বাবুল কান্তি দাশ »
“এসো হে সজল ঘন বাদল বরিষণে
বিপুল তব শ্যামল স্নেহে এসো হে এ জীবনে ॥
এসো হে গিরি শিখর চুমি ছায়ায় ঘেরা কানন ভূমি,
জীবন ছেয়ে এসো হে তুমি গভীর গরজনে ॥”
অবিরাম বৃষ্টির মাঝে বর্ষার মনমোহনী রূপটি বাংলার প্রকৃতিতে সৌন্দর্যের মেলা বসায়। বর্ষার রূপবৈচিত্র্য দোলা দেয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বর্ষার কবিতায়।
গ্রীষ্মের অগ্নিক্ষরা দিনগুলো যখন প্রকৃতিকে শুষ্ক, রুক্ষ, বিবর্ণ করে জনজীবনকে অসহনীয় করে তোলে তখনই ঋতুরানি বর্ষার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন সবকিছুকে স্নিগ্ধ সতেজ লাবন্যময় করে তোলে। যখন প্রকৃতির ঝলসিত অন্তর কেঁপে ওঠে জলের স্পর্শের জন্য, তখনই অনন্ত তৃষ্ণা জাগরিত তাপিত পৃথিবীর হৃদয়কে স্পর্শ করতে নেমে আসে বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিধারা। বর্ষায় অবগাহনে নব পললে উর্বর হয়ে ওঠে ধরণী। প্রকৃতি হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল। তারই আবেশে আবেশিত হয়ে মন নেচে ওঠে অনাবিল আনন্দে।
বর্ষা একদিকে যেমন আনন্দের অন্যদিকে বেদনারও। বেদনা অনুভূত হয় প্রকৃতির ওপর মনুষ্য সৃষ্টি অরাজকতার কারণে। তাছাড়া বর্ষার দুঃখময় স্মৃতি গ্রামীণ জনপদে। টানা বৃষ্টিতে খাল-বিল, নদী-নালা রূপ নিত সাগরের। একসময় দেখা যেত সপ্তাহ বা পক্ষকাল ব্যাপী বৃষ্টি আর বৃষ্টি। গবাদি পশু থেকে শুরু করে মানুষের এক দূূর্বিষহ দিন কাটত এইসময়। হাট-বাজার বসতে পারত না বলে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের অভাব দেখা দিত। অত্যন্ত কষ্টে দিন যাপন করত গ্রামের মানুষেরা। একজনের আহার অনেকজন ভাগ করে খেতে হতো। যা আজ গল্পের মতো। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ, কাঁদার এটে গন্ধ মিলে দারুণ সুভাস ছড়ায়। ধুলো-বালি-কাদা মেখে বড় হওয়া গাঁয়ের মানুষগুলো সেই গন্ধ খুঁজে পায়। কানায় কানায় পূর্ণ হওয়া পুকুরে অনবরত জল ঝরে। পাতা থেকে জমাট পানি পুকুরে পড়লে টুপ টাপ শব্দ করে। পুকুরের এক প্রান্তে আমিষপ্রিয় মানুষটি উজানের মাছ খোঁজে, হাতে কোঁচ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। হঠাৎ ওপরে ওঠা কই মাছটাকে শক্ত করে ধরে, ডুলায় ভরে বিজয়ীর হাসি হাসে অপেক্ষমাণ মানুষটি। ভরা পানিতে জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে কেউ কেউ। সেই পানিতে জাল মারা যেন সবার অধিকার, প্রকৃতি সেই অধিকার দিয়ে দেয়, মালিকানার নিয়ম সেখানে খাটে না। দস্যি ছেলের দল নেমে পড়ে উঠোনে। কাদা আর পানিতে জলকেলি করে, মারামারি করে। হঠাৎ অন্যদিক থেকে ছোড়া কাদা চোখে পড়ে কারও। কান্নায় ভেঙে পড়ে, কিছুক্ষণ পর আবার হেসে শুরু করে দুষ্টুমি। ঘর থেকে বের না হওয়া সুবোধ বালকটি হঠাৎ আছাড় খেয়ে পড়ে যায়। বাকিরা হেসে ওঠে, মজা নেয়। ভাবি কিংবা দাদু সম্পর্কের কেউ বলে ওঠে, আছাড় খেয়েছো ভালোই হয়েছে, আছাড় খেলে রোদ উঠবে। আছাড় খাওয়া ছেলেটি এই কথা শুনে হেসে উঠে, আছাড় খাওয়ার অপমান নিমেষেই মিশে যায়।
শৈশবের গ্রামীণ জনপদের এমন দৃশ্য বর্তমানে হয়ত তেমন একটা চোখে পড়ে না। প্রকৃতির ওপর যথেচ্ছ অত্যাচার বর্ষার রূপ এখন অনেকটা পাল্টে গেছে। বর্ষায় দলবদ্ধ হয়ে ভেজা সে এক নান্দনিক দৃশ্য। কোনো কোনো সময় ভিজে ভিজে বল খেলা অনাবিল আনন্দের বন্যা বয়ে দিত। গ্রামীণ জনপদে শৈশবের এমনতরো স্মৃতি আজকের প্রজন্মের কাছে গল্প করার মতো।
শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে বর্ষা। রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন আজীবন। বর্ষা তাঁর জীবনে বিরহী হয়ে এসেছে। সে দিনের মিলন-মালার গন্ধ ভেসে আসা আজকের সজল সমীরণেই কি মনে পড়ে ‘মেঘদূত’-এর কথা? আদি কবি কালিদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ সেন, হিমাংশু দত্ত-অজয় ভট্টাচার্য, প্রণব রায়-কমল দাশগুপ্ত, জীবনানন্দ দাশ , সুনীল গাঙ্গুলি থেকে আজকের কবি ও লেখক- সকলের কাছেই প্রথম ও আদি প্রেমঋতু সিক্তযূথী গন্ধমাখা বর্ষা। সেই বর্ষা নিয়ে বাংলা লোকায়ত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল ভাণ্ডারে রয়েছে অজস্র মণিমুক্তা। যা প্রতিনিয়ত বাঙালি মননকে অনুরণিত করে সুরের মূর্চ্ছনায় অনাবিল আনন্দের ঝরনাধারায়।
চলচ্চিত্রে বর্ষায় যে রোমাঞ্চ পুলকিত করে দর্শকদের। চলচ্চিত্রে বর্ষা এক অবিচ্ছেদ্য অংগ। সত্যজিত রায় থেকে শুরু করে হাল জমানার পরিচালকরাও কোনো অংশে কম যান না বর্ষাকে চলচ্চিত্রে উপস্থাপনে। বর্ষা এদেশের মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনে কারো মনে দু’লাইন ছন্দ জাগে না অথবা মন আনমনা হয় না এমন মানুষ এই বাংলা মুলুকে খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। বর্ষা মানেই কবির কবিতা, ছন্দ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায়, গানে তাই বারবার বর্ষা ঋতু এসেছে। কবিগুরুর ‘বর্ষার দিনে’ কবিতায় লিখেছেন- ‘এমন দিনে তারে বলা যায়,/এমন ঘনঘোর বরিষায়-/এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরঝরে/তপনহীন ঘন তমসায়। /সে কথা শুনিবে না কেহ আর, /নিভৃত নির্জন চারি ধার। /দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি, /আকাশে জল ঝরে অনিবার-/জগতে কেহ যেন নাহি আর। কবি অমিয় চক্রবর্তী বর্ষাকে অস্তিত্বের অতলান্তে নিয়ে গেছেন। বৃষ্টি ঝরে মাঠে, ঘাটে, বন্দরে, মরুতে, বনতলে, গূঢ় প্রাণে, শিরায়-শিরায়, মনের মাটিতে। সর্বত্র বর্ষা যেন গ্রাস করে সব অস্তিত্ব, আমাদের প্রাণের ফসল। বর্ষা নামে দিগন্তের দশ দিকজুড়ে। তিনি বলেছেন, ‘অন্ধকার মধ্যদিনে বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে, বৃষ্টি ঝরে রুক্ষ মাঠে, দিগন্ত পিয়াসী মাঠে মাঠে, মরুময় দীর্ঘ তিয়াষার মাঠে, ঝরে বনতলে, ঘন শ্যাম রোমাঞ্চিত মাটির গভীর গূঢ় প্রাণে, শিরায়-শিরায় স্নানে, বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে।’ কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বর্ষার আকাশকে প্রকাশ করেছেন চমৎকারভাবে। বর্ষায় আকাশের রঙ-রূপ বৈচিত্র্যে ভরপুর থাকে। মাঝে মাঝে রংধনু ওঠে। আকাশে যেন বিভিন্ন বর্ণের মেঘের খেলা চলে। বিভিন্ন সময় মেঘের বিভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হয়। এ যেন আনন্দের পসরা। আকাশে দিগন্ত বিস্তৃত ধূসর কৃষ্ণ মেঘপুঞ্জের ঘনঘটা সবাইকে মুগ্ধ করে, কাছে টানে অন্য এক অজানা আকর্ষণে। তিনি বলেছেন- ‘শ্রান্ত বরষা, অবেলায় অবসরে প্রাঙ্গণে মেলে দিয়েছে শ্যামল কায়া; স্বর্ণ সুযোগে লুকোচুরি খেলা করে গগনে গগনে পলাতক আলো-ছায়া।’ কবি শহীদ কাদরীর ভাষায়- ‘বৃষ্টি পড়ে মোটরের বনেটে টেরচা ভেতরে নিস্তব্ধ যাত্রী, মাথা নিচুত্রাস আর উৎকণ্ঠায় হঠাৎ চমকে দ্যাখে জল-অবিরল জল, জল, জলতীব্র, হিংস্র, খল।’ বর্ষা মানে বাহারি রঙের সুগন্ধি ফুলের সমাহার। বর্ষা ঋতু যেন ফুলের জননী। বর্ষা যেন আমাদের প্রকৃতিকে আপন মনে বিলিয়ে দেয় এবং এর ফুলের সৌন্দর্য আমাদের করে তোলে বিমোহিত। আবহমানকাল ধরেই আমাদের প্রকৃতিকে বর্ষার ফুল স্বতন্ত্র সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়ে আসছে অনুপম উদারতায় এবং বৃষ্টিস্নাত বর্ষার ফুলের উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাদের মন রাঙিয়ে আসছে অনাদি অনন্তকাল ধরে। বর্ষা ও তার ফুল যেন বাংলার প্রকৃতির আত্মা; বৃষ্টিস্নাত বর্ষার ফুলের উজ্জ্বল উপস্থিতি মানুষের মনে রং লাগিয়ে আসছে। বর্ষার শুরুতেই গাছে গাছে ফুটতে থাকে কদম ফুল। কদম ফুলের আগমনী বলে দেয় এই বুঝি বর্ষাকাল এসে হাজির হলো প্রকৃতির মাঝে। কদম ফুলের শোভাবর্ধন যেন প্রকৃতিকে বৈচিত্র্য এনে দেয়। বর্ষার গাঢ় সবুজের সঙ্গে চারদিক উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে শাপলা, কদম, কেয়া, তমাল, হিজল, জারুল, করবী, সোনালু, বকুল, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, রঙ্গন, অলকানন্দ, কলাবতী, চন্দ্রপ্রভা, কামিনী, কলমি ফুল, পদ্ম, বনতুলসি, দোলনচাঁপা, ঝিঙেফুল, সোনাপাতি, কচুফুল, হেলেঞ্চা ফুল, উলটকম্বল, ঘাসফুল, শিয়ালকাঁটা, কেন্দার, কুমড়ো ফুল এবং এ ছাড়া নানা রঙের অর্কিডসহ বাহারি অনেক ফুল।বর্ষাকে ভালোবাসার ঋতু বললেও অত্যুক্তি হবে না। বর্ষা ছাড়া প্রকৃতি যেন পূর্ণতা পায় না।
বলা যায় বর্ষা, প্রকৃতি-পরিবেশ ও সৌন্দর্য একই সরলরেখায় বাঁধা। বর্ষার মন মাতানো নৃত্য-ছন্দ মানবমনে এক রহস্যময় আবেগ সৃষ্টি করে। বর্ষার অনুপম ছোঁয়ায় আমাদের চারপাশ ধুয়ে-মুছে ঝকঝকে-তকতকে হয়ে যায়। প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয় বর্ষা। বর্ষার এই অপরূপ সৌন্দর্য এখন তেমন একটা দেখা যায় না। কবিগুরু তাই আক্ষেপ করে বলছেন – ‘আজকাল ব্যাঙ ডাকে না কেন? ছেলেবেলায় মেঘের ঘটা হলেই ব্যাঙের ডাক শুনতুম- কিন্তু আজকাল পাশ্চাত্য সভ্যতা এল, সার্বভৌমিকতা এবং ‘ঊনবিংশ শতাব্দী’ এল, পোলিটিকল্ অ্যাজিটেশন, খোলা ভাঁটি এবং স্বায়ত্তশাসন এল, কিন্তু ব্যাঙ গেল কোথায়? হায় হায়, কোথায় ব্যাস বশিষ্ঠ, কোথায় গৌতম শাক্যসিংহ, কোথায় ব্যাঙের ডাক! ছেলেবেলায় যেমন বর্ষা দেখতেম, তেমন ঘনিয়ে বর্ষাও এখন হয় না। বর্ষার তেমন সমারোহ নেই যেন, বর্ষা এখন যেন ইকনমিতে মন দিয়েছে- নমোনমো করে জল ছিটিয়ে চলে যায়- কেবল খানিকটা কাদা, খানিকটা ছাঁট, খানিকটা অসুবিধে মাত্র- একখানা ছেঁড়া ছাতা ও চীনে বাজারের জুতোয় বর্ষা কাটানো যায়- কিন্তু আগেকার মতো সে বজ্র বিদ্যুৎ বৃষ্টি বাতাসের মাতামাতি দেখি নে। আগেকার বর্ষায় একটা নৃত্য ও গান ছিল, একটা ছন্দ ও তাল ছিল- এখন যেন প্রকৃতির বর্ষার মধ্যেও বয়স প্রবেশ করেছে, হিসাব কিতাব ও ভাবনা ঢুকেছে, শ্লেষ্মা শঙ্কা ও সাবধানের প্রাদুর্ভাব হয়েছে। লোকে বলছে, সে আমারই বয়সের দোষ।’
বর্ষার শান্ত বরিষণে ধূয়ে যাক মুছে যাক সকল অশুভ। চারিদিক কদম্বফুলের স্নিগ্ধতায় ভরে উঠুক। প্রাণের প্রস্ফুটনে বিমুগ্ধ জলাধারে কদম কেয়ার মৌতানে স্নাত হোক, শুভ্র হোক প্রত্যেকের হৃদয়।





















































