মতামত সম্পাদকীয়

বর্ষা শুরু হয়েছে : বেড়িবাঁধ উপকূলবাসীর দুঃখের কারণ হবে না তো

নির্মাণের বছর না-যেতে ভাঙনের মুখে বাঁশবাড়িয়া বেড়িবাঁধ

আষাঢ়ের আগমনে দেশে বর্ষা শুরু হয়েছে। আর বর্ষা মানেই দেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষের বুকে এক অজানা আতঙ্ক। প্রতি বছর এ সময়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী, সন্দ্বীপসহ দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়িবাঁধ ভাঙার নিষ্ঠুর খেলা শুরু হয়। জোয়ারের পানি আর জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘের। গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ, নষ্ট হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ সংকট দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতি বছর এই একই চিত্র আমরা কতদিন দেখব?
উপকূলীয় এলাকার মানুষকে সুরক্ষার জন্য প্রতি বছরই বেড়িবাঁধ সংস্কার বা নির্মাণের নামে বিপুল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই বরাদ্দের একটি বড় অংশই চলে যায় দুর্নীতি, অনিয়ম আর লুটপাটে। শুকনো মৌসুমে যখন বেড়িবাঁধের কাজ করার উপযুক্ত সময়, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো হেলদোল থাকে না। যখন বর্ষা এসে যায়, নদীবিকট রূপ ধারণ করে, ঠিক তখনই তাড়াহুড়ো করে বালুর বস্তা বা লোকদেখানো জিও ব্যাগ ফেলে জোড়াতালির সংস্কার কাজ শুরু হয়। ফলে সামান্য পানির চাপেই সেই বাঁধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
বেড়িবাঁধ নির্মাণে ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের একাংশের এই অনৈতিক আঁতাত এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। অনেক সময় দেখা যায়, কাগজে-কলমে বাঁধের কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে, অথচ বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এই যে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা আর দুর্নীতি, তা কেবল সম্পদের ক্ষতি করছে না, বরং লাখো মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকে কেড়ে নিচ্ছে। উপকূলের মানুষ ত্রাণ চায় না, তারা চায় একটি স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ।
ত্রাণ বিতরণের সাময়িক উপশম দিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এখন সময় এসেছে বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনার। বর্ষার আগে শুকনো মৌসুমেই ব্লক ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেকসই বাঁধ নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, বেড়িবাঁধ প্রকল্পের প্রতিটি স্তরে কঠোর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
উপকূলের বিশাল জনগোষ্ঠী ও আমাদের জাতীয় সম্পদকে রক্ষা করতে হলে বেড়িবাঁধ নিয়ে সব ধরনের লুটপাট ও খামখেয়ালি বন্ধ করতে হবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত কার্যকর ও সততার সাথে পদক্ষেপ নেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

-advertise-