ফিচার এলাটিং বেলাটিং

মিমু যখন চাঁদের বুড়ি

সরোজ আহমেদ »

মিমু চৌদ্দ বছরের এক চটপটে কিশোরী। সে শুধু স্বপ্নই দেখে, কোনো কাজ সময়মতো করে না! পড়ালেখা, ঘরের কাজ সব ফেলে সে জানালার ধারে বসে আকাশ-পাতাল ভাবে।
একদিন রাতে মিমু জানালার পাশে বসে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, “আহা, চাঁদের বুড়িটা কত শান্তিতে আছে! কোনো পড়াশোনা নেই, ঘর গোছানোর তাড়া নেই, শুধু বসে বসে চরকা কাটে। আমিও যদি চাঁদের বুড়ি হতে পারতাম!”
ঠিক তখনই ঘটল এক অদ্ভুত কাণ্ড! একটা রুপোলি আলো এসে মিমুর ঘর ভরিয়ে দিল। মিমু চোখ কচলে দেখল, তার সামনে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে স্বয়ং চাঁদের বুড়ি! বুড়ির চুলগুলো ধবধবে সাদা, আর পরনে মেঘের মতো নরম শাড়ি।
বুড়ি মৃদু হেসে বলল, “কী রে মিমু, তুই আমার মতো হতে চাস? চল তাহলে আজ রাতে তোকে চাঁদের দেশটা ঘুরিয়ে আনি।”
মিমু তো আনন্দে নাচতে নাচতে বুড়ির লাঠিটা ধরে ফেলল। চোখের পলকেই তারা উড়ে চলে গেল চাঁদে।
চাঁদে পৌঁছে মিমু তো অবাক! চারদিকে শুধু সাদা ধুলো আর বড় বড় গর্ত। কোনো গাছপালা নেই, নদী নেই, আর সবচেয়ে বড় কথা- সেখানে কোনো বাতাস নেই! মিমু দেখল, চাঁদের বুড়িকে একটা কাঁচের বড় ঘরের ভেতর বসে চরকা কাটতে হচ্ছে।
মিমু বলল, “বুড়িমা, এখানে তো কোনো টিভি নেই, মোবাইল নেই, এমনকি গল্পের বইও নেই! তুমি সারাদিন শুধু এই চরকাই কাটো?”
বুড়ি হাসল, কিন্তু তার হাসিতে একটু ক্লান্তি ছিল। সে বলল, “হ্যাঁ রে মিমু। এই চরকা কেটে আমাকে আলোর সুতো বানাতে হয়, যা দিয়ে পৃথিবীর মানুষ রাতে চাঁদের আলো পায়। একটুখানি অলসতা করলেই পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যাবে। এখানে আমার কোনো ছুটির দিন নেই।”
মিমু বলল, “তাহলে তো তোমার জীবনটা ভীষণ বোরিং! আমি একটু খেলি?”
বুড়ি বলল, “খেলবি? আচ্ছা যা, ওই কোণের পাথরের চাঁইগুলো একটু গুছিয়ে রাখ তো।”
মিমু যেই না একটা পাথর তুলতে গেল, দেখল সেটা ওজনে ভারী আর হাত দিলেই বরফের মতো ঠাণ্ডা। তাছাড়া, চাঁদে মহাকর্ষ কম থাকায় একটু লাফ দিলেই সে অনেক উঁচুতে উঠে যাচ্ছে, ঠিকঠাক নিয়ন্ত্রণই করতে পারছে না। দুই মিনিটেই মিমু হাঁপিয়ে উঠল।
তার ওপর পেটে চুঁইচুঁই খিদে। সে বলল, “বুড়িমা, মা তো রাতে বিরিয়ানি রেঁধেছিল, ভীষণ খিদে পেয়েছে। তোমার এখানে কী খাবার আছে?”
বুড়ি একটা শুকনো, স্বাদহীন বড়ি এগিয়ে দিয়ে বলল, “এই নাও মহাকাশচারীদের খাবার। চাঁদে তো আর বিরিয়ানির দোকান নেই!”
মিমুর এবার কান্না পেয়ে গেল। সে ভাবল, পৃথিবীতে মা যখন পড়তে বসতে বলে, তখন কত রাগ হয়। ঘর গোছাতে বললে মনে হয় দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ। কিন্তু এই চাঁদের দেশের তুলনায় তার নিজের ঘরটা কত সুন্দর, কত আরামের! সেখানে সুস্বাদু খাবার আছে, ঘুমানোর জন্য নরম বিছানা আছে, আর সবচেয়ে বড় কথা- সেখানে তার আপনজনেরা আছে।
মিমু বুড়ির পা জড়িয়ে ধরে বলল, “বুড়িমা, আমি আর চাঁদের বুড়ি হতে চাই না। আমি পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই। আমি বুঝতে পেরেছি, অলস বসে থাকার চেয়ে নিজের কাজ সময়মতো করা অনেক ভালো।”
বুড়ি মিমুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বলল, “মিমু, দূর থেকে যে জিনিসকে খুব সহজ আর সুন্দর মনে হয়, কাছে এলে বোঝা যায় তার পেছনে কত কঠিন পরিশ্রম লুকিয়ে আছে। পৃথিবীতে নিজের দায়িত্বগুলো ঠিকঠাক পালন করাই আসল আনন্দ।”
বুড়ি তার লাঠিটা ঘোরাতেই মিমুর চোখে আবার ঘুম নেমে এল।
পরদিন সকালে মায়ের ডাকে মিমুর ঘুম ভাঙল। মা বলছিলেন, “মিমু, ওঠো, সকাল হয়ে গেছে। ঘরটা গুছিয়ে পড়তে বসো।”
মিমু অন্যদিনের মতো ঘ্যানঘ্যান না করে ঝটপট বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বিছানাটা সুন্দর করে গুছিয়ে মায়ের গালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “শুভ সকাল মা! আমি এখনই পড়তে বসছি।”
জানালার বাইরে ভোরের সূর্যটা তখন হাসছিল, আর মিমু মনে মনে চাঁদের বুড়িকে ধন্যবাদ জানাল তাকে এক চমৎকার শিক্ষা দেওয়ার জন্য।