জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই দেশের সাধারণ মানুষের ওপর চাবুকের মতো এসে পড়ল বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ঘোষিত নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—পাইকারি, খুচরা ও সঞ্চালন—সব পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম এক লাফে অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ২০ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত আগামী জুন মাস থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের প্রতিটি নাগরিক, শিল্প-কারখানা এবং উৎপাদন খাত যে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই দফায় মূল্যের নির্মম কশাঘাত থেকে রেহাই পাননি গ্রামের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের লাইফলাইন গ্রাহকেরাও। যাঁরা মাসে সর্বোচ্চ ৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন এবং কোনোমতে একটি ফ্যান ও দুটি বাতি জ্বালিয়ে দিনাতিপাত করেন, তাঁদের বিদ্যুতের দামও প্রতি ইউনিটে ৬৯ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। অথচ স্বয়ং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এই দরিদ্র শ্রেণির গ্রাহকদের দাম না বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) প্রস্তাব লুফে নিয়ে বিইআরসি গরিবের পকেট কাটার এই বন্দোবস্ত চূড়ান্ত করল। নিম্ন আয়ের এই মানুষদের কাছ থেকে বছরে অতিরিক্ত ৭৮১ কোটি টাকা আদায়ের এই সিদ্ধান্ত কেবল অনভিপ্রেতই নয়, বরং অমানবিক।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের হিসাব বলছে, খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ ভোক্তার পকেট থেকে বছরে অতিরিক্ত সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ তুলে নেওয়া হবে। এর সঙ্গে আনুপাতিক হারে ভ্যাট ও করের বোঝাতো রয়েছেই। প্রশ্ন হলো, যেখানে সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের লাগামহীন বাজারে সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে এই বিপুল পরিমাণ বাড়তি খরচের চাপ তারা কীভাবে সইবে? মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন আকাশচুম্বী, তখন লাইফলাইন ও সাধারণ গ্রাহকদের ওপর এই বোঝা না চাপালেও চলত।
সরকার দাবি করছে, এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে পিডিবির আয় বাড়বে এবং বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমবে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ খাতের এই লোকসান বা ঘাটতির দায় কি কেবলই সাধারণ জনগণের? বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা সরকারের রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল চুক্তি, অলস বসে থাকা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বছরের পর বছর ধরে দেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্রভাড়া এবং সামগ্রিক খাতের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিই কি এই ঘাটতির মূল কারণ নয়? বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে যেভাবে বসিয়ে বসিয়ে জনগণের করের টাকা দেওয়া হচ্ছে, সেই কাঠামোগত ত্রুটি দূর করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। অথচ, সেই লোকসানের ঘাটতি মেটাতে বারবার হাত দেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেটে।
বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি বিদ্যুৎ বিলের অঙ্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর একটি বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে। সেচ পাম্পের খরচ বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে দেশীয় পণ্যের দাম আরও বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের রপ্তানি সক্ষমতা হ্রাস পাবে। সব মিলিয়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির যে জোয়ার তৈরি হবে, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।
সরকারের উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রে থাকা উচিত নাগরিকের স্বস্তি। বিদ্যুৎ খাতের অপচয়, দুর্নীতি ও অযৌক্তিক চুক্তি সংস্কার না করে জনগণের ওপর খরচের বোঝা চাপানোর এই নীতি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আমরা মনে করি, অবিলম্বে প্রান্তিক লাইফলাইন গ্রাহকদের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা উচিত। একই সঙ্গে, বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত সংস্কার করে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে জনগণের অর্থের অপচয় বন্ধ করতে হবে। জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে জনগণকে চাপে ফেলে নয়, বরং খাতের সুশাসন নিশ্চিত করেই সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে।
এ মুহূর্তের সংবাদ


















































