ফিচার এলাটিং বেলাটিং

দইওয়ালা

অঞ্জন নন্দী »

মিলু মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে ফুটবল খেলা দেখছে। ক্লাস নাইনের সাথে ক্লাস এইটের প্রতিযোগিতা চলছে। সামিয়ানার নিচে হেডস্যার অন্য শিক্ষকদের নিয়ে মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখছেন। দর্শকদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা। পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলো, কিরে মিলু খেলবি না-কি ?
কথাটা শোনার পর, আশেপাশের অনেকে খিলখিল করে হেসে উঠলো। হেডস্যারের ছেলে ক্লাসমেট রহিম জোর গলায় বলে উঠলো,
ও খেলবে ফুটবল! ঠিক মতো হাঁটতে পর্যন্ত পারে না।’ সবাই আবার হেসে উঠলো, কেউকেউ তাচ্ছিল্য দৃষ্টিতে মিলুর দিকে তাকালো। মিলু মাথা নিচু করে অপমান হজম করলো। ছোটবেলা থেকে এমন খোঁটা, বহুবার শুনেছে। প্রথম প্রথম খুব রাগ হতো, মারামারিও করেছে অনেক। এখন আর করে না। মাঝেমাঝে কান্না পায়, সবকিছু তছনছ করে দিতে ইচ্ছে করে। আশেপাশের সবাই কী সুন্দর হাঁটে, দৌঁড়ায়। সে দৌঁড়ানো তো দূরের কথা, তাদের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতেও পারে না। কখনো তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় মাটিতে।
ছোটবেলায় মিলুর পা এমন বাঁকা ছিল না। অন্য সবার মতো হাঁটতো, খেলতো। অল্প বয়সে সাঁতার কেটে পুকুর পারাপার করতো। কিন্তু তারপর কী হলো মনে নেই।
কয়েকবছর আগে একদিন কাঁদতে কাঁদতে মা’কে জিজ্ঞেস করেছিল, মা আমার পা এমন হলো কী করে?
মা আঁচল দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলেছিল,’ সব উপরওয়ালার ইচ্ছা বা’জান। আমাদের কপাল। তোমার বয়স যখন ছয় বচ্ছর, একদিন তোমার জ্বর আইলো। কিছুতে কমে না। বাড়তে থাকলো, উথাল-পাতাল জ্বরে তুমি কাহিল। ভ্যানগাড়িতে কইরা তোমারে সদর হাসপাতালে নিয়া গেলো। পরীক্ষা নীরিক্ষা কইরা, ডাক্তার কইলো তোমার পোলিও হইছে। এর কোন চিকিৎসা নাই। টিকা না-কি বাইর হইছে, কিন্তু তা তো গ্রামে আসে নাই। এই অসুখে অনেক বাচ্চা মারা যায়, কারও শরীর অবশ হইয়া যায়। আমাগো ভাগ্য তবু ভালো, তোমার শুধু পা একটু বাঁইকা গেছে, বাঁইচা তো আছো বাপ।
মা, মিলুকে বুকে জড়িয়ে ধরে। মায়ের কোল, মিলুর অশ্রুতে ভিজে যায়। সে বুঝতে পারে, সারাজীবন তাকে মানুষের কথার বিষ হজম করে চলতে হবে।
মিলুর বাবা কৃষক। চাষের কিছু জমি আছে। গোয়ালে আছে দু’টো গরু। মুরগী আর হাঁস পালে বড়ো আপা। খুব স্বচ্ছল না হলেও তাদের তিন বেলা খাবারের অভাব হয় না। বড়ো আপার বিয়ের প্রস্তাব আসে,কিন্তু আব্বা এখনই বিয়ে দিতে রাজি না। আপা উপজেলা সদরের কলেজে পড়ে। কলেজ পাশ না করা পর্যন্ত, বিয়ে না দেবার কথা বলে দিয়েছে আব্বা।
মিলুর পড়াশোনা আপাই দেখাশোনা করে। লেখাপড়ায় তার মেধা খারাপ না। কিন্তু কখনোই ক্লাসে ফাস্ট হতে পারে না। ফাস্ট হবার জায়গা হেডস্যারের ছেলে রহিমের জন্য বরাদ্দ। ক্লাস পরীক্ষায় রহিম কখনো ভালো করে না। কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষায় সে কিভাবে যেন এক বা দুই মার্ক বেশি পেয়ে ফাস্ট হয়। রহিমের তাই অনেক গর্ব। অংকের জলিল স্যার মিলুকে একদিন সস্নেহে বলেছিলেন, মন খারাপ করিস না মিলু, মাধ্যমিকে তোকে কেউ হারাতে পারবে না।
সন্ধ্যায় বাড়ির উঠোনে পড়াশোনা শেষে বড়ো আপা গল্প শোনায়, কবিতা আবৃত্তি করে। অন্ধকার আকাশে লক্ষ কোটি তারার আলোয় আপা আবৃত্তি করে,
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ
মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই। এই কবিতা শুনলে মিলুর বুক হাহাকার করে ওঠে। আপার কোলে মুখ গুঁজে সে কাঁদতে থাকে।
সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় মিলু আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা আর ধারাবাহিক গল্প বলায় প্রথম হয়। গতবছর স্কুল থেকে উপজেলা সদরে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় মিলুকে পাঠানো হলো। সেখানেও প্রথম হয়ে মিলু জেলা পর্যায়ে চান্স পেলো। সেই প্রথম জেলা সদর দেখা। কতো মানুষ, গাড়ি, রিকশা। কুষ্টিয়া জেলা স্কুলে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। সবগুলো উপজেলার শ্রেষ্ঠরা এসেছে। কবিতা আগে থেকেই সিলেক্ট করা আছে, রবি ঠাকুরের বলাকা।
তিনজন আবৃত্তি করার পর মিলুর ডাক এলো। মিলুর উপজেলা ভেড়ামারা। স্টেজে উঠতে তার অসুবিধা হচ্ছিল। আপা হাত ধরে ডায়াসে পৌঁছে দিলো। সে খুব সাবলীলভাবে আবৃত্তি করলো,
পাখিরে দিয়েছো গান, গায় সেই গান,
তার বেশি করে না সে দান।
আমারে দিয়েছো স্বর, আমি তার বেশি করি দান,
আমি গাই গান।
আবৃত্তি শেষে অনেক হাততালি পেলো সে। কেউকেউ পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। সবশেষে আবৃত্তি করতে উঠলো একটা মেয়ে, নাসরীন। গার্লস স্কুলের ক্লাস নাইনে পড়ে। কিন্তু আবৃত্তি করতে গিয়ে সে কথা ভুল করলো। বিচারকেরা তাকে আবার নতুন করে আবৃত্তি করার সুযোগ দিলেন। একজন অভিভাবক প্রতিবাদ করলেন, মেয়েটি ডিসকোয়ালিফাই। কিন্তু কেউ তার কথা কানে তুললো না। ফলাফল যখন ঘোষনা হলো,দেখা গেলো নাসরীন প্রথম আর মিলু দ্বিতীয় হয়েছে। একজন দাঁড়িয়ে বললো, নাসরীনের বাবা কুষ্টিয়া কলেজের অধ্যক্ষ, লালন গবেষক, তার মেয়ে বলে আপনারা এমন অনিয়ম করলেন। মিলু অবাক হয়, স্বজনপ্রীতির ঘটনা সবজায়গায় ঘটে! তবু স্কুলের সবাই খুশি। এই প্রথম জেলা পর্যায়ে স্কুল থেকে কোন পদক এলো।
বছরের শেষে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলো। সারাদিন সবাই কতো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার জিতলো। চারপাশে মেলা বসেছে। বিশাল সামিয়ানার নিচে অতিথিদের বসার জায়গা করা হয়েছে। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক। স্যারেরা খুব অস্থির। পাছে কোন ভুল ত্রুটি হয়!
জেলা প্রশাসক সস্ত্রীক এলেন দুপুরের পর। দুএকটা খেলা তাঁদের দেখানোর জন্য বাকী ছিল। মহিলাদের বালিশ খেলায় প্রথম হলেন জেলা প্রশাসকের স্ত্রী! সবশেষে শুরু হলো ‘যেমন খুশি তেমন সাজো। মাঠে ঢুকলো এক পাগল, কয়েকজন ভিখারি, এক দুঃখীনি মা, ভুড়িওয়ালা নেতা। লাল পাঞ্জাবি পরে বোগলে ছাতা নিয়ে মুখে পান চিবাতে চিবাতে ঘটকের বিচিত্র ভঙ্গি দেখে সবাই হাসিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। এক বুড়ো বিয়ের পাত্র এলো যার চারটে দাঁত নেই। বাংলার জেসমিন আপা সবাইকে লাইন করে দাঁড়াতে বললেন। তারা সারি বেঁধে স্টেজের সামনে দিয়ে হেঁটে যাবে। বিচার করবেন জেলা প্রশাসক আর তার স্ত্রী। সবাই ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে, জেসমিন আপা তাদের মাইকে কিছু বলতে বলছেন।
এমন সময় মাঠে ঢুকলো এক দইওয়ালা। পরনে লুঙ্গি, ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে কাঁধে সবুজ গামছার উপর একটা বাঁকে কয়েকটা দইয়ের পাত্র। নাকের নিচে লাগানো সাদা-কালো গোঁফ প্রায় খুলে যাবার উপক্রম। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সে সামনে এগিয়ে আসছে,আর হাঁক দিচ্ছে, দই নেবেন দই, ভালো দই, ঘরে পাতা মিষ্টি দই আছে। লাগবে দ…ই…ই। দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো দইয়ের বাঁক তার জন্য যথেষ্ট ভারী।
দইওয়ালা যখন স্টেজের কাছাকাছি এলো, হঠাৎ রহিম গিয়ে তার বাঁক ধরে থেকে টান দিলো। দইওয়ালা টাল সামলাতে না পেরে মাঠিতে পড়ে গেলো,দইয়ের কটা হাঁড়ি ভেঙে একাকার। দুষ্ট ছেলেরা পড়ে যাওয়া দইয়ের ভাড়গুলো তুলে নিয়ে ভোঁ দৌড়। চারদিকে হাসির রোল উঠলো। হেডস্যার রাগত স্বরে জেলা প্রশাসককে বললেন, দেখলেন স্যার কী বে আক্কেল ছেলে, নিজেই হাঁটতে পারে না তা-ও সঙ সাজার সখ হয়েছে, যত্তসব।
জেলা প্রশাসক হেডস্যারকে মৃদুস্বরে বললেন,দোষটা যে ধাক্কা দিয়েছে সেই ছাত্রের। আপনি তার শাস্তির ব্যবস্থা করুন। স্যারের মুখটা শুকিয়ে গেলো।
জেসমিন আপা এগিয়ে এসে দইওয়ালাকে ধরে দাঁড় করালেন। ওর অর্ধেক খুলে যাওয়া গোঁফ লাগিয়ে দিলেন। জেলা প্রশাসক শাহ আলম সাহেব দইওয়ালাকে কাছে ডেকে নিলেন।
তোমার নাম কী, দইওয়ালা ? কোন ক্লাসে পড়ো?
আমার নাম মিলন হোসেন, মিলু। আমি ক্লাস এইটে পড়ি।
তোমার পায়ে সমস্যা আছে?
হ্যাঁ, পোলিও রোগে আমার পা বেঁকে গিয়েছে।’
জেলা প্রশাসকের স্ত্রী রওনক আলম জিজ্ঞেস করলেন, তুমি দইওয়ালা সাজলে কেন ? এমন তো কেউ সাজে না।
রবি ঠাকুরের ডাকঘর গল্পে অমল দইওয়ালার সাথে কথা বলেছিল।
তুমি রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ো?
বড়ো আপা আমাকে ছোটদের বই কিনে দেন। সেগুলো পড়ি।
তোমার কোন লেখা মনে আছে?
মিলু একটু ভাবলো, তারপর বললো, ছুটি গল্পে ফটিকের শেষ উক্তি খুব প্রিয়,
মা, এখন আমার ছুটি হয়েছে মা, এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি।
রওনক আলম, মিলুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
সব প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ শেষ হলে, যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা করলেন জেলা প্রশাসক নিজে। প্রথম হয়েছে, দইওয়ালা মিলন হোসেন। মিলুর হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন, তাঁর স্ত্রী।
তোমার জন্য আমি বিশেষ পুরস্কার পাঠিয়ে দেবো কয়েকদিনের মধ্যে। এমন ছাত্র পাওয়া এখন বিরল। সবাই মোবাইল আসক্ত অথবা কিশোর মাস্তান। যে ছেলেটা ধাক্কা দিলো, সে তো শুনলাম হেডস্যারের সন্তান, খুব দুঃখজনক। স্কুলের সব শিক্ষককে অনুরোধ করছি,শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মানুষ হিসাবে গড়ে তুলবেন। জেলা প্রশাসক আরও কিছু কথা বলে তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন।
মিলুকে ইশারায় কাছে ডেকে নিজের কলমটা মিলুর হাতে দিলেন, আজ এটা তোমার জন্য।
মিলুর চোখ থেকে তখন অবিরাম ধারায় অশ্রু ঝরছিল।

-advertise-