এ মুহূর্তের সংবাদ

ফলের স্বাদ ফিরিয়ে আনতে না পারলে ফল খাওয়ার অভ্যাসও ফিরবে না: ডিসি জাহিদ

সুপ্রভাত ডেস্ক »

দেশীয় ফলের স্বাদ ও গুণগত মান রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, ফলের স্বাভাবিক স্বাদ হারিয়ে গেলে মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে ফল খাওয়ার আগ্রহ কমে যায়। তাই ফল উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এর স্বাদ ও পুষ্টিগুণ সংরক্ষণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী জেলা ফল মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের মেলার প্রতিপাদ্য ছিল—‘করব মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করব বারো মাস’।

উদ্বোধনের পর জেলা প্রশাসক জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে কৃষকদের আনা ফলের প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন। প্রদর্শনীতে চট্টগ্রামে উৎপাদিত প্রায় ৬০ প্রজাতির প্রচলিত ও অপ্রচলিত ফল এবং সেগুলোর পুষ্টিগুণ তুলে ধরা হয়।

আলোচনা সভায় মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, বর্তমানে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। জাঙ্ক ফুডের প্রতি ঝোঁক বাড়ার পাশাপাশি ফল খাওয়ার প্রবণতা কমছে। এর ফলে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তিনি বলেন, ‘সুস্থ শরীরে সুস্থ মনের বাস। শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষ কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে সুস্থ চিন্তা করতে পারে না। তাই সুস্থ সমাজ গড়তে হলে মানুষকে পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসে ফিরিয়ে আনতে হবে।’

দেশীয় ফলের গুরুত্ব তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ু ও প্রকৃতির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ দেশীয় ফল ও বৃক্ষই এ দেশের প্রকৃত সম্পদ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ফলের স্বাভাবিক স্বাদ হারিয়ে যাচ্ছে, যা উদ্বেগের বিষয়।

তিনি বলেন, ‘আগে যে কলার স্বাদ ছিল, এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই স্বাদ পাওয়া যায় না। বিভিন্ন ফলের অতিরিক্ত সংকরায়ণ বা হাইব্রিড জাতের কারণে ফলের আকার ও সৌন্দর্য বাড়লেও স্বাভাবিক স্বাদ কমে যাচ্ছে। ফলের স্বাদ ফিরিয়ে আনতে না পারলে মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের, ফল খাওয়ার অভ্যাসে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।’

জাহিদুল ইসলাম বলেন, শুধু ফল উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না; ফলের গুণগত মান, পুষ্টিগুণ ও স্বাদ রক্ষার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। দেশীয় ফলের সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

ফল পাকাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কার্বাইডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে ফল পাকানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। ব্যবসায়িক লাভের জন্য মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিরাপদ ফল উৎপাদন ও বিপণনে কৃষক, ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

একটি মানবিক ও সুস্থ সমাজ গঠনে সবার দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘শুধু অন্যের ভুলের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। প্রত্যেককে নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। তাহলেই আমরা কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।’

পরিবেশ সুরক্ষায় বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় দেড় কোটি বৃক্ষ রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বছর জেলায় প্রায় ১৮ লাখ বৃক্ষ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাত লাখ বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ বছর আরও ৫৭ হাজার ফলদ ও অন্যান্য বৃক্ষ রোপণ করবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম বড় শক্তি এর উর্বর মাটি। এই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ফল উৎপাদন যেমন বাড়ানো সম্ভব, তেমনি দেশীয় ফলের ঐতিহ্য ও স্বাদও সংরক্ষণ করা সম্ভব। এর মাধ্যমে একদিকে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে গড়ে উঠবে সুস্থ ও সচেতন প্রজন্ম।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ফলের পুষ্টিগুণ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং বাণিজ্যিক ফল উৎপাদনের গুরুত্ব তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) কৃষিবিদ রঘুনাথ নাহা।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালক কৃষিবিদ আপ্রু মারমা। সমাপনী বক্তব্যে তিনি বসতবাড়ির আঙিনায় ফলদ গাছ রোপণ, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ফলমেলার বার্তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত কৃষক ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুটি করে ফলদ গাছের চারা বিতরণ করা হয়।