ফিচার এলাটিং বেলাটিং

পেঁচাপণ্ডিত ও জুতা রহস্য

পান্থজন জাহাঙ্গীর »

বনটা ছিল ভীষণ ঘন আর অন্ধকার। দিনের বেলাতেও সেখানে সূর্যের আলো ঠিকমতো ঢুকতে পারত না। বিশাল বিশাল গাছ, ঝোপঝাড় আর লতাপাতায় ঢাকা সেই বনে মানুষ তো দূরের কথা, কোনো মানুষের ছায়াও কখনো দেখা যায়নি।
কিন্তু একদিন অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল। বনের মাঝখানে পড়ে ছিল একপাটি জুতা!
জুতাটা কোথা থেকে এলো, কেউ জানত না। বনের প্রাণীরা এমন জিনিস জীবনে কখনো দেখেনি। সবাই ভয়ে, বিস্ময়ে আর কৌতূহলে হতবাক।
সবার আগে জুতাটা দেখতে পেল এক মোটা কালো ভাল্লুক। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নাক দিয়ে জুতাটাকে শুঁকল।
– “হুমম… এটা আবার কী জিনিস?”
সে থাবা দিয়ে জুতাটাকে গড়িয়ে দিল। তারপর আবার উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না।
অবশেষে সে গর্জন করে ডাক দিল,
– “এই শোনো! সবাই এখানে এসো! অদ্ভুত একটা জিনিস পেয়েছি!”
মুহূর্তেই বনের নানা প্রাণী সেখানে জড়ো হলোÑসিংহ, চিতাবাঘ, নেকড়ে, ছাগল, বানর, হরিণ, শিয়াল, এমনকি কিছু পাখিও।
সিংহ গম্ভীর মুখে জুতার দিকে তাকিয়ে বলল,
– “এটা তো স্পষ্ট গাছের শুকনো বাকল!”
চিতাবাঘ মাথা নেড়ে বলল,
– “না না, তুমি ভুল বলছ। এটা একটা বিশাল কাঠবাদামের খোসা।”
নেকড়ে দাঁত বের করে গরগর শব্দে বলল,
– “তোমরা কিছুই বোঝো না। এটা একটা পাখির বাসা। দেখো না, ভেতরে ঢোকার জন্য গর্তও আছে!”
ছাগল তখন জুতার ফিতা দেখে চেঁচিয়ে উঠল,
– “আরে! এটা তো উদ্ভিদের শিকড়! এত লম্বা শিকড় আর কী হতে পারে?”
বানর লাফিয়ে উঠে বলল,
– “না না! এটা নিশ্চয়ই কোনো রহস্যময় ফল!”
এভাবে সবাই নিজের নিজের মতো ব্যাখ্যা দিতে লাগল। কেউ কারো কথা মানতে রাজি নয়। একটু পরেই তর্ক শুরু হলো, তারপর তর্ক থেকে ঝগড়া।
ঠিক তখনই কাছের এক পুরোনো গাছে এসে বসল এক বৃদ্ধ পেঁচা। সে অনেকক্ষণ ধরে সব শুনছিল।
অবশেষে সে ধীর গলায় বলল,
– “তোমরা যদি একটু চুপ করো, তাহলে আমি বলতে পারি এটা কী।”
সবাই থেমে গেল।
পেঁচা বলল,
– “এটা মানুষের জুতা।”
সব প্রাণী একসাথে চমকে উঠল।
“মানুষ?”
“জুতা?”
“ওগুলো আবার কী?”
পেঁচা শান্তভাবে বলল,
“মানুষ হলো দুই পায়ের এক প্রাণী। তাদের পাখা নেই, কিন্তু তারা পাখির মতো বুদ্ধিমান। তারা আমাদের মতো হাঁটে, কথা বলে, কাজ করেÑবরং আমাদের চেয়েও অনেক বেশি কাজ করতে পারে। আর এই জিনিসটাকে বলে জুতা। মানুষ এটা পায়ে পরে হাঁটে।”
ভাল্লুক সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল,
“অসম্ভব!”
সিংহ রাগে গলা কাঁপিয়ে বলল,
“চার পা ছাড়া কেউ আমাদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হতে পারে না!”
পাখিরা চিৎকার করে বলল,
“পালক ছাড়া আবার দুই পায়ের প্রাণী হয় নাকি?”
পেঁচা আবার বোঝানোর চেষ্টা করল,
“আমি সত্যিই বলছি। মানুষ এমন জিনিস তৈরি করেÑ”
কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না।
সব প্রাণী একসাথে চেঁচিয়ে উঠল,
“মিথ্যা! মিথ্যা! তুমি আমাদের বোকা বানাতে চাইছ!”
তারপর তারা বৃদ্ধ পেঁচাটাকে ধাওয়া করল। অসহায় পেঁচাটা প্রাণ বাঁচাতে উড়ে পালাতে লাগল। বন ছাড়ার সময়ও সে চিৎকার করে বলছিল,
“আমি সত্য কথাই বলেছি!”
“এটা অবশ্যই সত্য!”
কিন্তু কেউ তার কথা বিশ্বাস করল না।

নীতিকথা
অনেক সময় জ্ঞানী মানুষের কথা সত্য হলেও, সংখ্যাগরিষ্ঠ অজ্ঞ লোকেরা তা মানতে চায় না।