মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬
মতামত সম্পাদকীয়

মিয়ানমার সীমান্তের চোরাচালান : এই চক্র ভাঙবে কে

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বরাবরই জটিল। কিন্তু এই সীমান্তকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে যে সুসংগঠিত চোরাচালান চক্র গড়ে উঠেছে, তা এখন দেশের সমাজ ও অর্থনীতির জন্য এক চরম উদ্বেগজনক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ থেকে নিয়মিতভাবে জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, ওষুধ, সার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। আর এর বিনিময়ে ওদেশ থেকে আমাদের দেশে প্রবেশ করছে ‘ইয়াবা’ ও ‘আইস’-এর মতো ভয়াবহ সব প্রাণঘাতী মাদক। এই সর্বনাশা ‘পণ্য বিনিময়’ প্রথা কেবল দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না, বরং একটি পুরো প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মাঝে-মধ্যেই সীমান্তে বা নাফ নদীতে মাদকের ছোট-বড় চালান ধরা পড়ছে। বন্দুকযুদ্ধে বা অভিযানে দু-একজন চুনোপুঁটি বা বাহক আটকও হচ্ছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এই অন্ধকার জগতের মূল হোতারা বরাবরই থেকে যাচ্ছে অধরা। তারা পর্দার আড়ালে থেকে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন, অথচ আইনের লম্বা হাত তাদের স্পর্শ করতে পারছে না। ফলে চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও মূল অর্থ জোগানদাতারা অক্ষত থাকায় কোনোভাবেই এই চোরাচালান বন্ধ করা যাচ্ছে না।
বর্তমানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জান্তা বাহিনীর সাথে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংঘাতের কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধী চক্রগুলো আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ওপারে তৈরি হওয়া নিত্যপণ্যের সংকট মেটাতে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে পণ্য পাচার হচ্ছে। আর ওপারের সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধীরা অস্ত্রের টাকা জোগাতে বাংলাদেশের বাজারকে মাদকের স্বর্গরাজ্য বানিয়েছে।
এই দ্বিমুখী চোরাচালান বন্ধ করতে হলে সরকারকে দ্বিগুণ শক্তিতে আঘাত হানতে হবে। শুধু মাঠপর্যায়ের বাহকদের গ্রেফতার করে এই অপকর্ম ঠেকানো অসম্ভব। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে যারা এই বাণিজ্যে অর্থায়ন করছে, সেই ‘গডফাদার’দের চিহ্নিত করতে হবে। তারা রাজনৈতিকভাবে যতই প্রভাবশালী হোক বা সমাজের যে স্তরেই থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সাথে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) টহল ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও জোরদার করা প্রয়োজন। নাফ নদী ও দুর্গম পার্বত্য সীমান্তের যেসব ‘রুট’ বা পকেট চোরাচালানের জন্য ব্যবহৃত হয়, সেগুলোতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির নজরদারি ও থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানো দরকার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশের যে অভিযোগ ওঠে, তাও কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
একটি দেশের সীমান্ত যদি অরক্ষিত থাকে এবং সেই সীমান্ত দিয়ে যদি প্রতিদিন মাদক ঢুকে তরুণ সমাজকে পঙ্গু করে দেয়, তবে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য। বাংলাদেশ সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই নীতিকে সফল করতে হলে মিয়ানমার সীমান্তের চোরাচালানের মূল উৎসে হাত দিতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিজিবি এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে মহাপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হবে। আমরা আশা করি, সরকার ও প্রশাসন দ্রুত এই চক্রটি চিরতরে ভেঙে দিতে সক্ষম হবে।

---------