মতামত উপ-সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের গ্যাস সংকট: একটি কাঠামোগত দুর্বলতা ও এর সমাধান

প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম »

বাংলাদেশে বিদেশ থেকে যত গ্যাস আমদানি হয় তার সিংহভাগ আসে মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান LNG টার্মিনালের মাধ্যমে। এগুলোকে বলা হয় FSRU (ফ্লোটিং স্টোরেজ & রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট)।

এই দুইটা ইউনিটের দৈনিক প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত LNG রূপান্তর সক্ষমতা আছে।

দুর্ভাগ্যের বিষয় হইল এর একটায় কিছুদিন আগে আগুন লাগছিল। দ্রুত আগুন নেভানো সম্ভব হওয়ায় বড় বিস্ফোরণ হয় নাই, তবে ইলেক্ট্রিক যন্ত্রপাতি ও ওয়ারিং সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।

বর্তমানে একটা FSRU অচল ও মেরামতের অধীন। কিন্তু একটা অচল টার্মিনালই গোটা দেশরে অচল কইরা দিসে। মানে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০–৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট (MMCFD) গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ, একটি টার্মিনাল অচল হয়ে যাওয়ায় দেশের LNG সরবরাহের প্রায় অর্ধেকই এক ধাক্কায় বন্ধ হয়ে যায়।
ফলে শিল্প কারখানা বন্ধ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত, রান্নার গ্যাস বন্ধ, যানবাহন অচল। জিনিসপত্রের দাম ও বাড়তেছে।

সরকারের ভূমিকা ও বর্তমান পরিস্থিতি

এখন এই একটা জাতীয় বিপর্যয় দেখা দিল, এইটার দায় কাকে দিবেন…?
সমস্যাটা মূলত কাঠামোগত, কোনো একক সরকারের তাৎক্ষণিক ব্যর্থতা নয়। সারা দেশের ম্যাক্সিমাম গ্যাস আমদানি হয় শুধুমাত্র একটা টার্মিনাল-নির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে। এইটা বাংলাদেশের ভয়াবহ স্ট্রাটেজিক ভালনারেবিলিটি। আরো অন্তত ২ দশক আগে থেকেই এইটা নিয়ে ভাবা উচিৎ ছিল — কিন্তু দেশে কোনো বিকল্প রিজার্ভ বা টার্মিনালের কথা এতদিন ধরে কেউ গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি। কোনো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কখনোই একটি মাত্র স্থান বা সীমিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না।

অনেস্টলি বলতে গেলে এই মুহূর্তে বর্তমান সরকারকে এই ইস্যুতে খুব বেশি দোষারোপ করে লাভ নাই — ক্ষমতায় এসে ৬ মাসে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অবকাঠামোগত দুর্বলতা উল্টে ফেলা সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবের ফল, যা একাধিক সরকারের আমল ধরে চলে আসছে।
তবে এখন যেহেতু সমস্যাটা প্রকাশ্যে এসেছে, বর্তমান সরকারের ওপর দায়িত্ব বর্তায় জরুরি ভিত্তিতে পায়রা, মংলা বা মাতারবাড়িতে বিকল্প টার্মিনাল এবং ল্যান্ডবেইজড স্টোরেজ ক্যাপাসিটি নিয়ে অগ্রসর হওয়া।

একটা তুলনা টানা যায় — হরমুজ প্রণালীর সংকট সৃষ্টি হবার পর তেল নিয়েও আমরা একইভাবে বিপাকে পড়েছিলাম। আমাদের একমাত্র তেল রিফাইনারির সক্ষমতা খুবই সীমিত। শোনা যায় প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপে এই ক্যাপাসিটিও দীর্ঘদিন বাড়তে দেয়া হয়নি। বর্তমান সরকার ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা দ্বিগুণ করার প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে — এটি সঠিক দিকের একটি পদক্ষেপ, কিন্তু গ্যাস খাতেও একই ধরনের সাহসী সিদ্ধান্ত এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
চলমান গ্যাস ক্রাইসিস হয়তো সাময়িক। ইনশাআল্লাহ দ্রুত কেটে যাক ও জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসুক। তবে সরকারকে ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনার জন্য একটি স্থায়ী ব্যাকআপ পরিকল্পনা রাখতে হবে — যাতে একটি টার্মিনালের সমস্যায় গোটা দেশ আর কখনো এভাবে থমকে না যায়।

প্রস্তাবিত রূপরেখা: দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা

১. স্বল্পমেয়াদী (০–২ বছর): তাৎক্ষণিক ঝুঁকি হ্রাস
মহেশখালীতে অতিরিক্ত একটি FSRU সংযোজন — বর্তমান দুইটার সাথে তৃতীয় একটি ভাড়াভিত্তিক (leased) FSRU যুক্ত করা, যাতে একটি বিকল হলেও গ্রিড সম্পূর্ণ অচল না হয়ে যায়।
জরুরি মেরামত-সক্ষমতা তৈরি — ইলেকট্রিক্যাল ও ওয়্যারিং সিস্টেমের স্পেয়ার পার্টস ও কারিগরি টিম দেশেই মজুদ রাখা, যাতে ভবিষ্যতে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনায় মেরামতের সময় কমে আসে।
ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনা (FSRU মডেলে) — গ্যাস ব্রিজ/পাইপলাইন তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত ভোলার স্থলভাগের গ্যাসকে ছোট আকারের FSRU বা CNG/LNG শাটল পদ্ধতিতে চট্টগ্রাম বা মূল গ্রিডে সংযুক্ত করা — এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন (bridge) সমাধান হিসেবে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য।

২. মধ্যমেয়াদী (২–৫ বছর): অবকাঠামোগত বৈচিত্র্যকরণ
মংলা বন্দরে নতুন FSRU/টার্মিনাল স্থাপন — মংলার বিদ্যমান বন্দর অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্বিতীয় আমদানি কেন্দ্র গড়ে তোলা, যা মহেশখালীর ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পাঞ্চলকেও সরাসরি সেবা দেবে।
পায়রায় সম্ভাব্যতা যাচাই ও টার্মিনাল নির্মাণ — গভীরতা, ড্রেজিং প্রয়োজনীয়তা ও বিনিয়োগ সম্ভাব্যতা যাচাই করে পায়রাকে তৃতীয় আমদানি পয়েন্ট হিসেবে গড়ে তোলা।
স্থলভিত্তিক (land-based) স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি — শুধু ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভর না করে স্থায়ী স্টোরেজ ট্যাংক তৈরি করা, যাতে জরুরি অবস্থায় কয়েকদিনের বাফার মজুদ থাকে।
গ্রিড ইন্টারকানেকশন শক্তিশালীকরণ — একাধিক টার্মিনাল থেকে সরবরাহকে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্তকারী পাইপলাইন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, যাতে যেকোনো একটি উৎসে সমস্যা হলে অন্য উৎস থেকে দ্রুত সরবরাহ পুনর্বণ্টন করা যায়।

৩. দীর্ঘমেয়াদী (৫+ বছর): দেশীয় উৎসের ওপর গুরুত্ব
আরও বেশি অনুসন্ধান কূপ খনন — স্থল ও সমুদ্র উভয় অঞ্চলে (বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের অগভীর ও গভীর ব্লকগুলোতে) নিয়মিত ও পরিকল্পিত ড্রিলিং কর্মসূচি চালু রাখা, যাতে আমদানি-নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে।
পুরনো গ্যাসক্ষেত্র পুনর্মূল্যায়ন (workover/redevelopment) — বিদ্যমান কূপগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার।
আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ — অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সাথে PSC (Production Sharing Contract) শর্ত আকর্ষণীয় করে বিনিয়োগ টানা।
জ্বালানি মিশ্রণ বৈচিত্র্যকরণ — সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ বাড়িয়ে একক জ্বালানি উৎসের ওপর সামগ্রিক নির্ভরতা কমানো।

৪. প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশলপত্র প্রণয়ন — যেখানে ন্যূনতম কতগুলো স্বাধীন সরবরাহ উৎস থাকতে হবে তার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকবে (যেমন: কোনো একক উৎস মোট সরবরাহের ৪০-৫০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না)।
স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা — টার্মিনালগুলোর প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়মিত অডিটের আওতায় আনা, যাতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধযোগ্য হয়।
সরকার পরিবর্তন-নিরপেক্ষ পরিকল্পনা — যেহেতু অবকাঠামো তৈরিতে বছরের পর বছর লাগে, এই রূপরেখা যেন কোনো একক সরকারের মেয়াদের ওপর নির্ভরশীল না থেকে দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সারকথা: মহেশখালীর ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে মংলা-পায়রা-ভোলাকে সংযুক্ত করে একটি বহুকেন্দ্রিক (multi-hub) সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং একই সাথে দেশীয় অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো — এই দুটো একসাথে চললেই ভবিষ্যতে এই ধরনের একক দুর্ঘটনায় সমগ্র জাতীয় গ্রিড অচল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।

লেখক:

উদ্যোক্তা
ইকো ভ্যালি বিডি