সুপ্রভাত বাংলাদেশে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়মবহির্ভূতভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টাকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ডাবল ড্রাম রোড রোলারের অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স প্রশিক্ষণের জন্য সুইডেন যাচ্ছেন চসিক সচিব ও মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিবসহ পাঁচ কর্মকর্তা।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে কেনা ডাবল ড্রাম রোড রোলারের ‘অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স’ শেখার অজুহাতে পাঁচ কর্মকর্তার সুইডেন সফর কেবল একটি প্রশাসনিক প্রহসনই শুধু নয়, বরং আইন ও নীতির প্রকাশ্য লঙ্ঘন। যেখানে কারিগরি জ্ঞান প্রয়োজন মেকানিক ও চালকদের, সেখানে প্রশিক্ষণ প্রতিনিধিদলে স্থান পেয়েছেন চসিক সচিব এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব (পিএস)। একজন চালক বা টেকনিশিয়ানের কাজ শেখার জন্য মন্ত্রণালয়ের পিএস ও চসিকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সুইডেন যাওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়—এই প্রশ্ন আজ সাধারণ নগরবাসীর মুখে মুখে।
নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরকার কবির আহমেদকে দেওয়া কার্যাদেশের শর্তানুসারে, যন্ত্র সরবরাহের সাত দিনের মধ্যে চট্টগ্রামেই মেকানিক্যাল সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ও চালকদের একদিনের ট্রেনিং দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই শর্ত শিকেয় তুলে সরঞ্জাম আসার ছয় মাস পর কর্মকর্তা পর্যায়ের পাঁচজনকে ১০ দিনের জন্য পাঠোনো হচ্ছে সুইডেনে। তারচেয়েও বিস্ময়কর হলো, সফরটির পুরো ব্যয়ভার বহন করছে সংশোধিত চুক্তির দরপত্র বিজয়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আতিথেয়তা ও খরচে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর ৬৪ নম্বর ধারার স্পষ্ট ব্যত্যয়। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, সরকারি কাজের পদমর্যাদা ব্যবহার করে ঠিকাদারের থেকে এমন অনৈতিক সুবিধা নেওয়া ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর অধীন শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। ঠিকাদারের টাকায় এই বিলাসী সফর শেষ পর্যন্ত কাজের মান ও জনস্বার্থকে আপস করতে বাধ্য করবে—এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ, ঠিকাদার যে অর্থ আজ আমোদ-প্রমোদে ঢালছেন, তা পরোক্ষভাবে অসৎ উপায়ে চসিকেরই কাজের গুণগত মান কমিয়ে উসুল করা হবে।
সম্প্রতি অনাবশ্যক ব্যয় সংকোচন ও ক্রান্তিলগ্নে কৃচ্ছ্রসাধনের স্বার্থে খোদ প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সফর নিরুৎসাহিত করতে বারবার পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এমনকি মশা নিয়ন্ত্রণ দেখতে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাবও প্রধানমন্ত্রী নাকচ করে দিয়েছিলেন। অথচ সেই নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে কীভাবে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে স্ববিরোধী এই অনুমোদনপত্র পাস হয়ে এল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। চিঠির আগের সংস্করণে থাকা উপসচিবের নাম বদলে মন্ত্রীর পিএস-এর নাম অন্তর্ভূক্ত করা এবং সফরের মেয়াদ বাড়ানো প্রমাণ করে, এখানে স্বার্থান্বেষী মহলের গভীর প্রভাব কাজ করেছে।
প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেড়ে বসা এই ‘উপহার সংস্কৃতি’ এবং ‘সফর-বিলাস’ বন্ধ করতে হলে কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন আবশ্যক। এই বিতর্কিত সফর অবিলম্বে বাতিল করা উচিত। পাশাপাশি যেসব কর্মকর্তা বিধি ভেঙে ঠিকাদারের খরচে এমন সুবিধা গ্রহণ করছেন এবং যারা এর অনুমোদন দিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। জনস্বার্থের তোয়াক্কা না করে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানো এই ‘অনিয়মের রোলার’ বন্ধ না হলে সুশাসনের ভিত্তিটিই নড়বড়ে হয়ে যাবে।





















































