নিজস্ব প্রতিবেদক »
চলমান তীব্র গ্যাস সংকট নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, শিল্প উৎপাদন এবং পরিবহন খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। আবাসিক এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ যানজট।
গ্যাস সংকটকে কেন্দ্র করে নগরের বিভিন্ন রুটে সিএনজিচালিত অটোরিকশার অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে চট্টগ্রামে।
বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে কেজিডিসিএল পাচ্ছে মাত্র ২১ থেকে ২৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস। ফলে প্রায় ১২ থেকে ১৪ কোটি ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
নগরের আগ্রাবাদ, হালিশহর, পতেঙ্গা, বাক্- লিয়া, বহদ্দারহাট, চকবাজার, চান্দগাঁও, পঁ- চিলাইশ, মুরাদপুর, জামালখান, অক্সিজেন ও ষোলশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ভোরের পর থেকে গ্যাসের চাপ দ্রুত কমে যায়। অনেক এলাকায় দুপুর কিংবা বিকেল পর্যন্ত চুলা জ্বলে না। কোথাও কোথাও রাত গভীর না হওয়া পর্যন্ত রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।
জামালখান এলাকার বাসিন্দা সুভাস মজুমদার বলেন, ‘সকালে গ্যাস চলে গেলো, কখন আসবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেক
সময় বাচ্চাদের নাশতা না দিয়েই স্কুলে পাঠাতে হচ্ছে। সন্ধ্যার পরও চুলায় পর্যাপ্ত চাপ থাকে না।’
হালিশহরের বাসিন্দা মিতু চক্রবর্তী বলেন, “সকালে রান্না শুরু করতে গেলে দেখি লাইনে গ্যাস নেই। কিছুক্ষণ গ্যাস আসে আবার চলে যায়। যার কারণে দুপুরের রান্না করা হয়নি। রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার এনে বাচ্চাদের খাওয়ানো হয়েছে।’
আসকার দিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা জাফ রিন সুলতানা বলেন, ‘গ্যাসের অবস্থা এতটাই খারাপ যে বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার কিনেছি। অতিরিক্ত খরচ হলেও বিকল্প নেই।’ শুধু আবাসিক গ্রাহকরাই নয়, সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতেও।
পতেঙ্গা, ইপিজেড, কালুরঘাট, সীতাকুণ্ড ও অক্সিজেন শিল্পাঞ্চলের একাধিক কারখানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে বয়লার ও উৎপাদন লাইন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না অনেক কারখানায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি শিল্প খাতের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।’
চরম ভোগান্তিতে সিএনজি স্টেশনগুলো
গ্যাস সংকটের কারণে দৃশ্যমান ভোগান্তি দেখা যাচ্ছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। নগরের কদমতলী, বাকলিয়া, মইজ্জারটেক, টাই- গারপাস, ষোলশহর ও ওয়াসা মোড়ের বিভিন্ন স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। কোথাও কোথাও আধা কিলোমিটার পর্যন্ত যানবাহনের সারি দেখা গেছে।
চট্টগ্রাম-চন্দনাইশ রুটের সিএনজি অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ মিন- হাজুল ইসলাম দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছেন কর্ণফুলী মইজ্জারটেক ফিলিং স্টেশনে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আগে ১৫-২০ মিনিটে গ্যাস নিতে পারতাম। এখন দুই-তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। রোদে বসে অপেক্ষা করতে করতে দিনের অর্ধেক সময় চলে যায়।’
সিএনজি চালক মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, দিনের অর্থেক সময় চলে যাচ্ছে গ্যাস সংগ্রহ করতে। এই ফিলিং থেকে ঐ ফিলিং স্টেশনে যাচ্ছি, সব জায়গায় গ্যাস সংকট। ভোরে লাইনে দাঁড়িয়ে দিনের ১১ টায় গ্যাস পেয়েছি।’
বাড়তি ভাড়া
এদিকে নগরে গ্যাস সংকটের জেরে পাম্পের দীর্ঘ সারিতে কয়েক ঘণ্টা অপচয় হওয়ার বাহানায় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রাইড পাটাও চালকেরা। এতে দৈনন্দিন যাতায়াতে চরম ভোগান্তি ও বাড়তি খরচের মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
নগরের আগ্রাবাদ, কোতোয়ালি, চকবাজার, কর্ণফুলী নতুন ব্রীজ, আতুরার ডিপো ও ফয়’স লেকসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতকারী যাত্রীদের কাছ থেকে স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায় করা হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ মিলছে না। অটোরিকশাচালকদের অর্ধেকের বেশি কর্মঘণ্টা পাম্পের সারিতে কেটে যাওয়ায় গাড়ির দৈনিক জমা ও সংসার খরচের জোগান দিতে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে বলে জানান চালকরা।
আতুরার ডিপো এলাকার বাসিন্দা এক যাত্রী বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কথা বলে অনেক চালক বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। গন্তব্যে পৌঁছাতে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছি।’
আগ্রাবাদ এলাকার ব্যাংক কর্মকর্তা জামিলুর রহমান বলেন, অফিস থেকে বের হয়ে অনান্য সময় বাস পাওয়া গেলেও আজ বাসগুলোতে বেশ ভিড়। সিএনজি চালিত ট্যাক্সির সংকট। মোটরবাইকরা অনান্য সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বাড়তি নিচ্ছে।
সিএনজি টেক্সি চালক মো. ফরহাদুল ইসলাম বলেন, ‘সারাদিন বসে থেকে গ্যাস সংগ্রহ করি, প্রতিদিন গাড়ির মালিককে দিতে হয় ৮০০ টাকা। এখন যদি কিছু টাকা বাড়তি না নিই, পরিবার, সংসার, ছেলেমেয়ের পড়ার খরচ চালাবো কিভাবে। গ্যাস সরবরাহ বাড়লে, সময় কম লাগবে, ভাড়াও স্বাভাবিক নিতে পারবো।’
গ্যাস সংকটের বিষয়ে কেজিডিসিএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিস্ট্রিবিউশন) রফিক খান বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরেই সংকট চলছে। তবে শনিবার রাত থেকে গ্যাসের চাপ আরও কমে গেছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের অগ্নিকাণ্ডের কারণে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে এর প্রভাব বেশি পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি।’
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের মেরামত কাজ চলছে। বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আনা হয়েছে এবং দেশি- বিদেশি প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। টার্মিনালের একটি অক্ষত বয়লার চালু করা গেলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পুরো টার্মিনাল সচল না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটার সম্ভাবনা কম।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সূচল করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি। তবে এর আগেই টার্মিনালের অক্ষত বয়লার চালুর চেষ্টা চলছে। সেটি চালু করা সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিশেষজ্ঞ দল টার্মিনাল চালুর কাজ করছে। দ্রুত অক্ষত বয়লার চালুর চেষ্টা চলছে। বর্তমানে অপর টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।


















































