দরজা।

এই কেন্দ্রগুলোকে কার্যকরভাবে যুক্ত করার প্রধান সড়ক অক্ষ হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে। এর সঙ্গে রেল ও সমুদ্রপথকে সমন্বিত করা গেলে তৈরি হবে একটি পূর্ণাঙ্গ মাল্টিমোডাল অর্থনৈতিক করিডোর। তখন ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে শুধু একটি মহাসড়ক থাকবে না। এটি হবে কাঁচামাল আনা, শিল্প উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, রপ্তানি, পর্যটন, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্মিলিত পথ।

এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য এখন দরকার দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। অতীতের মতো কোনো একটি প্রকল্প নির্মাণ করে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য অবকাঠামো বছরের পর বছর অপেক্ষায় রাখলে চলবে না। বন্দর তৈরি হবে, কিন্তু রাস্তা থাকবে না; শিল্পাঞ্চল হবে, কিন্তু গ্যাস-পানি থাকবে না; রেললাইন হবে, কিন্তু পণ্যবাহী ট্রেন থাকবে না—এমন বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন দিয়ে অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন হবে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে হাইওয়ে হবে মূল অক্ষ, রেল হবে ভারী পণ্য পরিবহনের সহায়ক মাধ্যম এবং চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী হবে আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের প্রবেশদ্বার। এর সঙ্গে মিরসরাই, আনোয়ারা-কর্ণফুলী ও কক্সবাজারের শিল্প, পর্যটন ও সামুদ্রিক অর্থনীতিকে যুক্ত করা গেলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান, নতুন বিনিয়োগ ও নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা।

সবচেয়ে বড় কথা, এই করিডোরের বিকাশ ঢাকার ওপর অর্থনৈতিক চাপও কমাতে পারে। দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড আরও বিকেন্দ্রীভূত হবে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যবর্তী বিশাল অঞ্চল নতুন শিল্প, সেবা ও লজিস্টিকস কার্যক্রমের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনার চাবিকাঠি একটাই—সংযোগ ও সমন্বয়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে যদি তার পূর্ণ সক্ষমতায় উন্নীত হয়, চট্টগ্রাম বন্দর ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর যদি রেল ও সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়, মিরসরাই ও আনোয়ারা-কর্ণফুলীর শিল্পাঞ্চল যদি গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা পায় এবং কক্সবাজারের পর্যটন ও সামুদ্রিক অর্থনীতি যদি জাতীয় পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল শুধু দেশের একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল থাকবে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়েকে কেন্দ্র করে তখন গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের নতুন শিল্প, বন্দর, লজিস্টিকস ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মেরুদণ্ড।