লকডাউন ভাবনা

ড. জেবউননেছা »

‘লকডাউন’ প্রসঙ্গে ফিরে বলছি। করোনা নিয়ন্ত্রণে আনতে এর বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং মাস্ক পরতে উদাসীন। যেখানে একদিনের লকডাউনে হাজার কোটি টাকা ক্ষতি, এই সিদ্ধান্তে সরকার আসতে বাধ্য হয়েছে, জনগণকে রক্ষা করার জন্য। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, করোনার তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানতে পারে। সরকার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে ভাল কাজ করেছে।
কদিন আগে জাতীয় টেলিভিশনে ‘লকডাউন’ সম্পর্কিত একটি আলোচনায় বলেছিলাম, দেশের ধনী শ্রেণি যারা পুঁজিপতি, শিল্পপতি এবং যারা বিদেশ থেকে টিকা কিনে এনে সরকারের কাছে বিক্রি করেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের এবং তাদের পরিবারকে যদি বিনামূল্যে টিকা প্রদান করে তাহলে তাদের প্রতিষ্ঠান যেমন থাকবে নিরাপদ তেমনি সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে আসবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে করোনার টিকা গ্রহণ করেছি সরকারি এক হাসপাতালে। ভালো লেগেছে সে হাসপাতালে টিকা প্রদানের ব্যবস্থাপনা দেখে। জনগণের মধ্যে টিকা গ্রহণের সচেতনতা তৈরির জন্য সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে।
কেননা, সরকারের একার পক্ষে এত জনবহুল দেশের জনগণের জন্য টিকা ক্রয় করতে হিমশিম খেয়ে যাবে। তাছাড়া সরকার এই করোনা পরিস্থিতিতে শুধু টিকা ক্রয় ছাড়াও দরিদ্রদের জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ শয্যা বৃদ্ধি করছে। হ্যাঁ, অতটা হিমশিম খাওয়ার কথা ছিল না, যদি আমরা নাগরিক হিসেবে মূল্য সংযোজন কর এবং আয়কর ঠিকমতো পরিশোধ করতাম।
কয়দিন পূর্বে একটি নামিদামি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির শোরুমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ক্রয় করতে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি তাদের অভ্যর্থনা টেবিলের সামনে পুরনো মূল্য সংযোজন করের সনদপত্র। জানতে চাইলে তাদের উত্তর, ‘আবেদন করেছি’। একই অবস্থা দেখতে পেয়েছিলাম আর একটি নামিদামি রেস্তোরাঁতেও। এ যদি হয় অবস্থা তখন তো সরকার হিমশিম খাবেই। এরমধ্যে কিছু মানুষের অসততা, অব্যবস্থাপনা, জবাবদিহির অভাব, অস্বচ্ছতা ক্যানসারের মতো আক্রান্ত করছে সব বিভাগে।
বেশ কয়েক দিন পূর্বে রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে আমার একজন আত্মীয়কে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি সিট পেতে কর্মীদের টাকা দিতে হয়েছিল। রোগীটি মারা গেলে একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে চাইলে সব অ্যাম্বুলেন্স ন্যায্য ভাড়ারে চেয়ে তিনগুণ বেশি হাঁকিয়েছে। বাধ্য হয়ে সেই সিন্ডিকেটের একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়েই যেতে হয়েছে রোগীর গন্তব্যে।
তবে আমি ভীষণ আশাবাদী মানুষ। আমি মনে করি খাদ্যশস্যে পরিপূর্ণ কৃষি প্রধান এই দেশ যখন প্রযুক্তির বাতাসে নিজেকে বদল করে নিচ্ছে, একদিন এই দেশের প্রতিটি নাগরিকের একটি করে পিন নম্বর থাকবে। একটি শিশু জন্মগ্রহণ করলেই জন্মের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তার নিবন্ধন হবে। সেই নিবন্ধনকৃত নম্বর দিয়ে সে আমৃত্যু সুফল ভোগ করবে। তার নামটি কম্পিউটারের সফটওয়্যারে দিলেই তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, তার আয়করের হিসাব, তার আয়ের হিসাব চলে আসবে। নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়ের চেয়ে তার আয় কমে গেলে তার বাড়িতে পৌঁছে যাবে ত্রাণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সমস্ত পাঠ শ্রেণি শুরু হওয়ার পূর্বেই আপলোড হয়ে যাবে। হাসপাতালে প্রচুর শয্যা থাকবে, আইসিইউ থাকবে। চিকিৎসায় গবেষণার অর্থ ফেরত যাবে না। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা পরিচালিত হবে। চিকিৎসা সরঞ্জাম দিনের পর দিন বিমানবন্দরে পড়ে থাকবে না। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর সেখানে একটি বুথ থাকবে, সেই বুথের মাধ্যমে একটি রিসিট নিয়ে যাত্রী চলে যাবে গন্তব্যে। রাজধানীর সব খাল বিল হবে মশামুক্ত। সব মাঠ হবে খেলাধুলার জন্য উপযুক্ত, মানুষ যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবে না। বেকার যুবক থাকবে না। সব বিভাগ হবে দুর্নীতির কালো ছায়ামুক্ত। আমার পরিচিত এক রোগীর হাসপাতালে আটদিনে রোগীর বিল এসেছে সাড়ে চৌদ্দ লাখ টাকা। রোগীর কিডনি দুটো প্রায় অকার্যকর। অথচ রোগীর বয়স মাত্র ৩৫। রোগীটি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। তিনি পুরান ঢাকার অধিবাসী। এই রোগীটি ফিরবে কিনা জানি না। তবে যে মশাটি কামড় দিয়ে রোগীটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলো সে মশা নির্মূলের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা জানা নেই। সরকার করোনার টিকার জন্য প্রাণান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। সবার জন্য টিকা নিশ্চিত হলে প্রথমেই প্রয়োজন চিকিৎসক, সেবিকা, পুলিশদের টিকা প্রদান করা। এরপর ৬০ এবং তদূর্ধ্ব বয়সীদের জন্য টিকা নিশ্চিত করা। অতঃপর প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত সবাইকে টিকা নিশ্চিত করা। কোভিড কতদিন থাকবে বোঝা যাচ্ছে না। তাই সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করাই এখন মুখ্য বিষয়। কারণ, অনন্তকাল সবকিছু বন্ধ করে চলা যাবে না।
এক্ষেত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এমপি ড. সলিমউদ্দিনের মতো জনসেবকও খুব প্রয়োজন। যার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় কানসাটবাসী কোভিড সংক্রমণ থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পেয়েছে। সুতরাং মহামারি রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প কিছু নেই। এক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করতে পারে। বড় বড় শিল্পকারখানার মালিকেরা তাদের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের টিকার ব্যবস্থা করতে পারে তাদের স্বার্থে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীর জন্য টিকার ব্যবস্থা করতে পারে। সব কিছুর সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে। মানুষ বাঁচাতে হবে। দেশ বাঁচাতে হবে। প্রজন্ম বাঁচাতে হবে।
মনে রাখতে হবে, প্রতিটি প্রাণই গুরুত্বপূর্ণ। যে মানুষটি প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক তার প্রাণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমন গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষটি থালাতে করে শসা বিক্রি করে। সব প্রাণের প্রতি শ্রদ্ধা আছে বলেই সরকার লকডাউনের দিকে এগোচ্ছে। অথচ এই লকডাউনের ঘোষণার পরবর্তীকালে গ্রামমুখী মানুষের ভিড় থামানো যাচ্ছে না। আর এই বিপুল সংখ্যক লোক সমাগমের পেছনে একটিই কারণ, তারা কাজ হারাবে এই লকডাউনে। তাহলে কি এই রাজধানী তাদের নয়? যদি তাদের নাই হয়, তাহলে গ্রামগুলোকে নিয়ে ভাবার সময় এখনই। প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসেবা জরুরি। বারবার লকডাউনের ঘোষণায় গ্রামমুখী মানুষের ¯্রােত এটাই প্রমাণ করে, এ শহরটি তাদের নয়। কাজ নেই তো অন্ন নেই। বড্ড বেশি স্বার্থপর এই শহর। প্রয়োজনে রাখে, অপ্রয়োজনে দূরে ঠেলে দেয়। করোনাভাইরাস যেমন ক্ষতি করে দিলো আমাদের তেমন শিখিয়েও গেলো নতুন করে ভাবার, সবকিছু পুনর্গঠিত করার পরিকল্পনার কথা।
লেখাটি যখন শেষ পর্যায়ে তখন মধ্য রাত। বারান্দায় তাকিয়ে দেখি রাস্তার পাশের চায়ের দোকানটি খোলা, রিকশার টুং টাং শব্দ। এটাই তো আমাদের শহর। যেখানে আমরা সবাই সুখ-দুঃখ ভাগ করে থাকি। অথচ আমাদের অসচেতনতায় মহামারি কড়া নাড়ছে বাংলাদেশের দরজায়। লকডাউন শুরু হলে হয়তো চায়ের দোকানটি বন্ধ থাকবে। কিন্তু তার জীবনটায় পেটের ক্ষুধা নিবারণ হবে কী করে? আসুন, সবাই মিলে একত্রিত হয়ে করোনাযুদ্ধে শামিল হই। হাত বাড়িয়ে দেই দরিদ্রদের জন্য। যে যেখানে আছি সৎভাবে দায়িত্ব পালন করি।
লেখাটি শেষ করবো জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭৪ সালে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণের একটি কথা দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষ চাই’। হ্যাঁ, আমাদের একজন আছেন। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বজন পরিজন হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দেশটিকে পরিচালনা করছেন। এই একজন ‘সোনার মানুষ’ দেশের সব খবর রাখেন। তাঁর হাতকে শক্তিশালী করতে প্রতি জেলার সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদেরও হতে হবে ‘সোনার মানুষ’।

লেখক : অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়