সুপ্রভাত ডেস্ক »
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) কনসেশন মডেলে দেশি বা বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের, বিশেষ করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ জনমত উপেক্ষা করে বাস্তবায়ন করা হলে তা প্রতিহত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি।
সংগঠনটির দাবি, জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিষয় বিবেচনায় না এনে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হবে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) চট্টগ্রামে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা। নগরের হোটেল সৈকতের হালদা হলে ‘চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি–সিসিটি ইজারা : বাংলাদেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম।
সংগঠনের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু। এতে বক্তব্য দেন— কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া, সিপিবির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ. এম. নাজিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, কমরেড অশোক সাহা, ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, জেসমিন সুলতানা পারুল, প্রকৌশলী শহীদুল আলম, সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী এবং সিনিয়র সাংবাদিক জসিম চৌধুরী সবুজ।
গোলটেবিলে উপস্থাপিত ধারণাপত্রে বলা হয়, এনসিটি ও সিসিটি জনগণের অর্থে নির্মিত জাতীয় সম্পদ। এগুলো বিদেশি অর্থায়নে নির্মিত নয় এবং দেশীয় জনবল দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে সফলভাবে পরিচালনা করছে। তাই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সরকার এখনো দিতে পারেনি।
ধারণাপত্রে আরও বলা হয়, এনসিটির নকশাগত সক্ষমতা প্রায় ১১ লাখ টিইইউস হলেও বর্তমানে বছরে প্রায় ১৩ লাখ টিইইউস কনটেইনার পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে এক মাসেই প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছে টার্মিনালটি। এসব তথ্য দেশীয় ব্যবস্থাপনার সক্ষমতারই প্রমাণ বলে দাবি করা হয়।
বক্তারা বলেন, বর্তমানে এনসিটি দেশের সবচেয়ে আধুনিক ও যান্ত্রিকীকৃত কনটেইনার টার্মিনাল। অধিকাংশ গ্যান্ট্রি ক্রেন, আরটিজি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি মাত্র চার থেকে পাঁচ বছর আগে সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগের সুফল বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।
ধারণাপত্রে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, কনসেশন মডেলে মালিকানা রাষ্ট্রের থাকলেও পরিচালনা, ট্যারিফ নির্ধারণ, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত এবং অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যেতে পারে। এতে রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে পরিচালন মুনাফার একটি বড় অংশ ব্যবস্থাপনা ফি, রয়্যালটি ও লভ্যাংশ হিসেবে বিদেশে চলে যেতে পারে বলেও দাবি করা হয়।
এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির আগেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ প্রায় ৩৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করে বক্তারা বলেন, এর প্রভাব আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়ছে।
জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় তুলে ধরে তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে নৌবাহিনীর ঘাঁটি, বিমানবাহিনীর স্থাপনা, ইস্টার্ন রিফাইনারি, জ্বালানি সংরক্ষণাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনা রয়েছে। তাই এনসিটি ও সিসিটির দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা অর্থনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও তৈরি করে।
সভায় আবুল মোমেন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং দীর্ঘ ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ধারক। বন্দরের মতো কৌশলগত জাতীয় সম্পদ নিয়ে আবেগ বা তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগামী কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থে এর প্রভাব বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, জনগণের মতামত উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সভা থেকে এনসিটি–সিসিটি-সংক্রান্ত সব তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও আইনগত মূল্যায়ন এবং সংসদীয় আলোচনা ও জনপরামর্শ ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তি না করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে দেশীয় ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে বক্তারা বলেন, বিদেশি কারিগরি সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে, তবে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই রাষ্ট্রের হাতছাড়া করা উচিত নয়।



















































