ফিচার এলাটিং বেলাটিং

আনন্দময় পাঠশালা

সনেট দেব »

গ্রামের নাম শান্তিপুর। সেই গ্রামের একমাত্র স্কুলটার নাম ছিল ‘মাস্টারমশাই পাঠশালা’। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন হরিপদ স্যারÑ লম্বা, কড়া গলা, আর হাতে সবসময় একটা বেত। ছাত্ররা তাঁকে দেখলেই ভয়ে জড়সড় হয়ে যেত।
সেই স্কুলে পড়ত ছোট্ট টুনি। টুনির বয়স সাত বছর। ওর চোখ দুটো ছিল কৌতূহলে ভরা, মন ছিল প্রশ্নে ভরা। কিন্তু স্কুলে যাওয়ার নাম শুনলেই টুনির পেটে গুড়গুড় করত।
‘বাবা, আজ স্কুলে যেতে ইচ্ছে করছে না।’
‘কেন রে মা?’
‘হরিপদ স্যার বকবেন। পড়া না পারলে বেত মারবেন। আমার ভয় লাগে।’
টুনির বাবা একটু চিন্তায় পড়লেন। তিনি ভাবলেন Ñ মেয়েটা তো পড়তে ভালোবাসে, গল্প শুনতে ভালোবাসে, প্রশ্ন করতে ভালোবাসে। তাহলে স্কুলে গেলেই কেন তার মুখ শুকিয়ে যায়?
একদিন গ্রামে এলেন এক নতুন শিক্ষিকা Ñ নাম তুনু দিদিমণি। তিনি এসেছিলেন শহর থেকে, ছুটি কাটাতে। তিনি যখন দেখলেন বাচ্চারা স্কুলের নাম শুনলেই কেমন গুটিয়ে যায়, তখন তিনি হরিপদ স্যারের কাছে গিয়ে বললেন,
‘স্যার, কয়েক দিন আমাকে ক্লাস নিতে দেবেন?’
হরিপদ স্যার একটু অবাক হলেন, তবু রাজি হলেন।
পরদিন সকালে ক্লাসে ঢুকে তুনু দিদিমণি বেত হাতে নিলেন না। বরং হাতে নিলেন রঙিন কাগজ, একগুচ্ছ ফুল আর একটা ছোট্ট ঢোল।
‘আজ আমরা অঙ্ক শিখব না বই খুলে। আজ আমরা অঙ্ক শিখব খেলে।’
বাচ্চারা অবাক হয়ে তাকাল। তুনু দিদিমণি ঢোল বাজিয়ে বললেন, ‘যতবার ঢোল বাজবে, ততগুলো লাফ দিতে হবে। গুনে বলতে হবে কতবার লাফালে।’
ক্লাসঘর হাসিতে ভরে গেল। টুনি প্রথমবার স্কুলে গিয়ে হাসল।
পরের দিন তুনু দিদিমণি গল্প বলে বলে শেখালেন বাংলা অক্ষর। ‘অ-তে অজগর, আসছে তেড়ে’ বলার সময় তিনি নিজেই অজগরের মতো হেলেদুলে হাঁটলেন। বাচ্চারা হেসে গড়িয়ে পড়ল, আর না বুঝেই মুখস্থ করে ফেলল সবগুলো অক্ষর।
এক সপ্তাহের মধ্যে বদলে গেল পুরো ক্লাস। যে টুনি আগে স্কুলের নাম শুনলে কাঁদত, সে এখন ভোর হতে না হতেই বলত, ‘মা, আজ দিদিমণি কী নতুন খেলা শেখাবেন?’
হরিপদ স্যার এই পরিবর্তন লক্ষ করলেন। একদিন তিনি তুনু দিদিমণিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি বেত ছাড়াই কীভাবে ওদের এত শৃঙ্খলা শেখালে? আমি তো বছরের পর বছর বেত হাতে নিয়েও পারিনি।’
তুনু দিদিমণি হেসে বললেন, ‘স্যার, ভয় দিয়ে যা শেখানো হয়, তা মন থেকে শেখা হয় না Ñ শুধু ভয় থেকে বাঁচার জন্য শেখা হয়। আর আনন্দ দিয়ে যা শেখানো হয়, তা মনের মধ্যে চিরকাল থেকে যায়। শৈশব একবারই আসে। সেই শৈশবকে যদি আমরা ভয়ে ভরিয়ে দিই, তাহলে শেখাটাও থেকে যায় অসম্পূর্ণ।’
হরিপদ স্যার সেদিন থেকে বেতটা তুলে রাখলেন আলমারিতে। তার বদলে ক্লাসে এল গল্প, গান, ছবি আঁকা আর খেলার মধ্য দিয়ে শেখার নতুন পদ্ধতি।
কয়েক মাস পর সেই ‘মাস্টারমশাই পাঠশালা’র নাম বদলে গ্রামের মানুষ ডাকতে লাগলÑ ‘আনন্দময় পাঠশালা’।
আর টুনি? সে এখন স্কুলে সবার আগে পৌঁছায়, প্রশ্ন করে, হাসে, শেখে। কারণ ও বুঝে গেছেÑ যে শিক্ষা ভয় দেখায়, সেটি প্রকৃত শিক্ষা নয়। শিক্ষা আসে আনন্দের হাত ধরে। আর শৈশবকে আনন্দময় করে তোলাই শিক্ষার প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি স্তর।

---------