এ মুহূর্তের সংবাদ

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অসাধারণ টেস্ট জয় বাংলাদেশের

সুপ্রভাত স্পোর্টস ডেস্ক »

ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে গিয়ে অভিজাত টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো ধসিয়ে দিয়েই ইতিহাস গড়া এক অসাধারণ জয় তুলে নিল বাংলাদেশ। সিরিজ শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে বারবার ঘুরেফিরে অস্ট্রেলিয়ার মাঠ থেকে ‘সম্মান’ অর্জনের কথা বলেছিলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তসহ সতীর্থরা। শুধু সেই সম্মানই অর্জন করেনি তারা, প্রথম টেস্টে মাঠ ছেড়েছে দাপুটে এক জয় নিয়েই। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে মাত্র চার দিনের মধ্যে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।

---------

চতুর্থ দিন স্বাগতিকদের দেওয়া ৫৭ রানের লক্ষ্য সহজেই ছুঁয়ে ফেলেছে তারা। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের টেস্ট জয় এই প্রথম নয়। ২০১৭ সালে মিরপুরে প্রথমবার হারায় বাংলাদেশ। সেটা ছিল ঘরের মাঠে টেস্ট জয়। ন’বছর পর দ্বিতীয় জয়টা এলো প্রতিপক্ষের ঘরে ঢুকে। ডারউইনে বিশ্বের দ্বিতীয় দ্রুততম দল হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয় পেল টাইগাররা। এছাড়া এশিয়ার তৃতীয় দেশ হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করলেন নাজমুল হোসেন শান্তরা।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সবচেয়ে কম টেস্ট খেলে প্রথম জয় পেয়েছে ইংল্যান্ড। ইংরেজরা তাদের দ্বিতীয় টেস্টই জিতেছিল ১৮৭৭ সালে। তার পরই জায়গা করে নিল বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ল ভারত-পাকিস্তানও। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তৃতীয় টেস্টে জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ। তাদের সঙ্গে যুগ্ম ভাবে দ্বিতীয় স্থানে আছে দক্ষিণ আফ্রিকাও। প্রোটিয়ারাও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের তৃতীয় টেস্টে জয় পেয়েছিল। সেটা ছিল ১৯১১ সাল। এই তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্যারিবিয়ানেরা তাদের পঞ্চম টেস্টে জয় পেয়েছিল ১৯৩১ সালে। যুগ্মভাবে পঞ্চম স্থানে পাকিস্তান এবং নিউজিল্যান্ড। ১৯৭৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের সপ্তম টেস্টে জয় পেয়েছিল পাকিস্তান। কিউইরাও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের সপ্তম টেস্টে জয় পায় ১৯৮৫ সালে। সপ্তম স্থানে ভারত। ১৯৭৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ১২তম টেস্টে প্রথম জয়ের স্বাদ পায় ভারতীয় দল। শ্রীলঙ্কা এবং জিম্বাবুয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একাধিক টেস্ট খেললেও কখনও জিততে পারেনি। এ ছাড়া গত ৩০ বছরে ভারত ছাড়া এশিয়ার কোনও দেশ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিততে পারেনি। পাকিস্তান শেষ বার জিতেছিল ১৯৯৫ সালে। ভারত এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ১০টি টেস্ট জিতেছে। প্রথম জয় পায় ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে। সে বছরই জানুয়ারি মাসে প্রথম জয় পাকিস্তানের। এখনও পর্যন্ত পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে চারটি

টেস্ট জিতেছে। এই তালিকায় যোগ হল বাংলাদেশের নামও। রোববার চতুর্থ দিনে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস ২৮৪ রানে শেষ হওয়ার পর জয়ের জন্য বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৫৭। ১ উইকেট হারিয়েই লক্ষ্যে পৌঁছে যান নাজমুলেরা। সহজ পরিস্থিতিতেও রান করতে পারেননি প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান তামিম (০)। তবে সমস্যা হয়নি। অন্য ওপেনার শাদমান ইসলাম (২৫*) এবং মমিনুল (৩০*) প্রত্যাশিত জয় এনে দেন। এ টেস্টে পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলতে নেমেছিল অস্ট্রেলিয়া। কামিন্সের দলে স্টিভ স্মিথ, ট্র্যাভিস হেড, মার্নাস লাবুশেন, মিচেল স্টার্ক, জশ হেজালউড, নাথান লায়ন, ক্যামেরন গ্রিন, অ্যালেক্স ক্যারে সকলেই ছিলেন। চেষ্টার কমতি রাখেননি অস্ট্রেলীয়েরা। অশান্তি পাকিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মনঃসংযোগ নষ্ট করার চেষ্টাও করেছেন স্টার্কেরা। ২২ গজের লড়াইয়ে না পেরে মানসিক চাপ তৈরির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু লাভ হয়নি। অফ স্টাম্পের বাইরে বিউ ওয়েবস্টারের খাটো লেংথের বলটা মোমিনুল হক বাউন্ডারিতে পাঠাতেই তৈরি হয় ইতিহাস।

অস্ট্রেলিয়ার গর্বের টেস্ট ইতিহাসে আঁচড় কেটে দিলেন ১১জন বাঙালি ক্রিকেটার। প্রথম টেস্টে জয়ের সুবাতাস শুক্রবারই অনেকটা নিশ্চিত করে। বাকিটুকু ছিল নিয়মরক্ষার। নাজমুলের দল যত রঙের প্রলেপ লাগিয়েছে, তত ঘেঁটে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন স্টার্কেরা। অস্ট্রেলীয়দের বোঝার সময় হয়ে গিয়েছে, শরীরী আগ্রাসন দিয়ে প্রতিপক্ষকে কাবু করার দিন শেষ। ২২ গজে লাল বলের লড়াইয়ে দক্ষতাই শেষ কথা। প্রতিনিয়ত পরীক্ষা দিতে হয়, ক্রিকেটীয় দক্ষতা প্রমাণ করতে হয়। অজিরা বাংলাদেশের বোলিং সামলাতেই পারেননি। প্রথম ইনিংসেই নাকানি চোবানি খেয়েছেন স্মিথেরা। হাসান মেহমুদ, মেহেদি হাসান মিরাজ, তাসকিন আহমেদ, এবাদত, তানজিদ হাসানেরা অস্ট্রেলীয় ব্যাটারদের ঘরে ঢুকে তাঁদের পরীক্ষা নিয়েছেন। প্রতিপক্ষের পেস বোলারদের সামনেও যেমন অস্বস্তিতে ছিলেন। তেমনই স্পিনারদের সামলাতেই সমস্যায় পড়েছেন। প্রস্তুতির অভাব বা প্রতিপক্ষকে খাটো করে দেখার মানসিকতা- কারণ যাই হোক, মাশুল দিতে হল টেস্ট ক্রিকেটে এক নম্বর দলকে।

বাংলাদেশকে যে অস্ট্রেলিয়া বিশেষ পাত্তা দেয়নি, তা বোঝা গিয়েছিল সিরিজের দুই টেস্টের মাঠ নির্বাচন দেখে। মূলত মহিলাদের ক্রিকেট ম্যাচগুলি যে সব মাঠে হয়, সেই মাঠগুলিতে টেস্ট আয়োজন করা হয়েছে। যেমন ডারউইনে প্রথম কোনও টেস্ট হল। দ্বিতীয় টেস্ট হবে ম্যাকেতে। ওই মাঠও প্রথম বার হবে টেস্ট ম্যাচ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটও খুব বেশি হয়নি ১০ হাজার দর্শকাসনের স্টেডিয়ামে। সিডনি, মেলবোর্ন, পার্থ, অ্যাডিলেড, ব্রিসবেনের মতো পরিচিত মাঠগুলিতে একটিও টেস্ট রাখা হয়নি। বাংলাদেশের এই জয় অস্ট্রেলীয়দের অবহেলারও জবাব। এই জয় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করল।

আবার অন্য দিকে, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসেও যোগ করল ব্যর্থতার নতুন অধ্যায়। ক্রিকেটের সব ফরম্যাট মিলিয়েই এই প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের হারাল বাংলাদেশ। তা-ও ২০০৩ সালের পর টেস্ট খেলতে গিয়ে! তৃতীয় দিনের শেষে অস্ট্রেলিয়া পিছিয়ে ছিল ৬৭ রানে। ২২গজে ছিলেন গ্রিন (৪৩) এবং ক্যারে ( ১৯)। চতুর্থ দিন মূলত লড়াই করলেন গ্রিন। তাঁর ১০৪ রানের ইনিংস অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস পরাজয়ের লজ্জা থেকে বাঁচায়। ক্যারে আউট হন ৩০ রানে। বাকি কেউই চাপের মুখে ভরসা দিতে পারেননি। কামিন্স (৮), স্টার্ক (১৮), লায়নেরা (১৫) এমন কিছু করতে পারেননি, যাতে বাংলাদেশ পাল্টা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ৬৬ রানে ৫ উইকেট শিকার করেন মিরাজ। ২০১৯ সালে কুলদীপ যাদবের পর প্রথম কোনও সফরকারী দলের স্পিনার হিসাবে টেস্টের এক ইনিংসে ৫ উইকেট নিলেন মিরাজ। আর হাসান মাহমুদ ৩, তাসকিন ও তাইজুল নেন ১টি করে। উল্লেখ্য, প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদ ৬ উইকেট নিয়ে অজিদের ইনিংসে ধ্বস নামান।